শ্বেতা ভট্টাচার্য-এর অনুগল্প ‘রঙ’

শ্বেতা ভট্টাচার্য

গল্পের বই থেকে চোখ তুলতেই শিমুল ফুল ভরা গাছে, খুনসুটি রত দুটো চাতক পাখির দিকে নজর যায় মিলির। বসন্তের আভাস পুরো প্রকৃতিতে বিদ্যমান বোঝে সে। “শুধু কি তার মনের ঘরেই?” আচমকা কথাটা মনে আসতেই একটা মুখ আর শিহরণ খেলে যায় সারা শরীরে। রুবি,নেহা তার অফিস কলিগ হলেও, কাছের মানুষ। তাদের আজ টিফিনের সময় অনেক ইতস্ততঃ করে অঙ্কনের কথা বলে মিলি। কথাটা শুনেই তাকে আনন্দে প্রায় জড়িয়ে ধরে রুবি বলে ওঠে, -“যাক নিজের জন্য ভাবার কথা তোর মনে এসেছে।কবে থেকে বলছি শুনিস না।মত দিয়েছিস তো।” -“না” দীর্ঘনিঃশ্বাস জড়ানো মলির ছোট্ট জবাব। -“কেনো? তুই এখনো সমাজ, তিতাস এদের নিয়ে ভাববি। আরে,তুইও জানিস তোর মেয়ের ও একটা নিজের জগৎ আছে।আর ও অন্য মনের মেয়ে, তোকে কখনো বাধা দেবে না।আগে শ্বশুর – শাশুড়ি ছিল বলে ভাবতিস। তাহলে এখন কিসের জন্য ভাবছিস?” ঝাঁঝিয়ে বলে ওঠে রুবি। “এই বয়সে এসব আর মানায় না। তারপর ও আমার থেকে বছর সাত/আটের ছোট।কি করে মেনে নি বল?” কথাগুলো মৃদু স্বরে বলে মিলি। শেষে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলে ওঠে নেহা, “ছাড়তো,বয়স যে শুধু সংখ্যা তা তুইও জানিস।এসব না ভেবে অঙ্কনকে ভালোবাস। না পারিস তো আমার মত ভাসা ভাসা থাক। জীবন টাকে এনজয় কর। অনেক তো হল।” ভাসা ভাসা কথা মনে পরতেই, তমোঘ্নের মুখ মনে পরে যায় মিলির। -“ও কি তাই করে ছিল? কিন্তু,সে তো গভীর ভালোবেসে ছিল।” গতকাল ব্যাঙ্গালোরে তিতাসের অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়ে ফেরবার পথে, আচমকা ঋদ্ধি ও পায়েলের সাথে দেখা হয়েছিল তার। পায়েলের হাসিখুশি ঝলমলে জীবন পাতায় চোখ আটকে যায় বিয়াল্লিশ ছুঁই ছুঁই একাকিত্ব মোড়কে জড়ানো ছিমছাম মিলির। -“খেয়েছ, ওষুধ নিয়েছো,মানা করলাম শুনলে না। অফিসে গেলে। নিজের জন্য না হয়, অন্তত আমার কথা ভেবে ও তো ছুটি নিতে পারতে।” হাজার ব্যস্ততার মাঝেও তার প্রতি অঙ্কনের ভালোবাসা যে আন্তরিক তা ঠিক বোঝে সে। মা তো ছিল না। বছর দুইয়ের প্রেমের পর বিয়ে। বাবা ছাড়া, তমোঘ্নের কাছ থেকে ভালোবাসা কেয়ারিং বন্ধত্ব পেয়েছিল সে। তবুও, কিছু বোঝার আগেই পায়েল নামক বসন্তের ছোঁয়াতে ভেঙে যায় তার বিশ্বাস ও ভালোবাসার ইমারত। চার বছরের মেয়ে তিতাস,মা, বাবা ও মিলিকে ছেড়ে বরাবরের জন্য চলে যায় তমোঘ্ন।নয় নয় করে চৌদ্দ বছর আগে। শ্বশুর শাশুড়িও আর খোঁজ করে নি ছেলের।মিলি আর তিতাসকে বুকে আগলে, বছর দুইয়ের মধ্যেই ধীরে ধীরে সংসারের মায়া ত্যাগ করেছিলেন। এর পর তো শুধু মেয়েকে নিয়ে সাদা কালো ফ্রেমে নিজেকে বন্দি করেছিল সে। মৃদু হাওয়াতে জানালার পর্দা দুলে উঠতেই , ভোরের আলোর রেখা ছুঁয়ে গেল মিলির এলো চুল। দূর থেকে কোকিলের আওয়াজ ভেসে আসতেই, মনে আসে গত রাতের কথা। এই বয়সে এসেও, শিহরিত হতে গিয়েও অনুভব করে সারা শরীর জুড়ে ভালোবাসার অনুভূতি।পলকে তার মন হতে, জন্ম নেয় বসন্তের রঙিন আবেগীয় গভীর চুম্বন।যা আঁকা হয় অঙ্কনের নিকোটিন ভরা ঠোঁটে।

You may also like...

1 Response

  1. ভালোবাসায় ভরে যাক জীবন। কানায় কানায় পূর্ণ হোক। ভালো লাগল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *