নিবেদিতা হালদার গাঙ্গুলি র “মেঘাচ্ছন্ন আকাশ”

(৩)

এর মধ্যে কফি আর মাফিন চলে এল। আমি ওর দিকে তাকানো বন্ধ করে কফিতে মন দিলাম। চিনি ঢাললাম, চামচ দিয়ে গুলতে থাকলাম। তারপর মাফিনের প্লেটটা সামনে টেনে নিলাম। চামচ দিয়ে এক টুকরো কেটে মুখে দিয়ে ওর দিকে না তাকিয়েই বললাম “thanks”! আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানান দিচ্ছিল এই পুরো সময়টা ও আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। হঠাৎ বলে উঠল – “এত মন দিয়ে কফি খেতে হয়?”

আমি ওর দিকে তাকিয়ে একটা বোকা বোকা হাসি দিলাম।

“লাল হয়ে যাচ্ছ কেন? শ্রীমতি পরকিয়া করতে গিয়ে লজ্জা পাচ্ছেন?”

“আকাশ!” চাপা গলায় চেঁচালাম!

“এই শোনো বেকার ঢঙ কোরো নাতো! আমরা প্রেম করছি, admit it!” ওও চাপা গলায় বলল।

“প্রেম! এটাকে প্রেম বলে?”

“বলে না? রোজ তোমায় ফোন করি কেন তাহলে? তুমি আমায় রাতে চুমু খাও কেন?”

“তুমি বায়না করো বলে! চুমু না খেলে তুমি ফোন কাটো না!”

“আহ! তার মানে আমার থেকে ছুটকারা পাবার জন্য তুমি আমায় চুমু খাও?”

“যা ইচ্ছে ভাব”।

বলে আমি মাফিন আর কফি খাওয়ায় মন দিলাম। না এলেই হত! ও তো ওর কফিতে হাতই দিচ্ছে না! “Seriously? Don’t u love me?” এবার ওর গলাটা কেমন করুণ শোনালো। আমার একটু মায়া লাগলো। বললাম, “বোঝার চেষ্টা করো প্লিজ – আমার একটা মেয়ে আছে, আমি প্রেম করতে পারি না”।

“মেয়ের সাথে প্রেমের কি সম্পর্ক?”

“ও ওর বাবাকে, ওর বাবা ওকে, খুব ভালোবাসে”।

“বাসুক না! তার সাথে আমার তোমার ভালবাসার কি সম্পর্ক?”

“আমি বৃষ্টিকে সূর্যর কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারব না!”

ও হঠাৎ আমার দিকে সরে এসে আমার বাঁ হাতের ওপর ডান হাত দিয়ে চাপ দিল – “হেই রিল্যাক্স! কে কাকে কার থেকে কাড়ছে? তোমার বোঝায় ভুল হয়েছে! আমি কখনই বলব না তোমায় সূর্যকে ডিভোর্স দিয়ে আমায় বিয়ে করতে! নেভার!”

আমার অবাক হবার পালা এবার। ওর চোখের দিকে চোখ রেখে বললাম “তাহলে? তোমায় যদি বিয়েই না করব প্রেম করব কেন তোমার সাথে?”

“হে ভগবান! ভালবাসলে বিয়ে করতেই হবে? আর বিয়ে করলে ভালবাসতেই হবে? এই যে তুমি বিয়ে করেছ, সূর্যকে ভালোবাসো? মনের ওপর জোর করে কিছু হয় নাকি?”

“কিন্তু আকাশ, তুমি তো একদিন বিয়ে করবে! তখন তুমি তোমার বউকে ভালবাসবে না?”

“হাঁ বাসবো, তোমাকেও বাসবো”।

“হয়না তা! ওই মেয়েটির সাথে অন্যায় করা হবে তাহলে!” আমি আমার হাতটা ছাড়িয়ে নিলাম।

“কোথায় মেয়ে honey? আচ্ছা যবে বিয়ে করব আমার সাথে আর যোগাযোগ রেখো না। ওকে? আর বিয়ে আদৌ করব নাকি তাও জানিনা আমি”।

“কেন বিয়ে করবে না শুনি?”

“শুনবে? এখানে তো বলা যাবে না সেটা। চল এখান থেকে – কোনও নিরিবিলি জায়গায় যাই”।

 

(৪)

আমরা বিল মিটিয়ে বেড়িয়ে এলাম। ও ওর অফিসের গ্যারাজ থেকে ওর গাড়ি বার করল। আমরা গাড়িতে উঠে বসলাম। ও গাড়ি স্টার্ট দিলো।

“কোথায় যাচ্ছি আমরা?” জিজ্ঞেস করলাম আমি।

“কেন? ভয় লাগছে?” ও হেসে জিজ্ঞেস করল।

“আমি কিন্তু তোমার বাড়ি বা কোনও হোটেলে যাব না”।

“আমি তোমাকে পাবলিক প্লেসেই নিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু আমরা কথা বলতে পারবো, ঘাড়ের কাছে লোক থাকবে না। I hate crowd!”

ওর অফিস লেক গার্ডেনস এর কাছে। গাড়ি প্রিন্স আনোয়ার শাহ দিয়ে চলতে লাগলো, তারপর বাঁয়ে ঘুরলো। আমরা টলি ক্লাবের ভেতর ঢুকলাম। এর আগে কখনও এখানে আসিনি আমি। কি সুন্দর সবুজ ভেতরটা! মনেই হচ্ছিল না যে কলকাতার মধ্যে আছি। ইংরেজ আমলের বাড়ি, বিশাল খাওয়ার জায়গা, সামনে দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ গালচের মত গলফ কোর্স। তারপরই খেয়াল হল এই জায়গায় আমি পুরো বেমানান – অত্যন্ত সাধারণ সুতির জামা পরে এসেছি আমি। আকাশের গায়ে দামি শার্ট, দামি প্যান্ট। বোঝাই যাচ্ছে ও খুব নিয়মিত আসে এখানে, পাহারাদার ও বেয়ারাদের মুখের ভাব ও কথা সেটাই বোঝায়। ও আমাকে সেই বিশাল খাবারের জায়গা ফেলে একটা গার্ডেনের মধ্যে নিয়ে গেল। এখানে বেশ কিছু দূরে দূরে একটা করে টেবিল আর সেই টেবিল ঘিরে চারটে করে চেয়ার পাতা। প্রত্যেকটি টেবিলের মাথায় একটা করে বিশাল ছাতা লাগানো। হুম, একটা টেবিলে বসে কথা বললে পরের টেবিলের লোক শুনতে পাবে না। অথচ খোলা জায়গা, সবাই সবাইকে দেখতে পাবে। আমি স্বস্তিবোধ করলাম। দূরের একটা কোণের টেবিলে আমরা বসলাম। টেবিলের বাঁ ও ডান পাশের টেবিল দুটোই ফাঁকা। বেয়ারা অর্ডার নিতে এল। আকাশ বলল “আপকো তো মালুম হ্যায়, ম্যায় ক্যা পসন্দ করতা হু?” বেয়ারা “জি সাব” বলে চলে গেল।

“weekdays বলে ফাঁকা দেখছ। যাক এখানে শান্তিতে কথা বলা যাবে।” আকাশ বলল।

“একটা বাজে, আমি কিন্ত তিনটের সময় বেড়িয়ে যাব” ঘড়ি দেখে বললাম আমি।

“চিন্তা করো না, আমি নিজে তোমায় মেয়ের স্কুলবাস স্ট্যান্ডে ছেড়ে দেব”।

বেয়ারা এল ট্রলি নিয়ে – ট্রলির ওপর একটা absolute ভদকার বোতল, ice jar, sprite এর চারটে বোতল, একটা জলের জাগ, দুটো কাঁচের গ্লাস, এক বাটি চিনেবাদাম, এক বাটি কাজু বাদাম, এক বাটি চিপস। ভর দুপুরে মদ খাবে! তারপর ড্রাইভ করে আমায় ছাড়তে যাবে! আবার চিন্তায় পড়ে গেলাম। বেয়ারা টেবিলের ওপর সব সাজিয়ে দিয়ে চলে গেল।

“বুঝলে আমি এখন তোমায় যা সব বলব সে সব বলতে গেলে একটু মদ লাগবে গো!”

“এত কষ্ট করে বলতে হবেই বা কেন? আমি শুনতে চাই না”।

“আমি যে বলতে চাই – আমায় বলতে দাও”।

“তোমার জীবন তুমি কি ভাবে কাটাবে তুমি ঠিক করবে। বিয়ে করবে কি না করবে – আমার কাছে জবাবদিহি করছ কেন?”

“তুমি আমার বন্ধু বলে। বন্ধুর কাছে আমি সম্পূর্ণ উলঙ্গ হতে চাই”।

“বেশ! শোনাও তোমার গল্প”।

“তুমি এক পেগ নেবে?”

“না। আমি শুধু sprite নেব”।

দুজন দুটো গ্লাস নিয়ে বসলাম। Cheers করে প্রথম চুমুক দিয়ে গ্লাস টেবিলে নামালাম। ও বলা শুরু করলঃ

“আমি খুব সাধারণ পরিবারে জন্মেছি। আমার বাবা রেলে চাকরি করতেন। আমি জন্মাই জব্বলপুরে, আমার মামাবাড়িতে। বাবা প্রায় সাড়া ভারত ঘুরে ঘুরে চাকরি করেছেন। তাই আমি হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করেছি। পুরুলিয়া, তারপর নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে পড়েছি। তারপর যাদবপুর, জোকা ঘুরে চাকরি মুম্বাইতে। বাবা অবসর নিয়ে মাকে নিয়ে এখন ঠাকুমার সাথে আসানসোলে থাকেন। যাদবপুরে পড়তে গিয়ে আমার আলাপ হয় বসুন্ধরার সাথে। তারপর প্রেম, বিচ্ছেদ। ওর সাথে আর যোগাযোগ নেই, তবে খবর পাই – বিয়ে করে বাচ্চার মা হয়ে গেছে। আমাদেরই এক বন্ধুকে বিয়ে করেছে। যাক সে কথা”।

এই অব্দি বলে আকাশ একটু থামল। আমি জিজ্ঞেস করলাম “বিচ্ছেদের কারণ?” ও উত্তর দিলো “ওর আর আমাকে ভাল লাগলো না, দিগন্তকে ভাল লাগলো। দিগন্ত মদ খায় না, সিগারেট খায় না। আমি দুটোই খাই”।

“যাহ্‌! এটা একটা কারণ হতে পারে?”

“আমি খুব আড্ডাবাজ, ওকে সময় না দিয়ে বন্ধুদের সাথে গাঁজা খেয়ে পড়ে থাকতাম। ও বলল আমি নাকি ওকে taken for granted ভেবে নিয়ে ছিলাম। সম্পর্ককে যত্ন করতে হয়, অবহেলা করলে শুকিয়ে যায়। আমি শুধু প্রেমের গাছটাই পুঁতেছি, জল দিনি। দিগন্ত রোজ ওর প্রেমের গাছে জল দিত। Irony টা হল এই দিগন্তই আমাকে বসুন্ধরার সাথে আলাপ করিয়ে দিয়েছিল”।

“বুঝে গেছি। তারপর?”

“আগে খাবার অর্ডার দি। কি খাবে?”

“তুমি যা খাবে”।

“আমি চেলো কাবাব খাব, অনেকদিন খাইনি, খাবে?”

আমি হেসে বললাম, “যা খাওয়াবে, বললাম তো!”

“চুমু খাবে একটা?”

আমি চোখ নামিয়ে চুপ করে গেলাম। ও আমাকে বসতে বলে উঠে কিচেনের দিকে চলে গেল। ঘড়ি দেখলাম – দেড়টা বেজে গেছে।

 

Leave a Reply