পিউ দাশের গল্প ‘প্রেম’

পিঊ দাশ

“হোলি হ্যায়!”

দূর থেকে ভেসে আসে কাদের যেন চিৎকার।

সেই শব্দকে ছাপিয়ে ওঠে ধ্রুবর গলা।

“অসম্ভব!” চেঁচিয়ে ওঠে ধ্রুব। “অসম্ভব!”

ওর কপালের উপরের শিরা ফুলে ওঠে। নাকের পাটা ফুলে ওঠে। লাল হয়ে ওঠে ওর মুখ।

“কি মনে করিস তুই আমাকে? কি ভাবিস?” প্রবল তিক্ততায় চাপা গলায় ওর জিজ্ঞাসা কঠোর হয়ে বাজে অসীমিতার কানে।

“কিছু চাওয়ার নেই আমার? কিছু আশা করার নেই? মানুষ ভাবিস না আমায়?” কেঁপে যায় ওর গলা। হঠাৎ বুজে আসে কন্ঠস্বর।

বলে, “প্লিজ! প্লিজ সীমি! প্লিজ! প্লিজ! আর পারছি না আমি। আর-”

অসীমিতা কাছে গিয়ে ওর মাথাটাকে বুকে টেনে নিলে বাধা দেয় না, বলে, “কিছু চাই না আমি। শুধু তুই- শুধু-”

অসহায়ের মত কাঁদে ও। বলে, “পারছি না আর আমি। পারছি না।”

ওর মাথাটাকে সজোরে বুকে চেপে ধরে থেকে অসীমিতা ভাবে, পারছি না! পারছি না!

একফোঁটা জল নেমে আসে গাল গড়িয়ে ধ্রুবর এলোমেলো চুলের উপর।

 

গলার উপরের চিটচিটে ঘামের পরতের উপর ধ্রুবর গরম নিঃশ্বাস পেঁজা পেঁজা হয়ে জমে ওঠে যেন। ওর ঘাড়ের কাছের ঘনচুলের মধ্যে দিয়ে ডানহাতের আঙুলগুলো চালিয়ে দিয়ে চোখ বোজে অসীমিতা।

পরে ধ্রুবর ঠোঁটে ঠোঁট রেখে চুমু খায় ক্ষুধার্তের মত।

ধ্রুব ফিরিয়ে দেয় সেই চুমো।

ধ্রুব চুমো দেয় যেন প্রার্থনা করার মত করে। আবেদনের মত করে।

বাইরে উত্তাল হয়ে ওঠে দোলখেলা।

 

বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যায় সেদিন অসীমিতার। কখনো কখনো ইপ্সিত অফিস থেকে এসে যায় তার আগেই। বেশিরভাগ দিন ওর আরো দেরি হয়।

কথা ওরা কম বলে আজকাল। ইপ্সিত ব্যস্ত থাকে খুব অফিসের কাজ নিয়ে। অসীমিতা ভেবে পায় না কি বলবে। কোথায় শুরু করবে। কতকিছু বলার আছে ওর।

কিছুই বলা হয় না।

রাতের অন্ধকারে, বিছানার উপর, বেডসাইডল্যাম্পটা অফ করে অবশেষে যখন ওকে বুকে টানে ইপ্সিত, সহজেই যায় ও।

ইপ্সিতের বুকে মাথা রেখে ওর হৃদপিন্ডের অটল গম্ভীর ধুকপুক শুনতে শুনতে শান্ত হয়ে আসে যেন ওর নিজের চঞ্চল হৃদয়।

ঘুম নেমে আসে চোখে।

পরেরদিন ধ্রুব বলে, “ইপ্সিতকে বলতে তো হবেই একদিন। কতদিন লুকোতে পারবি?”

না জানালে ক্ষতি কি? -মনে মনে ভাবে অসীমিতা। নাই বা জানলো ইপ্সিত। এই তো কটা দিন মাত্র। নাহয় হেসে-খেলে পুরোনো দিনগুলোর মত করে কাটিয়ে দেওয়া গেল যে কটা দিন হাতে পাওয়া যায়। জানাতেই হবে?

জানার পরে অনে-ক কষ্ট পাবে ইপ্সিত।

 

পরে, ধ্রুব যখন ওর ঠোঁটে ঠোঁট রাখতে যায়, শিউরে উঠে, চমকে সরে যায় ও।

ধ্রুব দুইহাতের তালু সামনে বাড়িয়ে দিয়ে আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করে তখন। বলে, “সরি সরি! ঠিক আছে। সরি আমি।”

ওর মুখের ভঙ্গিতে চকিতের জন্য যে বেদনার আভাস খেলে যায় তা চোখ এড়ায় না অসীমিতার। ব্যথায় মোচড় দিয়ে ওঠে ওর বুক।

“না।” বলে ও, “না! স্বার্থপর আমি। স্বার্থপর!” ধ্রুবর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে মুখ লুকিয়ে কাঁদে ও ছেলেমানুষের মত। আর ধ্রুব যখন ওর কপালে, চোখের উপর, গালে, স্নেহের চুম্বন এঁকে দেয়, বাধা দেয় না ওকে।

“শ্-শ্-শ্!” আওয়াজ করে ধ্রুব। বলে, “জানি তো আমি, তুই স্বার্থপর। জেনেশুনেই সেই কলেজে প্রেমে পড়েছিলাম।”

“কেন পড়লি?” ধ্রুবর শার্টের মধ্যে মুখ গুঁজে অর্ধস্ফুটস্বরে বলে অসীমিতা। “কেন তুই? কেন ইপ্সিত?”

“আঃ!” হাসিমাখা স্বরে বলে ধ্রুব। “ইপ্সিতের ক্ষতি হয়নি কিছু তাতে। ভালবেসেছিলি তো ওকে কলেজে। আমিই-”

কোনওক্রমে হাতটাকে ওর আলিঙ্গনের মধ্যে থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ওর মাথায় টুক্ করে চাঁটি মারে একটা অসীমিতা। আর ফুঁপিয়ে ওঠে।

 

রাতেরবেলা সেদিন ফোনে অসীমিতার শাশুড়িমা কথাচ্ছলে বলেন, “তোমার পিসশাশুড়ি ফোন করেছিল, টুবুনের বৌ-এর বাচ্চা হবে। চারমাস হয়ে গেছে নাকি! তোমার বিয়ের তিনবছর পরে বিয়ে হল তো ওর-”

অনুযোগটা অনুচ্চারিত থাকে, অস্পষ্ট থাকে না।

 

বসার ঘরে সোফায় খবরের কাগজে মুখ গুঁজে থাকে ইপ্সিত। যেন- শুনতে পায়নি। যেন বুঝতে পারেনি কিছু।

“টুবুনের বাচ্চা হবে নাকি।” নরমস্বরে বলে অসীমিতা, আর নীরবে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে।

ঘাড় ঝাঁকায় ইপ্সিত।

তারপর পেপার থেকে মুখ তুলে তাকায় ওর মুখের দিকে।

পলকের জন্য ওর দু’চোখে তীব্র ক্ষুধার ছবি ভেসে ওঠে যেন। তারপর- সোজা হয়ে যায় ওর মুখের প্রতিটা রেখা।

ছোট্ট একটা হাসি হাসে ও।

কেমন শ্রান্ত, ক্লান্ত দেখায় হাসিটাকে।

নিরপরাধ হাসিটা অসীমিতার মাথায় আগুন জ্বালিয়ে দেয়।

“তোমার মা আমায় বাচ্চা তৈরীর মেশিন ভাবতে পারে। কিন্তু, অন্য কাজ আছে আমার। টুবুনের বৌএর মত বাড়ি বসে থাকি না আমি!” ঝাঁঝিয়ে ওঠে ও।

ওর বাক্যের আকষ্মিক তীব্রতায় হতচকিত হয়ে যায় যেন ইপ্সিত মুহূর্তের জন্য। তারপর কঠোর হয়ে ওঠে ওর চোয়াল। “বাচ্চা বানানোর মেশিন!” নিষ্ঠুর গলায় বলে ও। “ওরকম কোন ভুল ধারণা যে মায়ের তোমার সম্পর্কে নেই তাতে সন্দেহ কোরো না। চারবছরে একটা বাচ্চাও উৎপাদন হল না যখন!”

গলার কাছে দলা পাকিয়ে ওঠে কিসের যেন। ইপ্সিতের মুখ সাদা হয়ে ওঠে মুহূর্তের মধ্যে।

কোলের থেকে সাবধানে পেপারটা টেবিলে নামিয়ে রেখে, আস্তে আস্তে অসীমিতার পাশে এসে বসে ও।

এমন আস্তে আস্তে, যেন অসীমিতা ভয় পাওয়া, আদরের পাখি একটা কোন। একটু চমক লাগলেই উড়ে যেতে পারে।

সাবধানে, অতি ধীরে, ওর ঘাড়ের পিছনে ঠান্ডা হাত রাখে একটা। আস্তে কাছে টেনে নেয় ওকে। ওর নিচু হয়ে থাকা মুখটাকে রাখে নিজের বুকের উপরে। ওর মাথার উপর রাখে নিজের চিবুক আলতো করে। বলে, “সরি! সরি!”

ওর মুখের দিকে তাকাতে পারে না অসীমিতা। বলতে পারে না, “না!” বলতে পারে না, “স্বার্থপর আমি। স্বার্থপর!”

কোনমতে ডিনার শেষ করে নরম বিছানায় শুয়ে পড়ে ও। বেডসাইড ল্যাম্পের নরম নীল মায়াবী আলোয় ছায়া ছায়া লাগে সমস্ত অস্তিত্বকে। মনে পড়ে বিয়ের পরের দিনগুলোর কথা। বছরতিনেক কোন ইস্যু নেবে না ঠিক করেছিল ও আর ইপ্সিত দুজনে মিলেই। তারপর ছিল ওদের চেষ্টা করার কথা। দুরন্ত-পাজি ছেলে চাই একটা, বলেছিল ইপ্সিত। দুরন্ত-পাজি মেয়ে, বলেছিল অসীমিতা।

ইপ্সিত কি ভুলে গেছে, তিনবছর পেরিয়ে গেছে আটমাস আগে ওদের বিয়ের? ভোলেনি তো।

ইপ্সিত কি ভুলে গেছে ওদের সেই দিনগুলোর কথা? আলোচনার কথা? প্ল্যানের কথা?

জিজ্ঞাসা করা যায় না।

নরম নীল আবছা আলোয় আলো-আঁধারি ঘরের দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকে অসীমিতা শ্রান্ত চোখে। আর, মনে ভাবে- সন্তান!

নিজের অর্থহীন অস্তিত্বকে নবরূপে দীর্ঘায়িত করা পৃথিবীর বুকে। নিজের একটা অংশকে সঞ্চিত করা।

নিজের সন্তান! অসীমিতার সন্তান। ওর আর ইপ্সিতের একত্রিত অংশ!

ন’মাস সময় লাগে তাকে পৃথিবীতে আনতে।

পরেরদিন অফিসে ধ্রুব যখন বলে, “বলতে তো হবেই ইপ্সিতকে একদিন।” ঝাঁঝিয়ে ওঠে অসীমিতা। “চুপ কর! চুপ কর!” ঘূর্ণি হাওয়ার মত বেরিয়ে যায় সেখান থেকে।

ডাক্তার বলেন, “দেখুন ! আপনার স্বামীকে তো….. ”

“না!” বলে অসীমিতা। “আমাকেই বলুন যা বলার।”

ডাক্তার চোখ থেকে চশমাটা খুলে বাঁহাতের বুড়োআঙুল আর তর্জনীতে নাকের উপর দু’ভ্রূর মাঝটা চেপে ধরে থাকেন একমুহূর্ত।

শেষপর্যন্ত জানাতেই হয় ইপ্সিতকে।

হবেই, জানত অসীমিতা।

ফাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ইপ্সিত ওর মুখের দিকে। একমুহূর্ত। আরেকমুহূর্ত। কতযুগ যেন।

শেষটায়, ওর মুখের থেকে চোখ সরিয়ে ফাঁকা দেওয়ালের দিকে তাকায় ও। “সন্দেহ যে একেবারে-” একটা বড় ঢোঁক গিলে থেমে যায় ও। চোয়ালটা দপ্ দপ্ করে ওঠে। একটু থেমে থেকে বলে, “কতদিন তুমি- কতদিন?”

“আটমাস।” ফিসফিস করে বলে অসীমিতা।

ইপ্সিতের মুখের দিকে তাকাতে পারে না ও। কিন্তু ইপ্সিতের চওড়া বুকে মাথা গুঁজে সমস্তকিছু, যাকিছু বাস্তব, যাকিছু অনিবার্য, সমস্ত কিছুকে ভুলে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছা জাগে ওর মনে।

হাসার অল্প চেষ্টা করে বলে, “ক্ষমা করে দিও পারলে। আমি-”

গলা শুকিয়ে আসে অসীমিতার। কাঁপা গলায় বলে, “মনে আছে? ‘মেঘে ঢাকা তারা’র নীতার বাঁচার জন্য আর্তনাদকে ‘মেলোড্রামাটিক বলেছিলাম বলে ‘গাধা’ বলেছিলে আমাকে?” একটা ঢোঁক গিলে নিয়ে বলে, “ইপ্সিত! ইপ্সিত! বাঁচতে চাই আমি। আমি বাঁচতে চাই!”

ঠিক আটচল্লিশ দিন পরে নামী হাসপাতালের দামী কেবিনে ফ্যাটফ্যাটে সাদা বিছানায় শুয়ে অসীমিতা বিছানার পাশে বসে থাকা ইপ্সিতের একটা হাতকে নিজের রোগজীর্ণ দু’হাতে জড়িয়ে ধরে বলে, “তোমার জীবনে ভিলেন হয়ে গেলাম।” চোখের কোণ থেকে জল গড়িয়ে আসে একফোঁটা, হাসিমুখে বলে, “নাকি ভ্যাম্প? ট্র্যাজিক হিরোইন?” তারপর ফুঁপিয়ে ওঠে হঠাৎ, “ভুলে যেওনা, ভুলে যেওনা।”

ইপ্সিত মুহূর্তের জন্য চেপে ধরে ওর হাত, তারপর ধীরস্বরে বলে, “ডাক্তারবাবু কথা বলতে মানা করেছেন।”

ধ্রুব হাসপাতালের করিডরে দাঁড়িয়ে থাকে মাথা নিচু করে। একজনকেই ঢুকতে দেয় রোগীর ঘরে।

দুদিন পরে লাল চোখ খুলে অসীমিতা বলে, “একটা-একটা কথা বলার ছিল তোমায়।”

ওর বেদনায় নীলচে হয়ে থাকা মুখটার দিকে চেয়ে ইপ্সিত ঠোঁট চিপে চাপা নিঃশ্বাস ফেলে একটা। বলে, “পরে বললে হয় না? কষ্ট হচ্ছে তোমার এখন।”

“না!” বলে অসীমিতা, “না, আর হয়তো সময় পাবো না। বলা হবে না তোমায়। মরেও শান্তি পাব না।”

ওর চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়া জলের ফোঁটাকে ডানহাতের তর্জনীতে নীরবে মুছে নেয় ইপ্সিত।

খ্যাসখ্যাসে গলায় থেমে থেমে অসীমিতা বলে, “-রোগটার কথাও- ভেবেছিলাম- বলব তোমায়। কিন্তু- আমাদের বিবাহ-বার্ষিকীর তিনদিন আগে- তুমি মুকুটমণিপুরে রিসর্ট বুক করেছিলে। উইক-এন্ডে- বলা হয়নি তোমায়। আর ”

নীরব থাকে ইপ্সিত।

“কিছু বলো ইপ্সিত।” বলে অসীমিতা।

তারপর হঠাৎ বলে, “আমি কিস করেছিলাম ধ্রুবকে।”

ইপ্সিতের স্থির মুখের দিকে তাকিয়ে তাড়াতাড়ি বলার চেষ্টা করে, “একদিন- একদিন শুধু। যেদিন ডাক্তার বলেছিল, আর আশা নেই- আমি- আমি-”

মুখ নিচু করে অসীমিতার কপালে ঠোঁট ছোঁওয়ায় ইপ্সিত।

কী বোঝে কে জানে। আশ্বস্ত হয়ে শ্রান্ত চোখ বোজে অসীমিতা। শক্ত করে চেপে ধরে ইপ্সিতের হাত।

চারদিন পরে শ্মশান থেকে বেরিয়ে ইপ্সিত দেখে, গঙ্গার ধারে বটগাছটার নিচে একটা জ্বলন্ত সিগারেট দু’আঙুলের ফাঁকে ধরে দাঁড়িয়ে আছে ধ্রুব। ইপ্সিতের দিকে তাকিয়ে আছে।

কেউ ওরা কথা বলে না পরস্পরের সাথে।

ফোনটা আসে তিনবছর পরে। দোলের চার দিন আগে।

ধ্রুব বলে, “শুনলাম নাকি বিয়ে করছিস?”

ঘোঁত করে গলার মধ্যে শব্দ করে একটা ইপ্সিত। জিজ্ঞাসা করে, “আমার নম্বর কোথা থেকে পেলি?”

ফোনের ওপাশে ধ্রুবর শীতল হাসি শোনা যায় না তত ভাল, যত স্পষ্ট অনুভব করা যায়।

কথার উত্তর দেয় না ধ্রুব। বলে, “তোকে ফোন করেছিলাম শুধু জানানোর জন্য। সীমির সাথে শুয়েছিলাম আমি। ওর রোগটা ধরা পড়ার পরে, দোলের দিন ছিল সেদিন, মনে আছে—প্রথমবার যখন—। বড় অসহায় হয়ে পড়েছিল মেয়েটা। আঁকড়ে ধরেছিল আমাকে। সব কষ্ট, সব বেদনা শেয়ার করেছিল তো আমার সঙ্গে! বুঝতেই পারছিস, ফিজিকালিটিটা শুধু  ” একটু থেমে শীতলতর কন্ঠে বলে, “মানা করেছিল আমায় তোকে জানাতে। কেঁদেছিল। কিন্তু, নতুন বিয়ে করছিস যখন- শোকটা যখন ভুলতে পেরেছিস- এটা এমন বড় কোন শকার হবে না আশা করি। কনগ্রাচুলেশনস্! নতুন স্ত্রী দীর্ঘজীবি হোক।”

ফোনটা ধ্রুব কেটে দেয় আচমকাই। ইপ্সিত ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকে দূরের দিকে।

বিয়ের খবরটা বাজে কথা।

সম্বন্ধ একটা এসেছে বটে।

মেয়েটার নাম সীমন্তিকা।

সীমন্তিকা ইপ্সিতের চোখে সোজা সাদা চোখ রেখে বলেছিল, “সবে একটা রিলেশনশিপ থেকে বেরিয়েছি। এখনই বিয়ের ইচ্ছে ছিল না আমার। জাস্ট মা-বাবা আর-” একটু থেমে একটু দ্বিধাগ্রস্তসুরে বলেছিল, “তেত্রিশ বছর বয়স হয়ে গেছে আমার। কিন্তু ও এখনও রেডি নয় বিয়ের জন্য। কেরিয়ার- পড়াশোনা করতে চায় আরও। তাই-”

বলেছিল, “-স্ত্রীর কর্তব্য করব যথাসাধ্য। ভালবাসতে পারব কতদূর, জানিনা। আপনি কি-?”

অথচ ধ্রুবটা-

কলেজলাইফ থেকেই ওর প্রতি একধরণের করুণা অনুভব করে এসেছে ইপ্সিত।

বেচারা ধ্রুব!

সীমির চিরদিনের বিশ্বস্ত সাথী।

আজ, ইপ্সিত সীমিকে ভুলে যেতে পারে মনে করে ক্ষেপে গেছে। ধ্রুব কি বুঝবে? একতরফা প্রেম ছিল ওর। সীমি ভালবেসেছিল ইপ্সিতকে। সে ভালবাসা যে পেয়েছে সে ভুলতে পারে না কখনো। অন্য কাউকে  চাওয়ার কথা, ছোঁওয়ার কথা স্বপ্নেও মনে করতে পারে না ইপ্সিত। ধ্রুব বুঝবে না এটা।

চোখ বুজে সীমির শেষ স্বীকারোক্তিটাকে মনে করার চেষ্টা করে ইপ্সিত।

সীমি শোয়নি ওর সাথে। চুমু খেয়েছিল একটা শুধু।

মুহূর্তের দুর্বলতায়।

ধ্রুবর উপর কিন্তু রাগ করতে পারে না ইপ্সিত।

মায়া হয় শুধু, প্রবল মায়া!

চারদিন পরে সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে মিশে ইপ্সিতের ফ্ল্যাটে আসে ধ্রুব।

আবীরের রঙ-বেরঙের গুঁড়ো তখনও মিশে আছে গলির বাতাসে।

যতটা অবাক হওয়ার কথা ছিল, ধ্রুবর এই হঠাৎ আগমনে ততটা যেন অবাক হয় না ইপ্সিত। একটা সিগারেট অফার করে ওকে। দুজনে দাঁড়ায় ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে পাশাপাশি। সিগারেটের জোড়া ধোঁয়া ওঠে পাকিয়ে।

ধ্রুব বলে, “স্মোকিং করা ছেড়ে দিয়েছিলিস না কত ঢাকঢোল পিটিয়ে?”

ইপ্সিত নাকের মধ্যে থেকে ধোঁয়া ছাড়ে ফুরফুর করে খানিক। তারপর হেসে বলে, “হ্যাঁ। দিয়েছিলাম তো। সীমির ঘ্যানঘ্যানানিতে।”

তারপর, ব্যালকনির নিচে রাস্তা দিয়ে চলা গাড়ির হর্ণে অস্বস্তিকর নীরবতাটা আরো ঘনীভূত হয় যেন।

ইপ্সিত ভাবে, কিছু বলা উচিত।

“সীমি নিজেকে স্বার্থপর বলত।” হঠাৎ বলে ধ্রুব, “কাকুতি-মিনতি করেছিল আমার কাছে। কিছুতেই না জানাতে তোকে।”

শহরের ধোঁওয়ায় নোংরা কালো হয়ে যাওয়া দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে গলার মধ্যে তিক্ত হাসির মত শব্দ করে একটা।

“তোর কথাই ভাবত। সদাসর্বদা। ডাক্তারের কথা শুনে ভয় পেয়েছিল। নিজের জন্য। আর, তোর জন্য। কি করে জানাবে তোকে। মরণরোগ ধরেছে ওকে। মরতে হবে। সেটা যেন ওরই দোষ। তোর জীবন নষ্ট হয়ে গেল ওর জন্য। বলেছিল আমায়।”

“তোকে কি প্রচন্ড হিংসা করি আমি, জানিস কি তুই?” শান্ত গলায় বলে ধ্রুব।

“নিজেকে স্বার্থপর ভাবত। ঠিকই ভাবত। যাদের ভালবাসে তাদের কষ্ট দিতে পারবে না। আমায় ভালবাসে না! আমি ভালবাসি! আমি কনভিনিয়েণ্ট- সারাটা জীবন- শুধু ব্যবহার করে গেল আমাকে। মরণে পর্যন্ত! তবু-” একটু থেমে থেকে হাল ছেড়ে দেওয়া কন্ঠে বলে, “-ম্যাসোখিস্ট আমি।”

সিগারেটে বড় একটা টান দেয় তারপর। রেলিং আঁকড়ে থাকা ওর হাতের আঙুলগুলো টানটান সাদা হয়ে ওঠে। রঙ লেগে আছে ওর নখের কোনে। বলে, “তোর কাছে আজ এসেছিলাম কনফেস করতে।”

“সীমি স্বার্থপর ছিল। মাঝে মাঝে মনে হয় ঘৃণা করি ওকে। কিন্তু , আমিও স্বার্থপর ছিলাম। তোকে ফোনটা করেছিলাম রাগের মাথায়। তুই সব পেলি। সীমিকে- সব-সব! আবার নতুন জীবন তৈরী করতে চলেছিস। আবার তোর ফিলিংস যাতে হার্ট না হয় তার ব্যবস্থাও করতে হবে আমায়! যেখানে আমি- শুধু দিয়ে গেলাম। কখনও পেলাম না কিছু। আমার বিছানায়। আমার আলিঙ্গনে- আমার বুকে শুয়েও একমূহুর্তের জন্য আমায় ভুলতে দিল না তোর উপস্থিতি। তোর গুরুত্ব! সতী তো ছিল না। সৎও ছিল না! তবু ভালবাসল না আমায় । ব্যবহার করল। ভালবাসল না! আর আমি!-” বুক খালি করে নিশ্বাস ছাড়ে একটা ধ্রুব, “তোর  মত জীবনে এগিয়েও যেতে পারলাম না! প্যাথেটিক সত্যি।”

একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিসফিস করে বলে তারপরে, ” কিংবা কে জানে? পাইনি বলেই আজও চাই হয়তো। পেয়ে গেলে তো চাওয়া ফুরিয়েই গেল!”

হাল্কা হয়ে আসে ওর গলার স্বর তারপর। ” কিন্তু, আমিও ব্যবহার করেছিলাম ওকে! আমার কাছে এসেছিল, কাঁদতে, নিজের কষ্ট জানাতে। নিজের সাধের পতিদেবতার কাছে যায়নি! ইল্যুশনই হোক আর যাই হোক, কয়েকদিনের জন্য পেয়েছিলাম তো ওকে সম্পূর্ণ নিজের করে! কঠিন একটা ব্যথা- যা শুধু আমাদের দুজনের- তোর উপরে রাগ করার অধিকার নেই আমার! ব্যবহৃত হতে পেরে খুশি হয়েছিলাম যখন- প্রবল বেদনার মধ্যেও নিষিদ্ধ ফলের মতন ” সিগারেটের শেষ অংশটুকুকে ব্যালকনির রেলিং-এর ধারে ফেলে পায়ের চটি দিয়ে ঘষে নিচে ফেলে দেয় ও। ” সরি বলতে এসেছিলাম তোকে। ক্ষমা প্রার্থনা করতে এসেছিলাম। তোকে ব্যথা দেওয়ার অধিকার ছিল না আমার।”

দরজার অটোমেটিক লকটা খুব মৃদু একটা শব্দ করে বন্ধ হয়।

ইপ্সিত দাঁড়িয়েই থাকে ব্যালকনিতে।

সিগারেট ফোঁকার অভ্যেসটা বাদ দিলে, ইপ্সিতকে হেল্থ কনশাসই বলতে হবে। কলেজে হেল্থ-হেল্থ বাতিকটা আরও বেশি ছিল ওর।

ফুচকা, ঘুগনি, আলুকাবলি খেতে খুব ভালবাসত অসীমিতা।

ইপ্সিত ছিল তাদের বিরূদ্ধে।

অসীমিতা কোনদিন ওর সামনে খায়নি ওসব- ফুচকা, ঘুগনি, আলুকাবলি।

কিন্তু খেত।

ধ্রুবকে দিয়ে লুকিয়ে আনিয়ে খেত।

জানত ইপ্সিত তা।

কিছু বলত না।

অসীমিতা জানত যে ইপ্সিত জানত।

শুধু, সরাসরি, মুখোমুখি বোঝাপড়াটাকে এড়িয়ে চলত ওরা দুজনেই।

কলেজ ফাংশনের দিন মায়ের পুরানো শাড়ী পরে গিয়েছিল একটা অসীমিতা। ফেঁসে গিয়েছিল শাড়ীটা। জানত না সেটা ইপ্সিত। পরে দেখেছিল, পাল্টে গেছে ওর শাড়ী। ধ্রুব তড়িঘড়ি বাড়ি গিয়ে এনে দিয়েছিল অসীমিতাকে ওর মায়ের একটা শাড়ী।

অসীমিতা বলেছিল, “বিজি ছিলে তুমি ওদিকে ” অনির্দেশ্য দিক নির্দেশ করেছিল একটা ওর সুললিত বাহুর ভঙ্গিমায়, ” তাই আর কিছু বলিনি তোমায়।” হেসে বলেছিল, “ভাল না শাড়ীটা?”

অসীমিতার ভাই যেদিন স্কুলে খারাপ রেজাল্ট করে ঘণ্টাখানেকের জন্য উধাও হয়ে গিয়েছিল স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে- ইপ্সিত জানতে পারেনি ঘটনাটা। পরে ধ্রুবর মুখে শুনেছিল।

অসীমিতা বলেছিল, “তোমায় আর জ্বালাইনি। ধ্রুবর সাথে মাঝে মাঝে কথা বলে তো ফোনে ভাই- তা-ই ওকেই—”

সোফায় আধশোয়া হয়ে ক্লান্ত চোখ বুজেছিল ইপ্সিত।

অসীমিতা ভালবাসত না ওকে।

এইপ্রথম এমন খোলামেলা ভাবে কথাটা মনে করেছিল ইপ্সিত।

ভাবতে ইচ্ছা করে না। না ভাবা গেলেই ভাল ছিল।

কিন্তু, সত্য মাঝে মাঝে বিশ্রীভাবে তাড়া করে মানুষকে। কতসময়, কতসহজেই, কত সহজসত্যকে আমরা এড়িয়ে যাই। আসলে, বেশিরভাগ সময়ই তো- সবসময়ই- ঠিক করে বলতে গেলে আমরা সত্যকে এড়িয়ে চলি।

কিন্তু, তারমধ্যেও সে ঠিকই মাথা ফুঁড়ে ওঠে, আর আমাদের বিশ্বাসে সন্দেহ জাগায়।

আসলে, অসীমিতা নিজে কোনদিন সন্দেহ করেনি ইপ্সিতের প্রতি ওর প্রখর ভালবাসাকে।

ও নিজেও বোধ হয় ভাবত ধ্রুবকে ব্যবহার করছে ও।

আর পাঁচজনের সাথে সতিত্বের ধারণা মিলত না অসীমিতার। কিন্তু, ওর মরালিটি প্রখর ছিল। ভালবাসা প্রখর ছিল।

আর, মৃত্যুর চারদিন আগে, ইপ্সিতের আঙুলে আঙুল জড়িয়ে সীমি বলেছিল, “-কিস করেছিলাম ধ্রুবকে।”

শুধু ‘কিস’। শুধু চুম্বন! মৃত্যুতেও সত্যকে পায়নি তবে ইপ্সিত! সীমির সততা, সীমির সমর্পণ পায় নি।

দুর্বলা সীমি, অসহায় সীমি, ক্রন্দনরতা সীমি- সীমির সততা, সীমির নির্বিকার নিষ্ঠুরতা- সীমির সমস্ত রঙ—ধ্রুব একা পেয়েছে সব।

আর ভেবেছে, পায়নি কিছু। হাসির প্রেত ফুটে ওঠে একটা ইপ্সিতের ঠোঁটে।

সীমন্তিকা ইপ্সিতের চোখে সোজা সাদা চোখ রেখে বলেছিল, ” সবে একটা রিলেশনশিপ থেকে বেরিয়েছি। তেত্রিশ বছর বয়স হয়ে গেছে আমার। কিন্তু ও এখনও রেডি নয় বিয়ের জন্য। কেরিয়ার- পড়াশোনা করতে চায় আরও। তাই

বলেছিল :

” স্ত্রীর কর্তব্য করব যথাসাধ্য। ভালবাসতে পারব কতদূর, জানিনা।”

ভালবাসা আর চায় না ইপ্সিত। ইল্যুসন ওটা। হরমোনাল হ্যালুসিনেশন। এখন ইপ্সিত বন্ধুতা চায়। সাদা ধবধবে বন্ধুতা। নানা রঙে রঙিন। ধ্রুব পেয়েছে যা। যা ওকে পাগল করে রেখেছে এখনও।

দেওয়ালে ঝোলানো সীমির ফটোটার সামনে দাঁড়িয়ে ইপ্সিত মোবাইলটা কানে তুলে নেয়।

” পিনুমাসি, আমি রাজি আছি। কতদিন আর একা-একা থাকব ? হ্যাঁ-হ্যাঁ। সীমন্তিকাকে জানিয়ে দেব আমি। হ্যাঁ হ্যাঁ ফোন নম্বর আছে আমার কাছে। -হ্যাঁ ঠিক আছে। আচ্ছা। আচ্ছা, রাখছি। হ্যাঁ ভালই আছি। হ্যাঁ রাখছি। না, মাকে তুমিই জানিয়ে দিও। রাখলাম।”

এত সন্ধ্যাতেও দূরে ডাক শোনা যায়,

“হোলি হ্যায়!”

 

One comment

Leave a Reply