সুশান্ত কুমার সাঁতরার গল্প ‘বিষাদ রঙের তর্জমা’

সুশান্ত কুমার সাঁতরা

কি মনে করে হঠাৎ ই নীল চলে যায় তার ছোট্ট

বেলার বন্ধু যতীন দের  বাড়ি। যতীন ওর ছোট্ট বেলার বন্ধু। এই যতু কি করছিস রে? বলতে বলতে ঢুকে পড়ে অনেক চেনা যতীনের  ঘরটাতে। যতীন তখন চাদর মুড়ি দিয়ে পাস ফিরে শুয়ে আছে। তোর লজ্জা করে না এতো বেলা অবধি ঘুমোচ্ছিস। বলেই এক ধাক্কা। ওঠ শয়তান! ধর মর করে যে ঘুম থেকে উঠল, সে তো যতীন নয়। নীল যেন ভূত দেখল! ও কাকিমা গো! এ কে?

নীলের বাবার এক ছেলে। বাবা একটা প্রাইভেট ফার্মে ছোট খাটো একটা পোস্টে কাজ করে। ওরা যতীন দের পাড়াতে ভাড়া থাক। নীলের বাবার পিতৃপুরুষের  থেকে পাওয়া ছোট্ট একটা বাড়ি ছিল ও পাড়াতে।  কিন্তু  সেখানে ঘরের তুলনায় লোক অনেক বেশী হওয়ায় নীলের বাবা একদিন ওদের নিয়ে ভাড়া বাড়িতে চলে আসে। নিজের মতো করে একদিন ঘর বানাবার স্বপ্ন দেখেন তিনি।  নীল কে খেয়ে, না খেয়ে পড়াশুনা শিখিয়েছিলেন। তবে হায়ার সেকেন্ডারি পড়ার পর, নীল বি এস এফ পরীক্ষা দেয়।সে ও তার বাবার সাথে কাঁধ মেলাতে চায়। আর চাকরি হয়ে যায়। ট্রেনিং শেষ করে সে এখন জম্মু তে পোস্টিং পেয়েছে। পরশু সে বাড়ি এসেছে পনেরো দিনের ছুটিতে।

যতীন আর রথীন দু ভাই। ওদের বড় বাড়ি। বাবা ভাল চাকরি করে। রথীন আর নীল সমবয়সী। যতীন বয়সে এক দু বছরের ছোটো। কিন্তু নীলের  খেলার সাথী দুজনেই। দুজনের সাথেই তার ভাব তাই। রথীন এখন ব্যাঙ্গালোরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। তাই  যতু একাই আছে বাড়িতে। তাই নীল মনে করল যাই একটু যতীন দের বাড়ি থেকে ঘুরে আসি। এসেই এই বিপত্তি!

ঘুম থেকে যে উঠল সে যতু নয়। কালো হরিণের মতো চোখ দুটো দিয়ে সে তখন নীল কে দেখছে।

অকস্মাত ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় চোখ দুটো খানিক লাল। কাকিমা, এক ছুটে ঘরে চলে এসেছে। নীলের তো হাত পা সব ঠান্ডা। ভিরমি খেয়ে পড়ে আর কি!

– কাকিমা আমি ভাবলাম,যতু বোধহয়! তাই ভুল করে,ওকে ধাক্কা দিয়ে দিয়েছি।

–ওহো মিলি তুই রাগ করিস না। ও হলো নীল, যতুর বন্ধু। বুঝতে পারে নি। তাই যতু ভেবে তোকেই  ধাক্কা দিয়ে দিয়েছে।

এ হলো  নীল মানে নীলাদ্রি। আর নীল, এ হলো আমার ভাই এর মেয়ে মিলি। ও কাল এসেছে আমাদের বাড়িতে।  দিন কয়েক থাকবে – কাকিমা বলে।

যতু ততক্ষণ চেঁচামেচি শুনে ওপর থেকে নেমে এসেছে। সব শুনে সে হেসেই খুন!

কাকিমা বলে, ও নীল তুই কবে আসলি রে? আর কয়দিন থাকবি এবার।

নীল বলে- পনেরো দিন কাকীমা।

এসেই যখন পড়েছিস, আজ দুপুরে এখানেই খাবি। কাকু ইলিশ মাছ এনেছে। তোদের মেসে যা খাবার দেয়, তা আমার জানা আছে- কাকিমা বলে ওঠে।

নীল মিলিক  উদ্দেশ্য করে  বলল- সরি।

মিলি বলল- ঠিকাছে, ঠিকাছে , আমি কিছু মনে করিনি।

সেদিন দুপুরে সেখানেই খাওয়া দাওয়া হয়। কাকিমা দারুণ ভাপা ইলিশ বানিয়েছিলেন। কাকিমার আবার একটা বদনাম ছিল। তিনি একটু বেশী তেলে রান্না করতেন আর কি। তবে খেয়ে দেয়ে নীলের উদর ভীষণ তৃপ্তি লাভ করে। খাওয়া দাওয়ার পর এটা ওটা কথা হয়। জানা হয়ে যায় মিলি বি এস সি ফাস্ট ইয়ারে পড়ছে। কলকাতার একটি কলেজে। জিওগ্রাফি তে এ অনার্স নিয়ে।

এই নীল, আমরা সেকেন্ড শো তে সিনেমা দেখতে যাবো, তুই যাবি নাকি? যতু বলে।

কোন হলে?  কি বই রে? আমাদের পাড়ার হলে মুন লাইট এ ,  আবার কোথায়।   ব্রুস লির বই। ফিস্ট অফ ফিউরি।

নীল বলে- ঠিক আছে, তোরা চলে যাস। আমি বাড়িতে বলে সিধে হলে চলে যাব।  সময়মতো সে পৌছে যায়, সিনেমা হলে। সেখানে আগেই এসে দাঁড়িয়ে ছিল যতু আর মিলি। মিলি হালকা সাজে সেজে এসেছিল। চোখে ছিল কাজল। একটা ফ্রক পড়েছিল সে। নীল একবার তাকিয়ে দেখে। চারটে  চোখ এক সেকেন্ডের জন্য এক হয় বারকয়েক। কোথায় যেন একটা ঢেউ খেলে যায়, নীলের বুকের অনেক ভেতরে, অনেক গভীরে একটা হিল্লোল ওঠে। তার তরঙ্গ সে উপলব্ধি করে সারা শরীরে জুড়ে।

মুভি দেখা হলো। হাফ টাইমে, বাদাম ভাজা খাওয়া হলো। আর একটু টুক টাক গল্প হলো ওদের। মুভি দেখে বিকালে যে যার বাড়ি চলে গেল ওরা। সে রাতে নীলের চোখে ঘুম আসলো না অনেক রাত অবধি। যখনই চোখ খুলেছিল, চোখের সামনে ভেসে উঠছিল এক জোড়া কাজল টানা চোখ। কেমন যেন এক অনুভূতি সারা শরীর জুড়ে। অনেক রাত অবধি জেগে থাকতে থাকতে নিজের অজান্তেই  কখন যে  ঘুম এসে চোখের ওপর ভর করে  , সে জানতে পারে না।

ঘুম ভাঙে সকালে মায়ের ডাকে। এটা, ওটা ঘরের কাজ সারে সে , কিন্তু  একটা চুম্বকীয় টান তাকে টান ছিল।  একটু বেলা বাড়লেই, নীল পৌছায় যতু দের বাড়ি। “ও  কাকিমা”বলে ডাকতেই,কাকিমা বলে আয় নিল। বস্ বস্।

নীল উসখুস করতে থাকে। কাকিমা যতুকে দেখতে পাচ্ছি না। কোথাও গেছে নাকি গো?

– হ্যাঁরে বাজারে গেছে। কাকিমা বলে।

ঠিক তখনই স্নান সেরে মাথায় একটা গামছা বেঁধে এগিয়ে আসে মিলি। চার চোখ  এক হয়। বিদ্যুতের ছিলিক তখন দুই জনের মনেতেই। নীল হাসে। মিলি ও হাসে একটু।

মিলি বলে – ভালো আছেন।

হ্যাঁ। এই তো, একটু আগে এলাম । যতুর সাথে দেখা করতে- নীল বলে

আচ্ছা যতুর সাথে দেখা করতে। তাই বলুন- মিলি বলে

নীল হাসে একটু। ওরা দুজনেই জানত যে কেন নীল এসেছে আর কার সাথে দেখা করতে। ওদের মধ্য বেশ খানিকটা গল্প হয়। আপনি থেকে তুমি অতি সহজেই হয়ে যায় ওরা। মাঝে কাকিমা চা খাওয়ায়। যতু এসে ওদের সাথে যোগ দেয়। তারপর বাড়ি ফিরে যায় নীল।

পরের দিন নীল যতুদের বাড়ি গিয়ে ডাকে- কাকিমা  যতু কই? দেখছি না।  কোথায় গেলো?

কাকিমা বলে –  ও  মিলিকে ছাড়তে গেছে রে! কাল রাতে ফোন করেছিল ভাই। ভাই এর বৌ এর শরীর টা  একটু খারাপ। আর কাল থেকে ওর কলেজ ও খুলবে রে। তাই মিলি সকাল সকাল চলে গেছে। যতু  গেছে ওকে ছেড়ে দিতে রে। তুই বস না। চা খা।

একটা হাওয়া ভরা বেলুন থেকে হাওয়া বেড়িয়ে গেলে যেমন হয়। নীলের হৃদয় থেকে সব হাওয়া যেন এক নিমেষে বেড়িয়ে গেল। আর চুপসে যাওয়া মন টা নিয়ে। সে যতুদের বাড়ি থেকে বেরোলো।  বলল- কাকিমা, আমি বরঞ্চ এখন যাই। এই বলে, আস্তে আস্তে সে বাড়ির দিকে হাঁটা দিলো।

পরে আবার  দুপুরে বাড়ি তে খাওয়া দাওয়া করে, বিকালে যতুর কাছে গেলে দেখে যতু ঘুমোচ্ছে। এই ওঠযতু! চল ঘুরে আসি গঙ্গার ঘাট থেকে।

ধুসস! একটু শুতে দে তো। একটু আগেই এসেছি।ও হ্যাঁ। তুই আমার ঐ জামার পকেটে টাতে দেখ। তোর জন্য কিছু আছে। মিলি দিয়েছে। একলাফে উঠে আলনা থেকে জামা নামিয়ে পকেটে হাত দিতেই  পাওয়া যায় একটা চিরকুট। আর কতকগুলো কফিবাইট টফি। নে খা, বলে যতুকে দুটো বাড়িয়ে দেয়, নীল। চিরকুট টাতে লেখা ছিল। মিলির কলেজের নাম। আর দুদিন বাদের তারিখ আর সময় সকাল এগারোটা। নীলের হৃদয়ে আবার হাওয়ার সঞ্চার হলো যেন।

কিরে আমাকে খাওয়াবি কিন্তু নীল। যতু বলে।

চুপ কর! শয়তান! বলে ওঠে নীল।

সেদিন ঠিক সকাল সাড়ে দশটায় সময় পৌছে যায় নীল মিলির কলেজের গেটে। শিয়ালদহ থেকে আরো কিছুটা গিয়ে মিলির কলেজ । মিলি চিঠিতে পথ নির্দেশিকা করে দিয়েছিল তাই খুব একটা অসুবিধা হয় না নীলের কলেজ খুঁজে পেতে।  সে কলেজের  গেটের পাশে একটা চায়ের দোকানে বসে চা খায়। আর মন পড়ে থাকে গেটের দিকে। কখন মিলি আসবে। ঘড়ির কাঁটা যেন এগোতেই চায়  না । সে বারংবার ঘড়ি দেখতে থাকে। সেই সময় ফোন ছিল, মোবাইল ছিল না। হোয়াটস অ্যাপ, ফে বু কিছু  ছিল না। এগারোটা বেজে দশ মিনিট হয়ে গেল, চোখ অপেক্ষা করতে করতে যখন হাঁপিয়ে গেল। সে  আনচান আনচান করতে থাকল। ঠিক তখনই নজরে পড়ল মিলি আসছে, হেঁটে হেঁটে। একটা হলুদ চুরিদার পরনে তার, কানে ঝোলা দুল, কাজল চোখের পাতায়। কাঁধে একটা ঝোলানো ব্যাগ। লম্বা বিনুনি করা সাপের মতন কালো চুল দুলছে। মিলি গেটের কাছে আসতেই একবার বাঁ হাত ঘুরিয়ে ঘড়িটা একবার দেখলো। তারপর এদিক ওদিক তাকালো  একটু। নীল ধীর পায়ে এগোতে থাকে মিলির দিকে।

দেখা হতে মিলি বলে- কখন এসেছো? অনেকক্ষণ।

নীল বলে – না না। এই তো একটু আগেই।

আচ্ছা তুমি একটু দাঁড়াও। আমি ভেতর থেকে গিয়ে দুটো কাজ সেরে আসছি- মিলি বলে।

নীল হ্যাঁ সূচক ঘাড় নাড়ে।

কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর মিলি বেড়িয়ে আসে। মিলি  খুব স্মার্ট এবং আধুনিকা। তার প্রাচুর্য প্রচুর। বাবা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের উচ্চ পদে আসীন। ছোট থেকেই সে কোনোদিন  অভাবের মুখ দেখেনি। মিলি বলে- চলো কোথাও ঘুরে আসি। কলকাতার ঐ কলেজের সামনে থেকে ট্যাক্সি করে নেওয়া হলো। নীল খুব একটা কলকাতা চেনে না। শহরে তার আসা যাওয়া কম। কলকাতা শুনলেই কেমন ভয় ভয় লাগে তার। তাই সে একটু সপ্রতিভ হতে পারে না। তবে একটা রোমাঞ্চকর অনুভূতি ওকে ছুঁয়ে যেতে থাকে।

ট্যাক্সি তে উঠতেই ড্রাইভার জিজ্ঞেস করল-  কঁহা জানা হ্যাঁয়?

মিলি বলে- নিক্কো পার্ক।

নীলের কেমন একটা ঘোর লাগে।  সে কলকাতার বিশেষ কিছুই চেনে না। ট্যাক্সি ছুটছে । নীল কোনোদিন ও নিকো পার্ক আসে নি এর আগে। এটা ওটা কথা হয় দুজনের মধ্যে।  নীলের মিলিকে আর মিলির নীল কে ভীষণ ভালো লেগে যায়।

গাড়ি থেকে নেমে ট্যাক্সির ভাড়া  মিলি ই মেটায়। নীল দিতে চায়, মিলি বলে রাখো পরে দিও।

নিক্কো পার্কে ওরা রোপওয়ে চড়ে, রোলার কোস্টার চড়ে। সারাদিন দুজনে দারুণ  ভাবে কাটিয়ে। বিকালে যে যার বাড়ি ফিরে যায়। নীলের ভীষণ  ভালো লাগে সে দিনটা।

পরের দিন আবার দেখা করার কথা হয়। সেদিন দুজনে অ্যামেনিয়া তে পরোটা মাংস খায়। লিবার্টি তে মুভি দেখে। এভাবে হাওয়ার গতিবেগের চেয়েও দ্রুত সময় কাটতে থাকে। দুটি মন দুটি মনকে আপন করে নিল সহজেই। খুব তাড়াতাড়ি ওরা যেন একে অন্যের পরিপূরক হয়ে যায়। ওরা কেউ কাউকে বলে নি, যে ভালবাসি তোমায়। ওদের অজান্তেই কখন যে এসে ভালোবাসা ঘর করে গেছে ঐ দুটো মনে। সে খবর নীল ও জানে না আর মিলিও না। কিছু জিনিষ করতে, বলতে, চাইতে হয় না। না চাইতেই চলে আসে জীবনে। ওদের দুজনের ভালোবাসা টাও ঠিক তেমনি ছিল।

এরপর নীলের ছুটি শেষে তাকে ফিরে যেতে হলো তার কর্মস্থলে। ঠিকানা আদান প্রদান হলো। তারপর নীল চলে যাওয়ার আগের দিন, মিলির সাথে দেখা করে এলো। সজল নয়নে একে ওপরের কাছে বিদায় নিলো।

তারপর অপেক্ষায় থাকত ওরা দুজন। কখন চিঠি আসবে একে ওপরের। চিঠিতে মনের কথা আদানপ্রদান হতো, সেই সময় সেটাই ছিল মাধ্যম। দুটি মনের সংযোগের। মিলির চিঠি গুলো থাকত সুগন্ধি যুক্ত।   তারপর শীতের শেষে বসন্তর আগমন। গাছে গাছে পলাশ, শিমুলের আগমন। সামনেই দোলযাত্রা নীল কুড়ি দিনের জন্য ছুটি পেলো সে মিলি কে জানিয়ে দিলো যে আসছে।

দোলের দশ দিন আগেই সে এসে হাজির। এবারের দোল টা তার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কেন না সে তার মিলি র সাথে রঙ খেলবে। কি রঙ দেবে তাকে। কেননা মিলিই তো নীলের জীবন টা রাঙিয়ে দিয়েছে।  এই ভাবতে ভাবতে মাঝে মাঝে সে বিহ্বল হয়ে পড়ে।

বাড়ি পৌছে নীল পরের দিন মিলির সাথে দেখা করতে যায়। সেদিন তারা নল বনে বেড়াতে যায়। সেখানে নৌকা চালায় দুজনে। নৌকা চালাতে চালাতে একসময়  তো, দু টো মাছ উঠে আসে নৌকাতে । খুব বড় নয়। নীল ওদের আবার জলে ছেড়ে দেয়।  বলে- ভালো থাক তোরা।

এদিকে নীলের মা বেশ কয়েকদিন যাবৎ লক্ষ করছেন,  যে নীল আজকাল বাড়ি থাকছে না। সারাদিন বাইরে বাইরে থাকছে। জিজ্ঞেস করলে  বলে- বন্ধুর সাথে দেখা করতে গেছিল। নীলের মা বলেন- নীল এর আগে তো তুই কোনদিন ছুটি আসলে এতো বাইরে বাইরে থাকতিস নারে। বল না। কি ব্যাপার?

নীল ধীরে ধীরে সব কথা মাকে বলে। বলে- মা মিলি খুব ভালো মেয়ে।  আমি ওকে ভালবাসি। আর ওকেই বিয়ে  করব।

মা সব শুনে কেমন চুপচাপ হয়ে যায়। রাতে বাড়ি তে বাবার সাথে ও নীলের মায়ের কথা ও হয়। ওরা দুজনে নীল কে বলে – নীল,তুই বামন  হয়ে, চাঁদে হাত দিতে গেছিস। আগুন নিয়ে খেলছিস  তুই। ওরা তোর এ সম্পর্ক কোনদিন মানবে না। ওর মা, বাবা কোনদিন আমাদের এ বাড়িতে আসবে বলে মনে হয় তোর?

আমরা যদি আমাদের মতো করে বিয়ে করি? ওনারা কি পর ঠিক মেনে নেবেন না? নীল প্রশ্ন করে মাকে।

হয়তো মেনে নেবেন। কিনতু তোরা এখন অপরিণত, আমি পৃথিবী টাকে দেখেছি নীল।

ও তোর সাথে ঘর করতে পারবে না । তেল আর জল মেলে নারে বাবা।  রাজমহলে থাকা রাজকুমারী,  ভিখারিনির ঘরে থাকতে পারে  তুই বল! বোঝ বাবা! আমার কথাটা। তুই ওর বন্ধু হয়ে থাক। ওর সাথে সম্পর্ক টা সম্বন্ধে বদলালে, অনর্থ হয়ে যাবে। ওর বাবা মাকে ও যখন তোর কথা বলবে। তোর এই ছোট্ট ভাড়া বাড়ি, তোর বাবার সামান্য চাকরি।  ওর বাবা মা কিছুতেই রাজি হবে না।  তুই মেয়েটিকে ডাক,আমি তোদের উভয়ের ই ভাল চাই।  আমি ওকে বোঝাব- মা বলেন।

নীলের চোখ দুটো ঝাপসা  হতে থাকে। বুকের ভেতরে হাহাকার। সে কিভাবে বলবে, যাকে খুউব আপন করে নিয়েছে সে এই অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই, তাকে সে সারাজীবন সঙ্গে নিয়ে চলতে পারবে না। আবার মায়ের কথা মনে পড়ছে তার। রাজরানি মহল ছেড়ে ঝুপড়িতে এসে থাকতে কি পারে? টানাপোড়েন চলতে থাকে নীলের বুকের মাঝে।

পরের দিন সে মিলিকে সব বলে। মিলি বলে,  বাবা, মা না মানলে আমরা রেজেস্ট্রি করে বিয়ে করব, পালিয়ে যাবো। নীল বলে , সেটা ঠিক হবে না। আচ্ছা চলো আমাদের বাড়ি। মা, ডেকেছে তোমায়।

নীল, মিলি কে নিয়ে আসে ওদের ভাড়া বাড়িতে। একটা ঘর আর বারান্দা। এটাই নীলের ভাড়ার ঘর। অনেক কিছুই নেই তাদের। তক্তপোশে মিলি বসে। নীলের মা, মিলিকে বোঝাতে থাকে অনেকক্ষণ । শেষটায় মিলি বলে ওঠে, তুমিও কি একই কথা বলছো? নীল ঘাড় নাড়ে। সে ঘাড় নাড়াটাতে, হ্যাঁ বোঝায়। মিলি এতক্ষণ নীচের দিকে তাকিয়ে চুপ করেই সব শুনেছিল। চোখ তোলে সে, কাজল কালো চোখ দুটোতে তখন অসময়ের বর্ষা নেমেছে। নীল মিলিকে এগিয়ে দিয়ে আসে বাসস্ট্যান্ড অবধি। বিশেষ কথা হয় না আর সেদিন।

শুধু যেতে যেতে  বলে- মায়ের সাথে তোমার নাড়ির টান তো!

সে রাতে দুটি হৃদয়, ঠিক করে জোড়ার আগেই  ভেঙে গেছিল। তার শব্দ বাইরে থেকে শোনা যাইনি ঠিকই। সে শব্দের তীব্রতা সব শব্দ কে ছাপিয়ে, প্লাবন এনেছিল দু জোড়া চোখে। সে রাতে নীল কিছুই খায় না। মা এসে – বারকয়েক বলে, খেয়ে নে নীল। নীল বলে- শরীর খারাপ লাগছে। ভালো লাগছে না খেতে।

আর দু  দিন পরেই দোল। তারপর নীলের ফিরে যাওয়ার কথা। নীল এখন কেমন ফ্যাকাশে বিবর্ণ, তার আকাশে রঙ নেই যেন। সে আজ বাজার সেরে, যতুর বাড়ি যায়। যতুর কাছে জানতে পারে যে গতকাল মিলি এসেছিল ওদের বাড়িতে। কিছুক্ষণ থেকে চলে গেছে আর একটা চিরকুট তার জন্য রেখে গেছে। যতু,  দিতে যেতো তাকে চিঠিটা , নীল আসাতে ভালো ই হলো। এই নে, তোর চিঠি। বলে বিছানার নীচে থেকে চিরকুট টা সে নীল কে দেয়।

সেখানে লেখা ছিল, পারলে দোলের দিন, বিকাল  পাঁচটার সময় ফেরী ঘাটে এসো। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা চিঠি। দোলের দিন, চারিদিকে রঙের উৎসব। আবীর উড়ছে চারিদিকে। হৈ চৈ আনন্দ রঙের উৎসব। নীলের মনে রঙ নেই, তার মনের অতলে তখন বিষাদ রঙের তর্জমা।

অপেক্ষার অবসান হয়। ঘড়িতে তখন বিকাল তিনটে, নীল বাড়ি থেকে বেরোলো। মা জিজ্ঞেস করলো – কোথায় যাচ্ছিস রে।

এই একটু ঘুরে আসছি।

তাড়াতাড়ি ফিরিস। কাল তো আবার যেতে হবে।

হ্যাঁ,  বলে সে বেরোয়। চারটের বেশ কিছুক্ষণ আগেই সে পৌছে গেল ফেরিঘাটে । চুপ করে বসে রইল ঘাটের ধারে শিমুল গাছটার তলায়।শিমুল গাছটা তার লাল ফুলে ঘোষণা করছিল বসন্তের আগমন বার্তা।  গঙ্গার ধারে এই জায়গাটা দারুণ মনোরম। জলে ঢেউ, কিছু নৌকা চড়ে জেলেরা মাছ ধরছে। সূর্য ধীরে ধীরে পশ্চিমমুখো হচ্ছে। চারটের একটু পরেই মিলি তার  সাথে সমবয়সী আর একজন বান্ধবীকে নিয়ে ফেরী ঘাটে এসে নামল। তারপর। নীলের কাছে আসে মিলি, বান্ধবী একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকে।

মিলি নীল কে বললো- নীল বলতো, কেন মিশলে আমার  সাথে। যখন ধরেই রাখতে পারবে না তবে এগোলে কেনো। নাড়ির টান খুব বেশি তাই না,  ভালোবাসার চেয়ে! বলতে পারো ভালোবাসলে কেনো? পুতুল খেলা করলে আমার সাথে তুমি।

পুতুল খেলা!

নীল বলে- না, মিলি।পুতুল খেলা খেলিনি। যাকে ভালোবাসলাম তাকে যদি সুখ দিতে নাই পারি,  তাই সরে দাঁড়াচ্ছি । পারলে আমায় ক্ষমা করো!

মিলি বলে – ছাড়ো! সে একটা ছোট্ট প্যাকেট বার করে তার ব্যাগ থেকে। সেখানে ছিল আবীর লাল  রঙের। সে একটু খানি আবীর নিয়ে নীলের গালে লাগিয়ে দেয়। নীল একটু খানি মিলির থেকে  নিয়ে, মিলির গালে আলতো করে লাগায় সেই আবীর। দুজনের চোখের কোন চিকচিক করতে থাকে। নীল পকেট থেকে অনেকগুলো কফিবাইট চকলেট মিলিকে দেয়। আসার সময় সে নিয়ে এসেছিল। মিলি খেতে ভালোবাসে।

মিলি তার ব্যাগের মধ্যে থেকে বার করে, একটা ছোট্ট রঙিন কাগজে মোড়ানো প্যাকেট। সে বলে- নীল এবার আমার যাবার পালা। আমাকে ভুলে যেয়ো। এইটা আমি তোমাকে দিলাম। কিনতু আমি চলে যাবার পর তুমি এটা খুলবে কিন্তু তার আগে কিন্তু  নয়।

এই বলে মিলি আর তার বান্ধবী খেয়াঘাটের দিকে এগোয়। নৌকা একটু পরে ছেড়ে দেয়। যতক্ষণ চোখ যায় নীল বসে বসে ওখান থেকে দেখতে থাকে ওদের। একসময় ওরা দুজনে বিন্দুর মতো মতো হতে হতে চোখের  আড়াল হয়। আর দেখা যায় না ওদের। নীল ভাঙতে থাকে,  তার হৃদয়ে তখন মরুঝড় বইছে। সেখানে উড়ছে যে রঙ তখন, ঝড়ের ভীষণ  দাপটে, তার রঙ শুধু ধূসর।সে মুখটাকে এনে তার দু হাঁটুর মাঝে লুকিয়ে রাখে অনেকক্ষণ।

তারপর যখন মাথা তোলে ওপরে, চোখ পড়ে তার পাশে রাখা সোনালি মোড়কে মোড়া ছোট্ট প্যাকেট টা। মোড়ক সরাতেই তার মধ্যে থেকে বেড়িয়ে আসে একটা কার্ডবোর্ডের  প্যাকেট। প্যাকেটের মধ্যে থেকে বেড়িয়ে আসে একটা কালো রঙের পার্স। পার্সের ওপরে সবুজ রঙ দিয়ে আঁকা একটা জোকারের ছবি। জোকার টা হাসছিল।

You may also like...

1 Response

  1. ভালো হয়েছে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *