দেবারতী পাঠক চ্যাটার্জীর গল্প “এক বৈশাখে দেখা হল দুজনায়…”

এই সুন্দর স্বর্নালী সন্ধায়….
একটানা গানের আওয়াজ ভেসে আসছে পাশের বাড়ি থেকে।   মল্লিকা দি গান গাইছে। খুব সুন্দর গান গায় মল্লিকা দি। কি মিঠে গলা। রোজ ভোরে মল্লিকা দির রেওয়াজের সুরেই ঘুম ভাঙ্গে আমার। প্রথমে সা ধরে রেওয়াজ চলে বেশ কিছুক্ষন।  ভৈরব-ভৈরবীর সুরে আর ভোরের আধো অন্ধকারে চোখ খুলি আমি। খুব ভালো লাগে।
আমার প্রতি টা দিনের শুরু টা এত সুরেলা এত সুন্দর করে তোলার জন্য মনে মনে মল্লিকা দি কে অনেক ধন্যবাদ দিই।
এখন বিকাল ৫ টা। মল্লিকা দির গানের মাস্টার এসেছে। এই ভদ্রলোক কে আমার একটুও ভালো লাগেনা। আধবুড়ো পাগলাটে লোক। সে নিয়ে সমস্যা নয় আমার। সমস্যা টা অন্য জায়গা তে।
গত ছমাস ধরে উনি গান শেখাতে আসেন মল্লিকা দি কে, ঠিক বিকেল বেলায়। আর এই ছমাস ধরে এই কারনে মল্লিকা দি ছাদে ওঠেনা। সেই সুন্দর বিকেল গুলো আর ফিরে আসেনা।
আগে মল্লিকা দি কলেজ থেকে ফিরে খেয়ে দেয়ে ছাদে উঠতো। গুনগুন করে গান গাইতো। আর আমি অপলকে চেয়ে থাকতাম ওর দিকে। মল্লিকা দিও দেখতো। আড়চোখে তাকাতো আমার জানালায়। আমি অনুভব করতাম ওর দৃষ্টি। আমার সর্বশরীর কাঁপতো।
সেসব আর হয়না। কতদিন ছাদে ওঠেনি মল্লিকা দি। কতদিন ছাদের গাছ গুলো ওর নরম আঙ্গুলের ছোঁয়া পায়নি.. ছাদের বাতাসে ভেসে বেড়ায়নি ওর গলার গুনগুনানি.. আমার জানলা দেখেনি সেই হরিণ চোখের কটাক্ষ।
*****
সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার। এখনই বৃষ্টি নামবে মনে হচ্ছে। কালবৈশাখীর ঝোড়ো হাওয়া শুরু হচ্ছে..
মল্লিকা দি দের ছাদে একটা হলুদ শাড়ি কার্নিশ থেকে উড়ছে। মাঝে মাঝে জল ট্যাংক টার গায়ের উপর গিয়ে পড়ছে। নতুন বৌ এর মত ঘোমটা দিয়ে ঘিরে দিচ্ছে ট্যাংক টা কে। আরে আরে! ট্যাংক টা কি লজ্জা পেল! নাহ। চোখের ভুল।
এরকম চোখের ভুল আমার হরহামেশায় হয়। আকাশের দিকে তাকালে রাম রাবণের যুদ্ধ দেখতে পাই, গাছের ডাল পাতার ভাঁজে ভাঁজে সমুদ্রের ঢেউ চোখে পরে, বিট্টু দের বাড়ির ছাদের প্রাগৈতিহাসিক অ্যান্টেনা টা কে তো প্রায়শই আমার স্ট্যাচু অব লিবার্টি মনে হয়!
আসলে আমার এই জানালা টা দিয়ে বিশেষ বেশি কিছু দেখা যায়না। সোজাসুজি মল্লিকা দি দের বাড়ি, পাশেই ওদের একটুকরো বাগান। দুটো আম গাছ আর একটা পেয়ারা। ডানদিকে বিট্টু দের বাড়ির অর্ধেক টা। বাঁ দিকে আমাদের গলিপথ টা একটা আচমকা বাঁক নিয়েছে। পাশের ফাঁকা মাঠের একটুখানি চোখে পরে। এরই মধ্যে আমার জগৎ। এরই মধ্যে আমি অনেক কিছু দেখতে পাই। না দেখে উপায় ও নেই।
ওই শুরু হয়ে গেল। টুপ টাপ বৃষ্টির ফোঁটা গুলো নেমে আসছে আমার জানলায় বাড়ানো হাতের উপর… আমার গলি পথের ধুলোয়… আমার মল্লিকা দির হলুদ শাড়িতে…
হে ভগবান! শাড়িটা তুলতে তুমি মল্লিকা দি কেই পাঠাও। ওদের বাড়ির সব্বাই যেন এখন খুব ব্যস্ত হয়ে যায়। শুধু মল্লিকা দি এদিক ওদিক তাকিয়ে ব্যস্ত পায়ে একরাশ বিরক্তি চোখে নিয়ে একবার উঠুক ছাদে।
*****
-“জিতু! এই জিতু!! কিরে কখন থেকে ডাকছি শুনতে পাচ্ছিস না?”
-“না মা, শুনতে পাইনি, বলো..”
-“এখনও রেডি হোসনি কেন রে? আর আধ ঘন্টার মধ্যেই বেড়োবো কিন্তু, বাবা রেগে গেলে আমি কিন্তু বাঁচাতে পারবো না। তাড়াতাড়ি রেডি হ!”
-“আমি তো যাবো না মা, আগেই বলেছিলাম। তুমি বোধ হয় ভুলে গেছো।”
-“না ভুলিনি। আর আমিও তোকে না নিয়ে যাবোনা, সেটাও মনে রাখিস। আজ তোকে যেতেই হবে জিতু। কতদিন আর এভাবে ঘরবন্দী হয়ে থাকবি? বাইরে বেরো! বন্ধু দের সাথে মেশ, সবাই তোকে মিস করে খুব। কালও সৌনকের মা বলছিল-“
-“মা প্লিজ! থামো। ভালো লাগছে না। সত্যি টা কে মানতে শেখো। কেউ মিস করেনা, সবাই কৌতুহল দেখায়! করুনা করে..”
-“জিতু!”
-“হ্যাঁ মা। ঠিক তাই। আমি কেমন আছি সেটার থেকেও আমাকে কেমন দেখতে হয়েছে সে ব্যাপারে সবার উৎসাহ বেশি। প্লিজ, তুমি যাও। আমি যাবোনা।”
-” জানিনা, কতদিন এভাবে চলবে! তুই কি কোনদিন সহজ হতে পারবি না? সবই আমার অদৃষ্ট!”
-“যেদিন হবো, সেদিন আমার থেকে বেশি খুশি আর কে হবে মা? বলো? কেঁদোনা..  বিট্টু কে একবার ডেকে দেবে মা?”
-“হুম, দিচ্ছি। তবু ভালো বিট্টু টা কে আসতে দিস ঘরে..”
*****
-“কেন বে! হঠাৎ মল্লিকা দির খোঁজ কেন?”
-“বলনা, জানিস কিছু? আছে কেউ? “
-“না বস। জানিনা। কিন্তু মিঠাই এর সাথে যখন মাচায় বসতাম তখন শুনেছিলাম আবঝা ভাবে একটা কেস। সে বহু পুরোনো কথা”
-“কি কেস? কবেকার? বল না রে!”
-” মাইরি! তোর এত চাপ কিসের রে? ভাইটু ভাইটুর মত থাক। শ্লা তাই বলি সারাদিন মল্লিকা দির ছাদের দিকে তোর কিসের নজর! কি কেস বলতো? তোর কোন দাদার জন্য ট্রাই মারছিস নাকি?”
-“তুই বলবি? হ্যাঁ আর না? বললে বল, নইলে ফোট শালা!”
-“আরিব্বাপ! চটছিস কেন? আরে মিঠাই বলছিল, সে প্রায় ৭/৮ মাস আগের কথা। কি জানি কে একজন নাকি ওর দিদি মানে মল্লিকা দি কে পঁচিশে বৈশাখের অনুষ্ঠানের  দিন রাতে ওই মিত্তির দের গাড়ি বারান্দায় দাঁড়িয়ে চুমু খেয়েছিল!”
-“তারপর?”
-“তারপর আর কি! দুদিন নাকি খুব উড়ছিল মাল টা-“
-“এক মিনিট! মাল কাকে বললি বে? মারবো শালা কানের পাশে, অন্ধকার দেখবি।”
-“যাহ তেরি! তোর এত ফাটছে কেন বে? কি কেস বলতো?”
-“তুই বলবি??”
-“আরে আর কি? দুদিন খুব খুশি ছিল, তারপর কি হয়েছে কে জানে! খালি নাকি কাঁদে। মিঠাই কেও বলেনা কে ছেলে, কোন ছেলে। এই হল গল্প। বল এবার কি কেস?”
-“কিছু না রে। এমনিই।”
-“এই জিতু? তুই ফিউজ হয়ে গেলি কেন  মল্লিকা দির চুমুর গল্প শুনে?? জিতু?”
-“আরে ধুর। এমনিই.. বাদ দে।…  এই বিট্টু, মোচার চপ খাবি? আমি খাওয়াবো। যা না প্লিজ রাজু দার দোকান থেকে নিয়ে আয়। মার কাছে টাকা চেয়ে নিস।”
-“এই টা খুব ভালো কথা বলেছিস। যাই নিয়ে আসি। আগে বলবি তো চপ খাবি, বলছি যে পকোড়া টাও রাজু দা ঘ্যামা বানায়, আবার উপরে কাসুন্দি  দিয়ে-“
-“তুই যা বাপ আমার, পকোড়াও আন। যা শিগগির!”
*****
-“এই! কি করছিস জিতু?”
-“চোখ বন্ধ করো প্লিজ।”
-“এই জিতু, কি হচ্ছে কি! কেউ এসে পরবে.. ছাড়। ছাড় বাবু!”
মুখে ছাড় বললেও আমি বুঝতে পারছি মল্লিকা দির নিঃশ্বাস ঘন হচ্ছে,  সর্পিল হাত দুটো আরোও গভীর হচ্ছে আমার পিঠের উপর.. পাতলা লাল ঠোঁট দুটো কাঁপছে তিরতির করে.. আমার চোখের সামনে ঢেউ তুলছে এক সমুদ্র সুনামি.. ভেসে যাচ্ছি আমি, আমরা…
উফ! আবার লোডশেডিং!
স্বপ্নে সেদিনের সন্ধে টা বারবার আসে। তবু যেন আবারও অনুভব করার পিপাসা মেটেনা আমার। কত সুন্দর ছিল সব কিছু মাত্র এক বছর আগেও… কত হাসি, কত আনন্দ…
সেবার পঁচিশে বৈশাখে পাড়ার অনুষ্ঠানে মল্লিকা দি তিন টে গান গেয়েছিল, আর আমি আবৃত্তি করেছিলাম ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’। তিতাস দের ছাদে একমাস ধরে রিহার্সাল চলেছিল। সেই বৈশাখ কখন যে মল্লিকা দি কে আমার মনের এত কাছে এনে ফেলেছিল! সেদিন অনুষ্ঠানের শেষে সবাই যখন ব্যস্ত স্টেজের গোছগাছ করতে, আমন্ত্রিত দের আপ্যায়নে.. তখন মিত্তির দের গাড়ি বারান্দায় নীচে দুটো আকুল মন কাছে এসেছিল। এক আশ্চর্য অনুভূতি.. যেন সহস্র ঝর্নার জল একসাথে ভিজিয়েছিল আমাদের..
কয়েকটা দিন স্বপ্নের মত কেটেছিল.. কলেজ, লাইব্রেরী,  কোচিং ক্লাস, পাড়ার মাচা কিছুতেই মন বসছিল না যেন। বারবার ওই কাঁপতে থাকা ঠোঁট দুটো..  ঘামে ভেজা কোমর টা…
হয়তো কেমিস্ট্রি ল্যাবে বসেও আনমনে মল্লিকা দিই এসেছিল কখন চুপিসারে, মন টা কেমিস্ট্রি ল্যাব ছেড়ে আবারও হয়তো ওই ভেজা কোমরের ভাঁজে ভাঁজে হারিয়ে গেছিল… আর তখনই…
যখন জ্ঞ্যান ফিরলো আমার, দেখি হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছি। সারা মুখে গলায় ব্যান্ডেজ। মুখের বাম দিকটায় কোন সার নেই, যন্ত্রনাও নেই…  সেদিন ল্যাবে একটু অন্যমনস্কতার দাম আমি আজও দিচ্ছি। ব্যান্ডেজ খোলার পর আমার ঝলসানো মুখ টা দেখে মা ও চমকে গেছিল। বাবা আমার দিকে তাকাতে পারেনি বহুদিন।
আমি নিজেই কি পেরেছি আজও দেখতে? ডাক্তারের কথায় আমি হাসপাতাল থেকে ফেরার আগেই মা আমার ঘর থেকে আয়না সরিয়ে নিয়েছিল, সেই আয়না আমি আজও আনতে দিইনি ঘরে।  কি হবে দেখে।
যদি কখনও তোমার চোখে নিজেকে দেখতে পেতাম মল্লিকা দি! জানি এ অসম্ভব। তবু এই অলীক কল্পনাই এখন আমার সুখ। আমার একান্ত নিজস্ব জগতে সারাদিন মল্লিকা দি আমার সাথী। আমার, একান্তই আমার…
*****
-“জিতু.. এই জিতু.. ওঠ.. চল, রিহার্সালে যাবিনা? এই জিতু?”
-“মল্লিকা দি! তুমি?”
-“হুম.. ওঠ এবার।”
নাহ.. আবার স্বপ্ন… কেন এমন করো মল্লিকা দি? কি দোষ আমার? চোখ বুজেও তোমার কন্ঠস্বর! চোখ খুললেও তোমার মুখ। যে স্বপ্ন কোনদিন সত্যি হবেনা, সেই স্বপ্ন সারাদিন কেন দেখাও?
-“এই জিতু! কি বিড়বিড় করছিস? চল ওঠ, আর বেশি দিন দেরী নেই রবীন্দ্রজয়ন্তীর।  এবার  কিন্তু ‘শেষের কবিতা’ পাঠ হচ্ছে। বিকাশ দা সবাই কে ছোট ছোট করে ভাগ করে দিয়েছে, আমি কিন্তু অমিতের জন্য তোর নাম কনফার্ম করে এসেছি! চল এবার।”
-“মল্লিকা দি! তুমি সত্যিই আমার ঘরে? আর কি বলছো এসব? আমি কিভাবে রবীন্দ্র জয়ন্তী তে -“
-“থাম তো। কিভাবে আবার কি? যেভাবে প্রতি বছর আবৃত্তি করিস সেভাবেই করবি। এই ক’মাস অনেক কাঁদিয়েছিস আমাকে। তুই কি ভাবিস আমাকে? এত ছোট মন আমার? আমি তোর রূপ টায় দেখেছিলাম?”
-“মল্লিকা দি!”
-“চুপ কর। কোন কথা শুনতে চাইনা তোর। পাজী ছেলে! তুই আবৃত্তি না করলে আমিও গান করবো না কিন্তু। মনে রাখিস কথা টা। আমি চললাম, গলি তে ঠিক ৫ মিনিট দাঁড়াবো, তার মধ্যে যদি আসিস ভালো। নইলে এই শেষ দেখা।”
-“মল্লিকা দি শোনো,  প্লিজ! আমি কিভাবে বাইরে যাবো? শোনো-“
*****
আজ পঁচিশে বৈশাখ। এইমাত্র অনুষ্ঠান শেষ হল। ঠিক সেদিনের মতই আজও সবাই খুব ব্যস্ত।  তারই ফাঁকে বারবার মল্লিকা দির হাত ছুঁয়ে গেছে আমার হাত। চোখের চাহনি তে বারবার ফুটে উঠেছে নীরব প্রশ্রয়..  আমি এখন দাঁড়িয়ে আছ স্টেজের পিছনে। অপেক্ষা করছি মল্লিকা দির জন্য।
সেদিন আমি বেড়িয়েছিলাম, ওর দেওয়া সময় ৫মিনিটের মধ্যেই আমি যা ঠিক করার করে নিয়েছিলাম। বন্ধ ঘরে থেকে আমার মন টাকেও বন্ধ করে রেখেছিলাম এতদিন, আর নয়। হয়তো আমার মুখের একটা দিক ঝলসানো, হয়তো আমাকে এখনও মুখ ঢেকে রাখতে হয় বাইরে বেরোলে, কিন্তু আমার যে আর কি কি আছে সেটা মল্লিকা দি এই কদিনে আমায় বোঝাতে পেরেছে।
আমিও বুঝেছি, মল্লিকা দি এই কয়েকমাস কিভাবে নিজের সাথে যুদ্ধ করেছে, কত টা ভেবেছে আমার কথা… সবকিছুর শেষে আমাদের ভালোবাসা জিতে গেছে নিজের নিয়মেই।
আমাদের বয়সের ফারাক, আমার ঝলসে যাওয়া মুখ কোনকিছুই আমাদের দুজনের মাঝে দেওয়াল তুলতে পারেনি।
শিরশির করে করে হাওয়া দিচ্ছে.. আকাশে মেঘের ঘনঘটা.. বৃষ্টি নামতে আর বেশি দেরী নেই..  বৈশাখের তপ্ত বাতাস ধীরেধীরে শীতল হচ্ছে মেঘের স্পর্শে।
খোলা আকাশের নীচে দুটি মিলন উন্মুখ উষ্ণ হৃদয় অপেক্ষা করছে বৃষ্টির.. অপেক্ষা সৃষ্টিসুখের…

You may also like...

Leave a Reply