মৌসুমি ভৌমিকের গল্প ‘আমার দুর্গা !’

মৌসুমি ভৌমিক
“উফফফ...।এতো টুকু তেল পড়ে আছে? এতে কি আর রান্না হবে? আজকে কাজে বেরোতে আবার দেরী হয়ে যাবে...মাআআ...আমি দোকান বেরোচ্ছি...।“.........মধুজার সকাল প্রায়ই শুরু হয় এইভাবে। নুন আনতে পান্তা ফুরনো হয়তো তাদের সংসার নয়। কিন্তু স্বভাব তাদের গুছানো নয়। দাদাটা সকাল থেকেই বিড়ি মুখে দু কাপ চা ধ্বংস করে রাজা উজির মেরে যাচ্ছে, ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোতেই ওর আনন্দ বেশি, আর মাস এর প্রথমে তেল চুকচুকে মুখ নিয়ে মধুজার কাছে হাত পেতে দাঁড়ানোতেও ওর লজ্জা নেই। ছোট বোন এর টাকাতো, লজ্জা করবে কেন? মধুজার কাজে দেরী হলেও বলবে না “দে আমি এনে দিচ্ছি...।“...তাহলে শ্রেণী সংগ্রামের কচকচি শুনিয়ে পাড়ার লোকজনকে শিক্ষিত করে তুলবে কখন? দু বছর প্রেমের পর জয়দীপ এরও মনে হয়েছিল “তুমি বড্ড সাধারন, তোমার সাথে বেশীক্ষণ থাকা যায় না, আগে নিজেকে অসাধারন করে তোল ।“ সাধারন – অসাধারন এর  আয়নায় আজও দাঁড় করাতে পারেনি নিজেকে। সময় কোথায় ? বাবাটা পাঁচ ছেলে মেয়ের দায়ভার নিতে না পেরে কোথায় যে চুপচাপ সরিয়ে ফেললো নিজেকে। মা চিরকাল রুগ্ন, বাকি দুই ভাইকে ফাদার স্যামুয়েলকে ধরে মিশনারি হোমে পড়তে পাঠিয়েছে । আত্মীয়দের মধ্যে অনেকে ভয় দেখিয়েছিল ফাদার স্যামুয়েল ভাই দুটোকে ক্রিশ্চান করে দিতে পারে বলে। মধুজা শোনেনি। শুনবে কেন? আগে পেটে খাবার দিয়ে প্রাণটা তো বাঁচাক ভাই দুটো , প্রাণ না বাঁচলে ধর্ম বাঁচিয়ে লাভ কি?
 
নাহ......।। এসব আর ভেবে লাভ নেই। জোরে পা চালায়। তেল কিনে বাড়ি ফিরে রান্না শেষ করেই স্নান সেরে দৌড়াতে হবে কারখানায়। তার এই আয় এই তো টানছে সংসারটাকে। মনে পড়ল চোখটাও দেখাতে হবে। কবিতা পড়তে ভালবাসে মধুজা। মনে পড়ল কবি সুব্রত পাল এর “আমার দুর্গা” র কথা। উফফফ...আজ মন এত নাড়া দিচ্ছে কেন? ভাল্লাগে না......।জয়দীপ যেদিন তার সমস্তটা নাড়িয়ে দুমড়ে মুচড়ে বেড়িয়ে গেলো, মধুজা সেদিন থেকেই নিজের মনকে কবর দিয়েছে। সেই মন আজকে এত জাগছে কেন?
 
কড়াইএ ডাল এর সাথে সাথে আজ মনটাও ফুটছে । কবিতা লেখার খাতাটা কবেই যেন সংসার এর হিসেব লেখার খাতা হয়ে গিয়েছে নিজেও টের পায়নি। মা-এর ওষুধ, দাদার বিড়ি আর মদ এর পেছনে পয়সা  জোগান, আর দিনান্তে হা ক্লান্ত শরীরটাকে টেনে নিয়ে যখন বাড়ি আসে, বোন আর দাদার অকথ্য ঝগড়ায় নিজেকে মৃত মনে হয়। বোনটা উচ্চ্যমাধ্যমিক দিয়েই কোথায় যেন একটা কাজ জুটিয়েছে , জিজ্ঞেস করলেও বলে না। শুধু চেয়ে চেয়ে দেখে বোনটা পাল্টে যাচ্ছে, পাল্টে যাচ্ছে ওর সব কিছু । মধুজা ভাবে বোনটাও কি বেঁচে থাকতে গিয়ে জন্মের ধর্মটাকে হারাল ? পাশের বাড়ির ভাড়াটে শালুকদিদি কে দেখলে মধুজার মনে হয় “তোমার দুর্গা ছবির ফ্রেমের শিউলি এবং কাশে / আমার দুর্গা এখনো আশায় কেউ যদি ভালোবাসে।“   
 
পা চালাচ্ছে মধুজা , ৯ঃ৩০ এর বাসটা ধরতেই হবে, এমনিতেই আজ অনেক দেরী হয়ে গিয়েছে। শাড়ির আঁচলে মুখটা মোছে , বড্ড গরম, প্রতি বছরই যেন বাড়ছে । জীবনটাও পুড়ছে সেই সাথে। মনে পড়ে যখন বাবা ছিল, মা এর আধুলির সাইজ এর সিঁদুর এর টিপ , আর চুড়ির রিনরিন শব্দের সাথে ডাল ফোঁড়নের গন্ধ সারা সকাল বাড়ি টাকে মাতিয়ে রাখত। স্কুল থেকে ফেরার পথে বা পড়তে বসে, পাশের খোলা জানালা দিয়ে যখন মন চলে যেত বাইরে, নীল আকাশের বুকে ভেসে বেড়ানো টুকরো টুকরো ধবধবে সাদা মেঘগুলো দেখে মনে হত কেউ যেন আকাশটাতে রূপকথা লিখেছে। পাড়ার মোড়ে বিশ্বকর্মা পূজার সাথে সাথেই বাতাসে কেমন একটা পূজার গন্ধ লেগে থাকতো । মহালয়া থেকে শুরু হত বাড়ি আর পাড়ার বান্ধবীদের মধ্যে চু কিত কিত খেলা। ঘরকুনো মনটা তখন হৃদপিণ্ডর সাথে সাথে নেচে চলত অদ্ভুত মাদকতায়। কৈশোর ছেড়ে যৌবনে পা রাখতে রাখতেই বাবাটা কেমন পালিয়ে গেলো। মধুজাদের খুশি গুলোকে বাসি করে দিয়ে। সময় গুলো হারিয়ে গিয়েছে, আজ হঠাৎ রাস্তার পাশে কাশফুল এর ঝাঁক দেখে মনে পড়ল পূজা আসছে। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া সময় আর ফেরে না। মধুজার আর এক দুর্গার কথা মনে পড়ে “তোমার দুর্গা ধুনুচি নাচের ঢ্যাম্‌ কুড় কুড় ঢাকে / আমার দুর্গা ঘুরেই মরছে দশচক্রের পাঁকে। “  
 
“ধুত্তোর …।। এখুনি চটিটা ছিঁড়তে হল? “…। বাস থেকে নামতেই মধুজার  স্বগোতক্তি। পা ঘষটে চলতে লাগল, ব্যাগ হাতড়াল সেফটিপিন এর জন্য, নাহ…। নেই।  আজ মুচিদাদা ও বসেনি। কারখানায় ঢুকতেই নতুন ম্যানেজার রীতেশের  গম্ভীর গলা , “মধুজা সন্ধ্যের পর দেখা করে যাবে।“ এই মাসে বেশ কটা দেরী হয়ে গিয়েছে। আজ হয়তো ম্যানেজার আর কাজে রাখবে না। হরিপদবাবু যখন ম্যানেজার ছিলেন, মধুজাকে স্নেহ করতেন, হয়তো তার লড়াইটাকে পড়তে পারতেন , তিনি দুর্গা পড়েন নি, কিন্তু মধুজা তার কাছে দুর্গার থেকে কিছু কম ছিল না...।“ আমার দুর্গা মেধা পাটকর, তিস্তা শীতলাবাদেরা / আমার দুর্গা মোম হয়ে জ্বালে অমাবস্যার আঁধেরা ।” মধুজার মনে আজ সময় ভিড় করে আসছে। অতীত বড়  জ্বালায়।
 
“মধুজা আমায় তুমি না দেখলে আমিই বা তোমাকে দেখি কি করে বল তো?” রীতেশের চোখ মধুজার উপর স্থির । মধুজার জীবন আজ চিতার সামনে, পুড়ছে । কারখানার চাকরিটা না থাকলে  সংসার খাদ এর কিনারায় এসে দাঁড়াবে ।  প্রাণ বাঁচাতে জীবন চিতায় পুড়তে পুড়তেই মধুজা তাকিয়ে থাকে রীতেশের দিকে...... “আমার দুর্গা আত্মরক্ষা, শরীর পুড়বে, মন না / আমার দুর্গা নারীগর্ভের রক্তমাংস কন্যা”……। রীতেশ কি  মল্লিকা সেনগুপ্তর এই দুর্গা কে চেনে?
 
“আমার দুর্গা দিন আনাআনি কিছু নেই সঞ্চয়।“……। নাহ……। এবার তো হবে। “আমি যে এখন থেকে শরীর।“ মধুজা ভাবে। সময় এর সাথে সাথে দুর্গাও কেমন বদলে যায়, বদলে যেতে বাধ্য হয় । ক্লান্ত মধুজা হাঁটে , পায়ে নতুন চটি, পুরনোটা হাতে ধরা প্যাকেটে । সেলাই করে আর কিছুদিন যদি চালান যায়। “তোমার দুর্গা অস্ত্র শানায় সিংহবাহিনী রূপ/
আমার দুর্গা কাঁদতে কাঁদতে নির্বাক, নিশ্চুপ।“……।আকাশের দিকে মুখ তুলে আজ মধুজা বিড়বিড় করে , “আমি আজ অসাধারন জয়দীপ, সংসারটাকে বাঁচানোর জন্য আমি আজকে অসাধারন হলাম, আমি আজকে দশভুজা , পারবে তুমি আমাকে ছুঁতে ?” মধুজার বুক এর ভিতর ঝড় “আমার দুর্গা ত্রিশূল ধরেছে স্বর্গে এবং মর্ত্যে
আমার  দুর্গা বাঁচতে শিখেছে নিজেই নিজের শর্তে।“ …নিজের বৃষ্টিতে নিজেই ভিজে চলে মধুজা। বেঁচে থাকা আর বাঁচানোর ধর্মের দুর্গা আজ মধুজা ।

You may also like...

Leave a Reply