পড়ুণ সুব্রত চৌধুরীর ভ্রমণ কাহিনী ‘শিখর থেকে সাগরে’

শিখর থেকে সাগর

সুব্রত চৌধুরী

অফিস থেকে আজ তাড়াতাড়িই বেরোলাম। তিনটের সময় বেড়িয়ে মেট্রোতে পালম পৌঁছলাম সাড়ে তিনটেয়। অন্যদিন পালম মেট্রো স্টেশন থেকে তিন কিলোমিটার হেঁটে বাড়ি পৌঁছই। লোকজনকে বলি যে স্বাস্থ্য রক্ষার উদ্দেশ্যে বাধ্যতামুলক হাঁটাহাঁটি হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আসলে বাসভাড়া বাঁচানোর চেষ্টা। আজ রিকশা করে বাড়ি ফিরলাম, গচ্চা গেলো পঞ্চাশ টাকা। সন্ধ্যেটা ফোনাফুনি, ব্যাগপত্তর ঘেঁটেঘুঁটে কেটে গেল। খাওয়াদাওয়া সেরে রাত সাড়ে দশটায় বাড়ি থেকে সস্ত্রীক বেরোলাম। ওলার ড্রাইভারসাহেব মিনিট দুয়েকেই পৌঁছে গেলেন। বাড়ি থেকে দিল্লি এয়ারপোর্টের ৩ নম্বর টার্মিনাল পৌঁছতে মিনিট পনের লাগল। এয়ারপোর্টে ঢুকে সুইস এয়ারের কাউন্টার দুর থেকেই দেখতে পেলাম, তার সামনে লম্বা লাইন।

বাঙালী হিসাবে ছোটবেলা থেকেই অভ্যেস তৈরী হয়েছে লাইন দেখলে বিনা কিছু প্রশ্ন করে পিছনে খাড়া হয়ে যাওয়ার। কাজেই দুটো বড়ো ব্যাগ আর একটা বউ নিয়ে সেই লম্বা লাইনটায় খাড়া হয়ে গেলাম। লাইনের সামনেটা দেখা যাচ্ছিল না। বউকে লাইন আর মালের দায়িত্ব দিয়ে নিজে এগিয়ে গেলাম সামনের দিকে। দেখি এটা ব্রিটিশ এয়ারের লাইন। পাশে সুইস এয়ারের কাউন্টার শুনশান। দু’মিনিটে ব্যাগ ড্রপ করে বোর্ডিং কার্ড পেয়ে গেলাম। ভারতবর্ষে ইলেকট্রনিক বোর্ডিং পাস মানে না পুলিশ প্রশাসন। জ্যুরিখের বোর্ডিং কার্ড হাতে নিয়ে দু’জনে চললাম ইমিগ্রেশন আর সিকিউরিটি চেকের দিকে। এবারের ছুটি কাটানোর গন্তব্যস্থল সুইটজারল্যান্ড পৌঁছনোর প্রথম পর্ব শুরু।

এগারো ক্লাসের প্রথমদিন শুভ্রবাবু বাংলা পড়াতে এসে বলেছিলেন, “ রবীন্দ্রনাথ লিখে গেছেন আরম্ভেরও আরম্ভ আছে যেমন প্রদীপ জ্বালিবার পূর্বে সলিতা পাকাইবার কাজ শুরু করিতে হয়। আজকের এই ক্লাসে আমরা কোন বইপত্তর ছাড়াই সেই সলিতা পাকাইবার কাজ করব।” সেই রকমই আজকের এই বেড়াতে বেড়ানোর সলিতা পাকানোর কাজ শুরু হয়েছিল তিন মাস আগে। অগস্ট মাসের শুরুতেই মনে পড়ল দিওয়ালির সময় কোথাও একটা বেড়াতে যেতে হবে। স্নিগ্ধাকে বললাম ছেলেকে জিজ্ঞেস করতে যে ও পুজোয় দিল্লি আসবে কিনা। ও যদি পুজোয় দিল্লি আসতে না পারে তবে দিওয়ালিতে আমরা ওর কাছে বেংলুর যাব। সেখান থেকে উটি এবং তার কাছেপিঠের সব জায়গায় সাত আটদিন কাটিয়ে আসব।

মাতাপুত্রের কথোপকথনের সময় মাতা পুত্রকে এই জিজ্ঞাসা করায় ছেলে তেড়ে এল, “ মা, আমি পনেরদিন আগে জয়েন করেছি চাকরিতে , কি করে এখনি বলি বল তো?” তবে দিন তিনেকের মধ্যেই জানাল যে পুজোর সময় চারদিনের ছুটি নিয়ে এক সপ্তাহের জন্য দিল্লি আসবে। তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম স্নিগ্ধাকে সুইটজারল্যান্ড দেখিয়ে আনার। গত কুড়ি, পঁচিশ বছর ধরে এটা মাথায় আছে। কিন্তু নানা কারনে হয়ে ওঠে নি। এবার প্ল্যান করা যাক।

আমি লোকটা ভীষন কুঁড়ে। তাই ভাবলাম নিজের ঘাড় থেকে দায়িত্ব খালাস করতে কোনো ট্র্যাভেল এজেন্সির সাথে কথা বলা যাক। গোটা তিনেক নামডাকওলা ট্র্যাভেল এজেন্সিকে পাকড়ালাম। তার মধ্যে একজনের সুইস-প্যারিস প্যাকেজ পছন্দ হল। কথা বলে বুঝলাম প্রায় তিন লাখ টাকা খরচ করলে তিনদিন প্যারিস আর তিনদিন সুইটজারল্যান্ড ঘোরাবে ওরা। তার সাথে নিজের ব্যবস্থাপনায় আরো দু’দিন যোগ করা যায়। শ্রীমতি বললেন, “ছেলে যেতে পারবে কিনা জিজ্ঞেস করি। “ উত্তরটা জানা ছিল, তবু বললাম, “ ঠিক আছে। শুধোও।”

ছেলের যথারীতি জবাব, “ মা, কি করে যাব? এত ছুটি এই নতুন চাকরিতে দেবে না।” তারপরই ডিটেলস জেনে বলল, “ বাবা এতবার সুইটজারল্যাণ্ড ঘুরে এসেও ট্র্যাভেল এজেন্সির সাথে কথা বলছে! বাবা সত্যিই আর কিছু শিখবে না।” ছেলের কথাকে বিশেষ পাত্তা না দিলেও একটু ইজ্জতে লাগল। তারপরই ফোন করলাম আমার কলিগ ভবানী যোশীকে। গত দশবছর ধরে কোম্পানী যতবার আমাকে বিদেশ পাঠায়, প্রত্যেকবার ভবানী আমার সঙ্গী কাম অভিভাবক হয়। ওকে বললাম আমরা সুইটজারল্যান্ড বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যান করছি, দু’তিনটে ট্র্যাভেল এজেন্সির সাথে কথা বলছি। যোশী শুধু বলল, “দাদা, এতবার সুইটজারল্যান্ড ঘুরে এসেও যদি ট্র্যাভেল এজেন্সির খোঁজ নিতে হয় তাহলে বলার কিছু নাই।” দেখলাম যে সবাই যেভাবে আমাকে আনস্মার্ট, বেওকুফ বলছে, আর কিছু করার নেই। নিজেকেই সব প্ল্যান করতে হবে। মনে পড়ল মিনাক্ষির কথা। সে আমার ফেসবুক বান্ধবী, দু’মাস আগেই নিজেরা দল বেঁধে বাইশ দিনের জন্য ইউরোপ ঘুরে এসেছে। ওর কাছে কিছু আইডিয়া পাওয়া গেল।

সুইস ভিসা সাইটে দেখা গেল যে টিকেট, হোটেল বুকিং আর দেশের ভিতরে যাতায়াতের সব বুকিং করলে তবেই ভিসা অ্যাপ্লিকেশন জমা নেবে। তার সাথে আরো অনেক কাগজপত্তর চাই। ভিসাটা দরকার শ্রীমতির জন্য, আমার এখনো ছ’মাসের জন্য ভিসা আছে। ফ্লাইট বুকিং হল, তার সাথে ট্র্যাভেল ইনসিওরেন্স। তড়িঘড়ি চারটে জায়গার হোটেল বুকিংও করলাম। তবে সেগুলো ক্যানসেল করলেও যাতে পকেটের টাকা কাটা না যায় সে রকম ব্যাবস্থাও করা হল। আর ইউরোপের পাঁচদিনের ইটালি-সুইস পাসও কেনা হল, এটা হল ইউরেল পাস, মানে পাঁচদিন ট্রেনে যথেচ্চ যাত্রা।ওহ হাঁ, আমার অনেক দিনের স্বপ্ন ভেনিস, সেখানেও যাব। অগাস্টের মাঝামাঝি সুইস এমব্যাসিতে ভিসা অ্যাপ্লিকেশন জমা দেওয়া হল, পাসপোর্টে ভিসার ছাপ লেগে আমাদের হাতে এল সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে। এবার প্রথম কাজ সবকটা হোটেল বুকিং ক্যানসেল করা, তারপর ঘোরাঘুরির ঠিকঠাক পরিকল্পনা করা। মেইল করলাম কলিগ কাম বান্ধবী এভাকে সুইটজারল্যান্ডে। বললাম আমার প্ল্যান আর চাইলাম তার পরামর্শ।

(2)

 বোর্ডিং কার্ড হাতে পাওয়ার পাঁচ মিনিটের মধ্যে ইমিগ্রেশন আর সিকিউরিটি চেক সারা। আগে ইমিগ্রেশনের জন্য ফর্ম ভরতে হত। আমাকে প্রতিবারই নিজের ছাড়াও দু’একজনের ফর্ম ভরতে হত, সবই মধ্যপ্রাচ্যের যাত্রী। এখন সেই পাট চুকে গেছে। ভিতরে গিয়ে বোর্ডিংয়ের অপেক্ষায় বসে থাকা ঘন্টাদুই। কোনও এয়ারপোর্টের ডিউটি ফ্রি শপে ঘুরতে আজকাল ভাল লাগে না। নতুনত্ব কিছু পাই না। আমার কাছে একটাই আকর্ষণ, সেটা হলো স্মোকিং জোন। তবে স্নিগ্ধাকে পাঠিয়ে দিলাম ঘুরে বেড়ানোর জন্য, কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘুরে এল, দেখলাম ডিউটি ফ্রি শপিং জোন ওকেও টানতে পারে নি। সুইস ইন্টারন্যাশনাল ১৫ মিনিটে পুরো প্লেনের বোর্ডিং করে ফেললো, তারপর সাড়ে বারোটায় আকাশে উড়ল। প্লেন উড়তে শুরু করার কয়েক মিনিটের মধ্যেই পানীয় দিতে শুরু করল বিমানবালা-বালকের দল। একটা ওয়াইন নিয়ে শেষ করার আগেই হাতে ধরাল চিকেন পিজা পাফ। সেটা আর কিছু না, পাঁউরুটির মধ্যে কয়েক টুকরো চিকেন। প্লেনের মধ্যে বলার মত ঘটনা এটাই যে আমরা দু’জনেই ঘুমোতে পারি নি। অবশ্য আমার এ’রকম না ঘুমোনোর অভ্যাস আছে, কিন্তু আরেকজনের নেই। তাই জ্যুরিখে নামার সময় সিদ্ধান্ত নিলাম যে আজকের রাইন ফল যাওয়ার প্রোগ্রাম বাতিল, সে দিনের বাকি প্রোগ্রাম পরে ভাববো। নীচে নামার আগে ব্রেকফাস্টটা ভালই ছিল। তবে পাশে পাহারাদার থাকায় ফ্রি কা ওয়াইন বেশি পান করার সাহস হয় নি। জ্যুরিখ এয়ারপোর্টে পৌঁছে প্লেন থেকে বেড়িয়ে চিরকাল প্রথম কাজ হয় স্মোকিং জোনে গিয়ে ধুম্রপান, এবার আর সেটা করি নি। সোজা গিয়ে মাটির নীচের ট্রেনে চড়লাম মেন টার্মিনাল পৌঁছনোর জন্য। দু’আড়াই মিনিটের জার্নি। এই ট্রেনে আবার রেকর্ডেড গরুর ডাকও শোনায়, যদিও ওরা নিজেদের গোশাবক দাবি করে না। ট্রেন থেকে নেমেই ইমিগ্রেশন চেকের লম্বা লাইন। লাইনে যথারীতি অাদ্ধেকের বেশি লোক জাপানী। পরে দেখলাম সব ট্যুরিস্টস্পটেই জাপানীদের আধিক্য, যেটা বুঝিয়ে দেয় গ্লোবাল ইকনমিতে ওদের রমরমা। ইমিগ্রেশন, কাস্টমস হওয়ার পর বেরোলাম ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের জ্যুরিখে কয়েক সেকেন্ডের জন্য। তারপরই পৌঁছলাম রেলওয়ে স্টেশনের টিকেট কাউন্টারে। ট্রেনের টিকেট নিয়ে ট্রেনে চড়া। সোজা জ্যুরিখ মেইন স্টেশন, যাকে এরা জার্মান ভাষায় বলে জ্যুরিখ হপবানহফ। সেখানে ট্রেন পাল্টে দু’মিনিট দুরের স্টেশন জ্যুরিখ হার্ডব্রুক। কয়েক মিনিট পায়ে হেঁটে পৌঁছলাম হোটেল জ্যুরি বাই ফাসবিন্দারে। চেক ইন টাইম দুপুর দু’টো হলেও ওরা সকাল সাড়ে আটটায় ঘর দিয়ে দিল। পরে বুঝলাম অফ সিজন হওয়ায় ভ্রমনকারীর ভিড় তেমন নেই, তাই সকাল বেলায় ঘর পেলাম। ঘন্টা কয়েক গড়িয়ে নিয়ে বেড় হলাম হোটেল থেকে। উদ্দেশ্য আমাদের কোম্পানীর ফ্যাক্টরি, বন্ধুবান্ধবদের সাথে দেখাসাক্ষাত। হোটেলের কাছেই ট্রামলাইন, কিন্তু সমস্যা হল অটোমেটেড মেশিনে টিকেট কেনার। ট্রামস্টেশনেই একজনকে পাকড়ে জোন ১১০ আর ১২১ এর চব্বিশ ঘন্টার টিকেট কেনা হল। এই টিকেটে এই দুই এলাকার মধ্যে যথেচ্চ যাতায়াত করা যায়। ট্রামে চড়ে জ্যুরিখ শহরের খানিকটা ঘুরে পৌঁছলাম ক্লসপ্লাজা। পথে রাস্তার দু’ধার দেখে বুঝলাম দেশটা হেমন্তের রঙে সেজেছে, গাছের পাতায় নানা রঙ আভাষ দিচ্ছে শীতের আগমনের। ঝরে পড়ার আগে রঙের খেলা। পরের দশদিন ধরে এই রঙ আমাদের নেশা ধড়িয়ে দিয়েছিল। ক্লস প্লাজা থেকে ২০/২৫ মিনিট বাসে চেপে পৌঁছলাম ফেলান্ডান, তবে পথে গ্রিফেন সীর রূপ আর তার কাছের পাহাড়ের উপর জঙ্গলের রঙ দেখে অভিভূত। সুইটজারল্যান্ডে সব লেককেই ওরা সী বলে। ফেলান্ডানে আমাদের কারখানা প্রায় পঞ্চাশ বছরের পুরনো, কোম্পানির দুই বিলিয়ন ডলারের ব্যাবসার প্রায় চল্লিশ ভাগই এখান থেকে। তবে সে নিয়ে না লেখাই ভাল, বেড়ানোর গল্পে এসব এলে লেখার স্বাদ গোলমেলে হয়ে যায়। তাই শুধু এ’টুকু বলব বন্ধুদের সাথে আড্ডা আর লাঞ্চ বেশ ভালই হল। এভা বলল যে পরদিন সকাল সাড়ে আটটায় গাড়ি নিয়ে আমাদের হোটেলে আসবে।বিকেলে হোটেল ফিরলাম ট্রেনে। পথে কিছু খাবারদাবার খেয়ে ঘরে এসে ঘুম। সুইটজারল্যান্ডের সন্ধ্যে ছ’টা, মানে দিল্লির রাত সাড়ে দশটা, আমাদের ঘুমের সময়।(ক্রমশ:)

 

 

 

 

v

Leave a Reply