মৌসুমি ভৌমিকের গল্প ‘গল্প কবিতা গল্প’

(১)

তিয়াসের কথা

মৌসুমি ভৌমিক

হঠাৎ করে ঘুমটা ভেঙ্গে যেতেই তিয়াস চেষ্টা করে বোঝার কোথায় রয়েছে সে। ঘড়ির টিকটিক শব্দ ছাড়া আর কিছু বুঝে উঠতে পারেনা সে। আস্তে আস্তে ঘুমের ঘোরটা কাটতেই বোঝে নিজের ঘরেই রয়েছে সে। বেশ কদিন ধরে দেখছে ঘুমের ঘোরে তিয়াস নিজের অবস্থান বুঝে উঠতে পারছেনা। কিছুক্ষনের জন্য মনে করতে পারেনা সে কে, কোথায় আছে। অফিসের কাজের চাপেই বোধহয়, কে জানে। এই মুহূর্তে গলা শুকিয়ে কাঠ, হাত বাড়িয়ে জলের বোতল থেকে বেশ কয়েক ঢোঁক জল খেল সে। এদিকে বুকে একটা চাপা সাফোকেশনও হচ্ছে। বেডসাইড টেবিল থেকে রিষ্টওয়াচটা তুলে নিয়ে দেখে ভোর সাড়ে চারটে বাজে। উঠে পড়ে তিয়াস, হাল্কা একটা চাদর জড়িয়ে বেরিয়ে আসে বাইরে। শীতের ঘুমন্ত কলকাতা দেখতে বড় ভালবাসে সে। পায়ে পায়ে তিয়াস বড় রাস্তায় উঠে আসে। ফুটপাথের সংসারের দিকে নজর রেখে এগিয়ে চলে। শহর সবে আড়মোড়া ভাঙ্গতে শুরু করেছে।  গভীর ঘুমের মধ্যেও কী অসম্ভব ভালাবাসায় সন্তানকে আগলে  শুয়ে আছে মা – দেখে গলার কাছে অজান্তে একটা কষ্ট পাকিয়ে ওঠে। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সে ফুটপাথের সংসারে। ঘোর ভাঙ্গে আজানের শব্দে। বাড়ি ফেরার পথ ধরে তিয়াস। অফিসেও তো যেতে হবে তাকে। মনে মনে ঘটনাগুলো সাজিয়ে নেয়, লিখতে হবে যে। ডায়েরী লেখা তার বহুদিনের অভ্যেস। যদিও বেশ কিছুদিন লেখা হয়নি। আজ ডায়েরী নিয়ে অফিস যাবে ঠিক করলো ও। কাজের চাপও কম আছে। একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পা চালাল। দিনপঞ্জিটা আজ অফিসে কাজের ফাঁকে ফাঁকে লিখে রাখবে সে।

 

১৪/০২/২০১৮, ১৪:00

ঊনিশ বছর পরঃ কী লিখতে বসেছি নিজেও জানিনা। খুবভোরে ঘুম যাওয়াতে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিলাম। ভোরেরবাতাস গায়ে লেগে অদ্ভুত ভাললাগা অনুভূতি হচ্ছিল। একটাঅজানা অনুভূতির স্রোত বয়ে যাচ্ছিল শরীর দিয়ে। একটাঅবাক করা ছেলের সাথে আলাপ হয়েছে। তার নাকি মেয়েদের প্রতি তেমন আগ্রহ নেই। কারণ তার ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে মেয়েরা নাকি মোটেও ভালো বন্ধু হতে পারেনা। তারা নাকি ছেলেদের নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাতেই ভালোবাসে। কি বিচিত্র ! খুব ভোরের শহর দেখতে দেখতে তার কথাই তো ভাবছিলাম। সে আমার ব্যাস্ত জীবনের অবসর সময়ের ফেসবুক ফ্রেন্ড ছিল।অনেকদিল হল আমাদের বন্ধুত্ত্ব। নিয়মিত অনলাইন আড্ডা আর ফোনের মাধ্যমে আমাদের বন্ধুত্ত্ব কর্ড লাইন ছেড়ে মেন লাইন ধরেছে। আজকাল আমাদের বড্ড ঘনঘন দেখাও হচ্ছে – দুজনেই অফিস থেকে ছুটির পর অপেক্ষায় থাকি। আমার জীবনের চেনা  সাদা কালো রঙ গুলোও হঠাৎ কেমন বদলাতে শুরু করেছিলো –  ঊনিশ বছর পর। হাজার রঙে বদলে যাচ্ছে আমার  আজকাল। আমি নিজেই অপরিচিত হয়ে যাচ্ছি নিজের কাছে। ভালবাসছি কি? কি জানি – কিন্তু একটা ভালবাসাকে সব রাস্তা মিলিয়ে একখানে এনে একটা ভালো বাসা দেবার মত যথেষ্ট আকাশ আমার বুকে আছে কি? বুকের ভেতরের নদীটা বড্ড অস্থির  হয়ে উঠেছে- মন নামক নদীটা।

কবিতা, কেমন আছো তুমি?

অনুভবের তীব্র পীড়নে কেমন আছো?

আজও কি  শিশির কুড়োও দুহাতে?

কিংবা কষ্টগুলোকে জমা রেখেছো বুকে?

খুব জানতে ইচ্ছে হয় জানো

না বলা কথাগুলো কিভাবে বাড়ছে স্মৃতিতে।

 

(২)

অমলেন্দুর কথা

গঙ্গার পাড়ে বৃদ্ধাশ্রম “ আশ্রয়” এ নিজের মতো করে বাস করা মানুষগুলো সবাই এক একজন ইতিহাস, সবারই  নিজের মতো গল্প রয়েছে। কেউ স্বেচ্ছায় এসেছে শেষ বয়সটুকু ভাল থাকবে বলে, কেউ এসেছে সন্তানের ঘাড়ের বোঝাটাকে নামিয়ে তাদের ভাল রাখতে। অমলেন্দু প্রথম দলের, শেষ বয়সে নিজের মতো ভাল থাকতে চান। কথায় বলে, আপনের চেয়ে পর ভালো, পরের চেয়ে পথ ভাল। অমলেন্দু নিজের পথ বৃদ্ধাশ্রমের সীমানা পার করে ভেতরে নিয়ে এসেছেন। সকাল থেকে সন্ধ্যে এখানে তাঁর সময় কখন যে চড়ুই পাখির মত ফুড়ুৎ করে  পালিয়ে যায়, নিজেও টের পাননা। ফেব্রুয়ারি মাস – প্রাকৃতিক কারণে এখনও দিন ছোট , তাই দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা প্রায় হই হই করে এসে পরে।শীত চলে   গেলেও হাল্কা ঠাণ্ডা আছে এখনও। শীতের দিনের আয়ু দেখলেই অমলেন্দুর কাছে মনে হয় রাতটার বুঝি খুব বেশি তাড়াহুড়ো থাকে দিনের আলোটুকু ঢেকে ফেলে নিজের রাজত্ব কায়েম করতে । হালকা বাতাস বইছে । ঠান্ডা একটা বাতাস হামাগুড়ি দিয়ে একটু একটু করে বয়ে যাচ্ছে শিকারী নেকড়ের মতো। চাদরের উষ্ণতা ভেদ করে শরীরের ভেতরে  পৌঁছে   যায় সেই ঠাণ্ডা পরশ । চায়ের কাপ হাতে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে ব্যালকনিতে বসেন, এখান থেকে গঙ্গাকে ভালও করে দেখা যায়। বড় প্রিয় মুহূর্ত এটা। সূর্য ডোবার সময় বড় সুন্দর লাগে গঙ্গাকে, বড় মায়াময় হয়ে ওঠে। বারান্দায় বসে এখন তিনি অদিতির কথা ভাববেন, ভাববেন তাঁর একমাত্র ছেলের কথা। আজ তাঁর একান্নতম বিবাহবার্ষিকী, ভালবাসার দিনটিতেই অদিতিকে কাছে পেয়েছিলেন তিনি। না, অদিতির ছবিতে মালা বা ফুল কিছুই চড়াননি তিনি, তাঁর কাছে অদিতি  আজও বেঁচে।

আজ হঠাৎ করে নিজেকে নিঃসঙ্গ লাগে অমলেন্দুর। একমাত্র ছেলে অরুনাংশু সিয়াটেলে সেটেলড। বড় ব্যস্ত জীবন তার। অদিতিকে শেষবারের মত হাসপাতাল থেকে বাড়িতে এনেছিলেন, ছেলেকে ফোন করে জানিয়েছিলেন। আশা অবশ্য তিনি করেননি ছেলে আসবে ছুটে অতদুর থেকে মাকে শেষ দেখা দেখতে। অরুনাংশু এসেছিলো – মায়ের স্মরণসভায়। ঠিক  তিনদিনের মাথায় সে ফিরেও  গিয়েছিলো নিজের কাজের জায়গায়। আস্তে আস্তে আত্মীয়রাও যে যার মত চলে গেল নিজের নিজের জায়গায়। আর কিছু পাবার নেই জেনেও অমলেন্দু ফাঁকা বাড়িতে কিসের অপেক্ষায় থাকতেন কে জানে। মাঝে মাঝে অবশ্য বোনের মেয়েটা আসে তাঁকে দেখতে। কিন্তু সেও তো ভাঙ্গা জীবনের খেয়ায় চড়ে বসে আছে। অদিতিকে হারিয়ে ক্রমশ অমলেন্দুর জীবন থেকে আর কিছু হারানোর ভয় থাকল না । ভিড়ের মাঝে একা থাকতে চলে এলেন আশ্রয়ে, নিজের বাড়িতে বিক্রি করে  দিয়ে। ভালই আছেন এখানে, নিজের মত।  ভাবনাগুলো আজ বড়ই চিন্তার মাঝে এসে যাচ্ছে বারবার। তাঁর ভাবনার  মধ্যেই কখন যেন দিনের আলোটুকু মুছে যেতে যেতে এক সময় গঙ্গার জলে টুক করে হারিয়ে গেল ।অমলেন্দু একটা শাল জড়িয়ে নেমে আসেন “আশ্রয়” এর লনে। কোন কিছুর এক অমোঘ মোহে তিনি বসে থাকেন । আজ যে তিয়াস আসবে- অমলেন্দু জানেন তাঁকে তাঁর ভাগ্নি বড্ড ভালোবাসে। সেও তো নাকি পরকীয়ায় কষ্টে জড়িয়েছে। আসলে মাঝে মাঝে কষ্টটাকেও কেউ জেনেশুনেই আপন করে নেয় – নিজের মত করে উপভোগ করবে বলে। তিয়াসও তাই। প্যান্টের পকেট হাতড়ে সিগারেটের প্যাকেট আর ম্যাচবক্স বের করে আনেন । “‘রাতে ঘুম আসে না অদিতি। আর ঘুমালেও গভীর রাতে ঘুম ভেঙে  যায়। তখন ছেলে আর ওর পরিবারের মুখগুলো খুব দেখতে ইচ্ছে করে। বারবার মনে করি ওদের কথা মনে  করব না, কিন্তু ভুলতে তো পারি না। সম্পর্কগুলো বালির মত জানো। মুঠো খুললেই আর নেই। সময়ের সাথে মানুষ বদলায়, বদলায় সম্পর্ক। আমি আজও তোমাকে ভালবেসেই উত্তরণের পথ খুঁজি।“

কখনো তীব্র ভালোবাসায় চিৎকার করেছি,

তুমি আছো, তুমি আছো এক বুক নিঃশ্বাসে

আমার বেঁচে থাকার জন‍্য এইকি যথেষ্ঠ নয়?

কবিতা, আমি যৌবন লুকাবো তোমার হাতে।

তুমি আমার শরীরে লেগে থাকা জরার গিঁট খুলবে।

আর আমি ইচ্ছে হলেই লিখবো তোমাকে নিয়ে।

 

(৩)

১৫/০২/২০১৮ , 00:১৫

বড় অবেলায় পেলাম তোমায়। তোমার ভালবাসার শক্তি আমার ফেরানোর নেই। পারবোও না কখনও। বড় যত্নে ইচ্ছেগুলোকে লালন করছি বুকের ভেতর – অপেক্ষার, কোন এক সময়ের সুযোগের ভালবাসাটা নীল কষ্ট থেকে লাল টুকটুকে হবার আশায়। শুনতে পাচ্ছ কি তুমি আমায়? জানি তোমায় পাব না কখনও। কিন্তু কখনও চলে গেলে তুমি হাত ধরে আমাকে থামিয়ে দেবে কি?

আমি যখন আবেগ পোড়াই অশ্লীল আগুনে

একরাশ ধোঁয়ার মাঝে হাতড়ে বেড়াই তোমার শরীর।

তুমি কি টের পাও তখন আমার ক্ষরণ আর মৃত্যু ?

অথবা রক্তাক্ত হৃদয়ের নিঃসঙ্গতা তোমাকে ছাড়া?

এক মৃত্যু বুকে চেপে ধরে চুমু খেয়ে বলি,

নাইবা পেলাম আমি আর একটা জীবন।

আমিতো ভবঘুরে , পারিজাত ফোটাবো বলে,

কবিতা – তুমি ঘুমোও, জাগি আমি।

কবিতা, অন্ধকার শেষে এইজন্মেই কী তুমি আমার হবে?

ডায়েরী বন্ধ করে ক্লান্ত দেহটা তিয়াস এলিয়ে দেয় বিছানায়।অমলেন্দুর সাথে দেখে করে বাড়ি ফিরে এসেছে তিয়াস।  আশ্রয় থেকে ফেরার পথে নিজেকে নিয়ে ভবে গিয়েছে সে। তার মন খারাপের ভুলে ভরা গল্প অমলেন্দুকে বলা হয়নি।   বরং এখনও রামধনুর সাত রঙে রাঙানো ভালবাসা সে দেখে এসেছে এক নারীর প্রতি এক পুরুষের। অমলেন্দুর এখনও  অদিতির প্রতি ভালবাসা দেখে তিয়াসের ফিকে হয়ে যাওয়া পরকীয়া জ্বরে অপরাজিতার গাঢ় নীল রঙ এসে বাসা বাঁধে।  অমলেন্দু তাকে বলেছে সত্যিকারের ভালবাসার নাকি কোন সংজ্ঞা হয়না, পরকীয়া-নিজকীয়া নাকি শুধুমাত্র মনের সংজ্ঞা   মাত্র । ঠিক যেন চোখের জলের মত – কোন রঙ নেই, ছোঁয়াও যায়না সেই রঙ। ভালবাসাও ঠিক তেমনই। দুই আত্মার  স্বার্থহীন ভালোবাসায় নাকি মানুষ স্বপ্নবিলাসী হয়, জন্ম নেয় জলের প্রথম ফোটার মত সোনা রং – সমস্ত বুক জুড়ে। তিয়াস  মুগ্ধ হয়ে শুনেছে অমলেন্দুর কথা। সত্যিই তো ! একদিন এরকমই তো বুম্বার ভালবাসা এক ঝটকায় তিয়াসের মনের ভেতর উজ্জ্বল প্রদীপ হয়ে এসেছিলো , থাকুক না সে অসমাপ্ত।- বরং না পাওয়া পূর্ণতায় দ্রবীভুত থাক তিয়াস। বিষণ্ণ বৃষ্টিতে নাহয় ভালবাসার ঠোঁটের উপর ঠোঁট রাখার সাহস রাখবে সে।

উচ্ছৃঙ্খল নিশুতি রাত জানলা দিয়ে চুপি চুপি ঢুকে এসে উপহার দেয় একটুকরো জমাট বাঁধা অন্ধকার…সেই উপহার বুকে জড়িয়ে তিয়াস ঘুমিয়ে পরে। তিয়াসদের গল্প শেষ হয়েও হয়না। রাতের আঁচলে বুকের পাঁজরে ভালবাসার লাল রঙ রামধনু হয়ে যায়।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *