শিখর থেকেসাগর

  সুব্রত চৌধুরী

3

এবার বিদেশএসে প্রথম রাতটা ভালই ঘুম হয়েছিল। তবে ঘুম ভাঙে সকাল দু’টোর সময়।বুঝলাম যে বায়োলজিকাল ঘড়ি ঠিকঠাকই কাজ করছে, দিল্লির সময়েআমাকে চালাচ্ছে। তারপর চেষ্টাচরিত্র করে খানিক ঘুমোতে পারলেও, বিশেষ ঘুম আরহল না। ফলে সকাল ছ’টার মধ্যে আমরা সেজেগুজে ব্যাগ গুছিয়ে তৈরি।কিন্তু বাইরে যা ঠাণ্ডা তাতে একটু হেঁটেচলে বাইরেটা দেখার সাহস হল না। সকাল সাতটায়ব্রেকফাস্ট টেবিলে আমরাই প্রথম উপস্থিতি দিলাম। ইউরোপের হোটেলে ব্রেকফাস্টব্যাপারটা বেশ বড়সড়, বুঝতে সময় লাগে। এত রকমের আইটেম রাখা থাকেকোনটা ছেড়ে কোনটা খাই সেটা ভাবতেই সময় লাগে। তবে অনেক বছরের অভ্যাসে আমি ধরাবাঁধামেন্যু করে নিয়েছি নিজের জন্য। তাই আমার ভাবনাচিন্তার জন্য সময় লাগে না। তবেঅন্যজনের তো তা নয়, তাই সময়টা বেশি লাগছিল। আগেভাগে টেবিলে হাজিরহওয়ায় হাতে সময়ও ছিল।পরে হিসেব করে দেখেছি যে বেড়ানোর পুরো সময়টাই সব জায়গাতেব্রেকফাস্ট টেবিলে আমরা সবার আগে পৌঁছেছি। আসলে ভারতীয় সময় মেনে তাড়াতাড়ি ঘুম থেকেউঠে পড়তাম। তারই ফল এটা। সাড়ে আটটায় ব্যাগপত্তর নিয়ে রিসেপসনে এসে দেখিএভা গাড়ি নিয়ে হাজির। এই মহিলাকে কুড়ি বছর ধরে দেখছি, সময়ের কখনোএদিকওদিক হয় নি। দেখা হতেই বলল, দু’টো জরুরী জিনিষ আছে আলোচনার।তারপরেই কি সব প্রিন্ট আউট বের করে দেখাল। ভেনিসে নাকি আজকাল মাঝেমাঝেই হাই টাইডআসছে। প্রথমে তার ওয়ার্ণিং সিগন্যাল কি রকম সেটা বোঝাল তারপরই বলল ওই সময় রাবারেরবুট লাগবে। ওর কাছে একজোড়া আছে, সেটা এনেছে। আরেকজোড়া আমাদের কিনতে হবে। ওকেবোঝালাম ভেনিস নিয়ে পরে ভাবব, আর আমরা ভারতবর্ষ নামের দেশ থেকে এসেছি, এসববন্যাটন্যা অনেক দেখা আছে। এবার দ্বিতীয় বিষয়টা কি তা বলো। এভা জানাল যেম্যাটারহর্নে আজই পুরনো রোপওয়ের পরেও আরেকটা রোপওয়ে চালু হচ্ছে। সেটায় স্নো প্যারডাইজবা লিটল ম্যাটারহর্ন পর্য্যন্ত যাওয়া যাবে। ওর প্রস্তাব হল প্রথম দিনই ওই রোপওয়েরযাত্রী হতে পারি আমরা। শুনে আমি বললাম, তথাস্তু। লুজার্ন, ইন্টারলাকেনপরে হবে। আজ আমার ডেটিং ম্যাটারহর্নের সাথে। চলো জারম্যাট। ওখান থেকেই ম্যাটারহর্নদেখা যায়। ঘন্টাদুয়েক ধরে নানা পাহাড় লেকের পাশ দিয়েপ্রকৃতির রঙ্গোলি দেখতে দেখতে চললাম। স্নিগ্ধা বসেছে সামনের সীটে এভার পাশে। সামনেআর পাশে দেখতে দেখতে শুধু উহ-আহ-দারুন করে যাচ্ছে। ইন্টারলাকেনকে পাশ কাটিয়েপোঁছলাম ক্যান্ডেরস্টাগে। সেখানে গিয়ে একটা গাড়ীর লাইনে ধীরে ধীরে এগোনো গেল। তারপরএভা জানলা খুলে টিকেট কিনলো। দু’ এক মিনিট পর অনেক গাড়ীর পিছনে একটা প্লাটফর্মেরউপর দাঁড়ালো আমাদের গাড়ী। খানিকক্ষন পর দেখি ওই প্ল্যাটফর্মটা এগোতে শুরু করে একটাঅন্ধকার সুড়ঙ্গে ঢুকে গেল, লটসবার্গ টানেলের শুরু হল। বার্নেজ আল্পসের পেটফুটো করে তৈরী এই ১৫ কিলোমিটার লম্বা টানেল শেষ হয়েছে ওয়ালিশ প্রদেশেরগোপেনস্টাইনে। লটসবার্গ টানেল তৈরি শুরু হয় ১৯০৭ সালে, কিন্তু পদেপদে নানা বাধায় এই প্রজেক্ট কার্যত জলে পড়ে। ১৯০৮ সালের শুরুতেই বরফ ধ্বসেকর্মচারীদের বাসস্থান ধ্বংস হয়, ১৩ জন কর্মচারী মারা যান। একই বছরে একটা ফাটলসৃষ্টি হয়ে বরফ আর দলের স্রোতে প্রায় পঁচিশ জন ভেসে যান। তখন দেড় কিলোমিটার টানেলপরিত্যক্ত ঘোষনা করে তাকে বন্ধ করতে হয়। এই টানেল চালু হয় ১৯১৩ সালে। এর ৪০০ মিটারনীচে আরেকটা টানেল তৈরী হয়েছে যেটা ৩৪ কিলোমিটার লম্বা। এই টানেলপেরোতে লাগল পনের মিনিট, তারপর ট্রেন থেকে গাড়ী আবার রাস্তায় নামল, ওয়ালিশঅঞ্চলের পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে পৌঁছলাম ট্যাশ গ্রামে। এর আগে গাড়ী নিয়ে এগোনো মানা।ট্যাশে এক মাল্টিলেভেল পার্কিংয়ে গাড়ী রেখে ট্রেনে চড়া হল। এই ট্রেন থেকেই প্রথমদর্শণ কুচকুচে কালো সুন্দরী ম্যাটারহর্ণের। উপরে হালকা বরফের সাজ। ছোটছোট দু’তিন কামরারট্রেন, এক পাহাড়ি নদির পাশে ছুটতে থাকল। মিনিট চার পাঁচ পরই পৌঁছনো গেল জারম্যাটে। এইশহরে পেট্রল গাড়ী চলতে বা ঢুকতে দেওয়া হয় না। শহরের রাস্তায় ইলেকট্রিক ট্যাক্সিচলে, মানে ব্যাটারি অপারেটেড। আমাদের টোটো বা ই রিকশার কথা মনে পড়ছিল।জারম্যাটস্টেশন থেকে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছলাম হোটেল লা পেটিট চার্মস ইন। সেখানে রিসেপসনেব্যাগগুলো রেখেই দৌড় দিলাম রোপওয়ে স্টেশনের খোঁজে। পাহাড়ি পথে আরো দশ মিনিট হেঁটেপৌঁছনো রোপওয়ে স্টেশনে, এদের ভাষায় গণ্ডোলা স্টেশন। টিকেট কিনে তিনজনেবসলাম এক গণ্ডোলায়, সঞ্চয় করতে এক লাইফটাইম অভিজ্ঞতা।

4

 জারম্যাটের এক প্রান্তে গণ্ডোলা স্টেশন। এক একটা কারে ছ’জন বসা যায়। দেখলাম স্কি করনেওয়ালাদের ছড়াছড়ি। ওরা চলেছে উঁচু পাহাড়গুলোয়, সেখান থেকে গড়িয়ে পড়বে নীচে। আমাদের গণ্ডোলা চলতে শুরু করার সাথেসাথেই নীচেএবং চারপাশে বরফের রাজ্য শুরু হল, ডানদিকে দাঁড়িয়ে ম্যাটারহর্ণ, তার গায়ে বিশেষ বরফ নেই, এতটা খাড়াই যে বরফ জমার সুযোগ পায় না।চারপাশে গোটা দশেক শৃঙ্গ, সবাই চারহাজারের উপরের উচ্চতায়, ম্যাটারহর্ণ হল ৪৮০০ মিটার। আমাদের গন্তব্য গ্লেসিয়ার প্যারাডাইস বা লিটলম্যাটারহর্ণ, সেখানে ৩৮৮৩ মিটার উঁচুতে দাঁড়িয়ে দেখবসুন্দরী পর্বতচূড়া ম্যাটারহর্ণকে, তার সাথে বাকিগুলো ফাউ। আমরা বিস্ময়ের সাথে চারদিক দেখে চলেছি, মুখ থেকে “দারুন”, “সুন্দর” ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। এর মধ্যেই এল গণ্ডোলা স্টেশন ফুরি, এই স্টেশনে অনেকে নেমে যান তাঁদের স্কি করার জায়গার উদ্দেশ্যে। ফুরি স্টেশনপ্রায় ১৮৬০ মিটার উচ্চতায়। সেখান থেকে আরো দু’টো রুটেরগণ্ডোলা যায়। তবে আমাদের নামতে হয় নি। আমরা একই গণ্ডোলায় এগিয়ে চললাম ২৯৩৯ মিটারউচ্চতায় থাকা ট্রোকেনার স্টেগের দিকে। সেখান পর্য্যন্তই পুরনো রোপওয়ের যাত্রাপথ।যাওয়ার সময় দেখলাম নীচে লোকজন যন্ত্রপাতি দিয়ে স্কি করার ঢালগুলো তৈরী করছে। ট্রোকেনার স্টেগে পৌঁছে এই গণ্ডোলা থেকে নামতে হল। খানিকটা হেঁটে পরেরগণ্ডোলার স্টেশনে পৌঁছলাম। নতুন যে গণ্ডোলা সেদিনই চালু হয়েছে, তার কিছু গাড়ি সোয়ারভস্কি কোম্পানির ডিজাইন। অদ্ভুত সুন্দর। এই গণ্ডোলাগুলোবেশ বড়, ১২/১৪ জন একসাথে বসাযায়। সীটগুলো গরম রাখার জন্য ইলেক্ট্রিক্যাল হিটিং আছে। কার্পেট তুলে নীচের সবকিছুদেখা যায়। একবার নীচের দিকে দেখেই মনে হল মাথা ঘুরছে, আর চেষ্টা করি নি। যাত্রা শুরু হল প্রায়চার হাজার মিটার উচ্চতায় ওঠার জন্য। ডানদিকে দেখছি ম্যাটারহর্ণ আর বাঁদিকে মাউন্টরোসা, ৪৬৩৪ মিটার উঁচুতে। নীচে দিয়ে দলে দলে স্কিয়িং করিয়ের দল পিছলে নীচের দিকেছুটে চলেছে। সূর্য্যদেবও আমাদের সহায় হয়ে আকাশে বিদ্যমান, যার ফলে অনেকদুর অব্দি দেখা যাচ্ছিল। অদ্ভুত সুন্দর ছাড়া আর কোন কথা আসছিল নাআমাদের মুখে। উচ্ছ্বসিত এভা বারবার চিৎকার করছিল, “Thank you, Mr Sun.” লম্বা যাত্রার পর পৌছলাম লিটলম্যটারহর্ণ কিংবা গ্লেসিয়ার প্যারাডাইস স্টেশনে, এখানেই গণ্ডোলার যাত্রা শেষ। কিছুটা হেঁটে একটা লিফটে চড়তে হল। লিফটে খানিকউপরে উঠে দশ মিটার উঁচু একটা প্ল্যাটফর্মে চড়তে হল, তবে তার আগে নিজেদের সোয়েটার, জ্যাকেট, টুপি, মাফলার সব ঠিকঠাক জায়গায় আছে কিনা দেখে নিলাম। কারন, লিফট থেকে বেড়িয়েই বুঝেছিলাম ঠাণ্ডা কারে কয়। প্রচণ্ড হাওয়ার ধাক্কা সামলেপ্ল্যাটফর্মে গিয়ে দাঁড়ালাম। মনে হল বরফের রাজ্যে সবার উপরে আমি, শুধু সুন্দরী মনোহরণকারী ম্যাটারহর্ণ আমার চেয়েও উঁচুতে মাথা ছাড়িয়ে দাঁড়িয়েআছে। সেই যে অনুভূতি, তা বোঝানোর ক্ষমতা আমার নেই।উপর থেকেদেখছিলাম পিঁপড়ের সারির মত স্কি করিয়ের দল নীচের দিকে ছুটে চলেছে। ঠকঠক করে কাঁপতেকাঁপতে চোখ দিয়ে চারদিকের সৌন্দর্য্যকে গিলে খাচ্ছিলাম। তবে হাওয়ার চোটে দাঁড়িয়েথাকাই কষ্টকর হয়ে উঠছিল। পরে জেনেছিলাম ওখানের তাপমাত্রা ছিল শূণ্যের চেয়ে দশডিগ্রী নীচে, আর হাওয়ার কারনে সেটাতে -১৬ ডিগ্রীর অনুভূতি হচ্ছিল। এই ব্যাপারটা কিভাবে হিসাব করে জানিনা। তবে এমন ঠাণ্ডা আমাদের বংশে কেউ দেখে নি এটুকু হলফ করে বলতে পারি।বেশিক্ষন ওখানে দাঁড়ানোর ক্ষমতা বা দু:সাহস হয় নি। প্ল্যাটফর্ম থেকে নেমে এসেলিফটের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালাম। হাতে হাত ঘষে গরম করতে করতে লিফট এসে গেল। আবারসেই সোয়ারভস্কি গণ্ডোলায় চড়ে নীচে নামার পালা, সেই একই পথে গণ্ডোলা বদল করে জারম্যাট।নীচে নেমে হঠাৎ মনে পড়ল সকালে ব্রেকফাস্টের পর আর কিছু খাই নি। এই বিকাল চারটেতেবোধ হয় পেটে কিছু যাওয়ার দরকার। কিন্তু গোটা চারেক রেস্তরাঁয় হামলা করেও কিছুখাদ্যবস্তু জুটল না। সবাই বিকেলে বন্ধ, সন্ধ্যে ছ’টায় খুলবে। হোটেলে ফিরে চেক ইন করে নিজেদের ব্যাগ থেকে খানিক শুকনো খাবার নিয়েএভাকে ডাকলাম। ছাদে বসে সেগুলো খেতে খেতে বরফের উপর সূর্যাস্তের রঙের খেলা দেখেনিজেদের মুগ্ধ করতে থাকলাম। কিন্তু বড্ড ঠাণ্ডা, তাই নিজের ঘরে এসে জানলা দিয়ে ম্যাটারহর্ণে মগ্ন হলাম। বিছানার দিকে তাকিয়েছোটবেলায় পড়া নবনীতা দেবসেনের ম্যাটারহর্ণ অভিযানের গল্প মনে পড়ল।

You may also like...

Leave a Reply