দোলা সেনের গল্প ‘বসন্ত –রাগ’

দোলা সেন

শনির রাতে দমকা ঝড় উঠল। হালকা, খুব হালকা ধারাপাত। তাতেই রবিবারের সকালটায় বেশ শিরশিরে আমেজ। ছটার সময় নিত্যকার প্রাতঃভ্রমণে যাই যাই করছি, সৌরভের আধ-ঘুমন্ত গলা কানে এল, – “ঘণ্টাখানেকের মধ্যে বেরোতে পারবে ?”

তা, ‘পাগলা খাবি ? না, আঁচাবো কোথায় !’ ঝড়ের বেগে স্নান, টোস্ট সহযোগে চা, তারপরেই গাড়ী —-
খানিকটা যাবার পরে খেয়াল হল, ফোনের চার্জারটা বাড়ীতে পড়ে আছে। একটু আগে দেখেছি, জি টি রোডে ছেলেপিলেরা বাৎসরিক আসানসোল-বরাকর ১০ মাইল দৌড়ের জন্য তৈরি হচ্ছে। ফিরলে ওদের পিছনে আটকে যাব।অতীতে একবার ফেঁসেছিলাম। কাজেই Here Drive, GPS কে টা টা, বাই বাই।অনেকদিন বাদে সেই আগের মত লোককে জিজ্ঞাসা করে পথ চলা। কি আনন্দ – আজ আর  আমাকে কেউ বলতে পারবে না,-  “আকাশের দিকেই শুধু হাঁ করে তাকিয়ে থেক না, নেভিগেশনটাও কর !” সবকিছুরই একটা ভাল দিক থাকে কি বলেন !
আজ পলাশ দেখার দিন। ডিসেরগড় ব্রিজ ছাডিয়ে একটু এগোতেই চারপাশ লালে লাল। পুরুলিয়ার সার্কিট হাউসের উল্টোদিকে একটা দোকানে খাসা কচুরি আর জিলিপি পাওয়া যায়। পাশের দোকানের পানটিও খাসা। এদিকে এলে এই দোকানদারটির সাথে দেখা না করে যাই না কক্ষণো।
এবার নডিহা-টামনা হয়ে কাঁসাই পেরিয়ে চলে যাব বান্দোয়ানের দিকে। নডিহার চেনা গলি বাবা-মায়ের গন্ধ নিয়ে আসে। যতটা পারি, লম্বা শ্বাসে সেই হাওয়ায় ফুসফুস ভরে নিই। আমার কলেজ, ভাইয়ের স্কুল সব তো এখান থেকেই। আমার ছোটবেলা বড়বেলা সব টুকরো টুকরো হয়ে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে। ভারী ভাল সেই জায়গারা সব। একবার সেখানে পৌঁছালেই তারা লুকিয়ে রাখা স্মৃতির পুঁটুলিটা এগিয়ে দেয়। পরম যত্নে আর ভালবাসায় তাদের নেড়েচেড়ে আবার তার হাতে দিয়ে বলি, “যত্ন করে রেখে দাও। আবার আসব যখন, তখনো এমনি করেই এগিয়ে দিও। হারিয়ে ফেলো না যেন।“ আলতো হাওয়ায় সে আমার মাথার চুলগুলো নেড়ে  দিয়ে বলে, – “পাগলী, কিচ্ছু হারায় না রে। চাইলেই পাওয়া যায়। শুধু চাইতে জানতে হয়।”
যেতে যেতে দেখি, ছোট নাগপুরের পাহাড়ের তলায় – আগুন লেগেছে বনে বনে। সেই চেনা সুর ছড়িয়ে পড়েছে মাঠে ঘাটে আকাশে বাতাসে ।
বান্দোয়ানের একটু আগে বন্দুক হাতে CRPF– গাড়ী চেকিং। প্রতি রবিবারেই হয়। তবে আজ ভারী ভাল জায়গায় আটকেছে। পাশ দিয়ে এক পলাশ ছাওয়া মেঠো পথ এঁকেবেঁকে পাহাড়ের দিকে উঠে গেছে। হাঁ করে দেখি বসে বসে।
–       “কোথায় যাবেন ?”
–       “গালুডি।”
–       “ বাঁকুড়া- দুর্গাপুর দিয়ে এলে শর্ট হত না ?”
–       “এ পথে পলাশ বেশী।”
পুলিশ বেচারি অনেকক্ষণ গোমড়ামুখে ছিল। এবার হেসে ফেলল।
এক জামাই কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে শালাবাবুর বাইকে বৌকে চড়িয়ে ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’স্টাইলে চলে যাচ্ছিল। ধরা পড়ল।
–       হেলমেট কই ?
–       লাইসেন্স ?
–       গাড়ীর কাগজ ?
–       গাড়ীর মালিক ?
প্রশ্ন যতরকমই হোক না কেন, উত্তরে ভদ্রলোকের এককথা – “বাড়িতে” ! দেখা গেল, ইয়ারফোন আর বৌ ছাড়া সবকিছুই বাড়িতে আছে। ফয়সালা কি হল জানিনা, আমাদের পেপার চেক হয়ে যাওয়ায় এগিয়ে চললাম।
বান্দোয়ান- দুয়ারসিনি- গালুডি- NH-33- ডিমনালেক- পুরুলিয়া- রঘুনাথপুর হয়ে আসানসোলে ফিরতে ফিরতে রাত আটটা।
জঙ্গল, হালকা পাহাড়ী রাস্তা, নদী, মাঠ সব আজ অশোক, পলাশ, শিমূলে রাঙানো।এমনকি আলো দিয়েও লাল রং চুঁইয়ে পড়ছে। সকালের নরম আলোয়, দুপুরের ঝলমলে তীব্রতায়, সন্ধ্যার অস্তাভায় পলাশদের সাজিয়ে রাখলাম পরপর।ফেরার সময় দেখলাম, ডিমনা লেকের চারধারে পলাশেরা দাঁড়িয়ে জলের আয়নায় তাদের ছবিটি একমনে দেখে নিচ্ছে – সাজের কোন ত্রুটি থাকল কিনা! বললাম, “বড সুন্দর লাগছে সবাইকে। ভাল থেক। আসছে বছর আবার দেখা হবে।”
দোলা সেন॥
******
*******
বসন্ত এসে গেছে
একে তো ফাগুন মাস, দারুণ সময়। মন উড়ু উড়ু, দখিনা পবন, আগুন পলাশ – মানে সব মিলিয়ে বেশ একটা রোম্যান্টিক ভাব মনের মধ্যে উড়ে, ঘুরে বেড়াচ্ছে। এবারের দোলের জন্য একটা জম্পেশ প্রোগ্রাম কি বানানো যায় – তাই নিয়ে মনে মনে নানাবিধ পরিকল্পনার ছক আঁকছি। এই উড়ু উড়ু মানে ভাল বাংলায় যাকে বলে উতলা মন – সেটার খপ্পরে পড়ে আমার সবেধন নীলমণি একান্ত বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন বরকে শনির সন্ধ্যেতে বলে বসলাম, “বসন্ত এসে গেছে, দেখেছ ?”
প্রথমটায় অতটা খেয়াল করেনি। As usual  ব্যাপার বলে আমিও নিশ্চিন্তে বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছি, হঠাৎ অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে উঠল, – “তাই তো ! খেয়াল করিনি তো একেবারেই! কাল সকালেই তাহলে… ” বলতে বলতে পায়ে চটি গলিয়ে বেরিয়ে গেল। তা সে বাড়ী থাকলে চোদ্দবার অমনি বেরোয়। কখনো বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া দিতে , কখনো বন্ধুর ডাকে সাড়া দিতে – এইসব। কিন্তু বসন্তের আগমনীতে উত্তেজিত হওয়াটা নতুন। কেসটা কি হল ভেবে আমিও একটু উত্তেজিত হয়ে উঠলাম মনে মনে – মলয় পবনের সাইড এফেক্ট!
তা, রোব্বারের সকালে আয়েশ করে বসেছি। সামনের ট্রেতে সুন্দর করে সাজানো সবুজ চা আর ব্রিটানিয়া মারীর যুগলবন্দী। আমার একদা প্রেমিক, অধুনা বরটি বলল, – “চা খেয়ে ঝাড়নগুলো রেডি করো, আমি মইটা সেট করছি।”
–       “ ? ? ? ”
–       “ আরে, তুমিই তো কালকে বললে, শীত শেষ, এটা বসন্তকাল”
–       “? * # ¿ !”
–       “দুদিন বাদেই তো ফ্যান চলবে। আজ ছুটি আছে, চল ওগুলো সাফ করে দিই।”
অতএব আমার হাতে দু-তিন প্রকারের ঝাড়ন, স্ক্রু ড্রাইভার, মইয়ের উপর গৃহকর্তা। একটা একটা করে ফ্যান খোলা, ধোওয়া আবার লাগান চলছে। শোবার ঘরদুটিতে ডিভান সরাতে হল। আজকালকার লো ডিভান, সরাতেই অপরিমিত ধুলো আর ঝুল। একটা স্প্রিং আবার তার মধ্যে লুকিয়ে পড়ল। ভাগ্যিস স্পেয়ার ছিল ! এইসব সেরে তিনি তো বেরিয়ে গেলেন মোটর সাইকেল ওয়াশ করাতে। আর আমি হেঁড়ে গলায় ‘আজি এ বসন্তে’ গাইতে গাইতে ধুলোর পাহাড় থেকে স্প্রিং উদ্ধারের কাজে লাগলাম।
ঘরদোর সাফসুতরো করে স্নান করে বেরোতে বেরোতেই হাজির। এবার লক্ষ্য স্নানঘর, –  শাওয়ার, কল ইত্যাদির পরিচর্যা। এবার আমার হাতে নানান নম্বরের স্প্যানার। কাজ করতে করতেই আশ্বস্ত করল, সামনের রোব্বারে লেপ তোষক রোদ্দুরে দিতে সাহায্য করে দেবে। হায় রে পলাশরঙা বসন্তোৎসব !
বুঝলাম, – বসন্ত এসে গেছে। এই যে শীতের রবিবার হলেই, সাতসকালে দুপুরের খাবার টিফিনবন্দী করে সারাদিনের মনে জল-জঙ্গলের খোঁজে বেরিয়ে পড়া, আর রাত্রে বুকের মধ্যে অনেকটা অক্সিজেন নিয়ে  বাড়ি ফেরার এবার ইতি।
সব কাজ, খাওয়া দাওয়া সারা হলে দুপুরে যখন বিছানায় পা ছড়িয়ে বসেছি, সামনের গাছ থেকে সুরেলা আওয়াজে কানে এল-“চোখ গেল”, “চোখ গেল”। মুচকি হেসে নিজের দুচোখ বন্ধ করতে করতে ভাবলাম-
FAN মানে পাখা, পাখা মানে হাওয়া, হাওয়া মানে মলয় পবন, মলয় পবন মানে বসন্ত, আর বসন্ত মানে SPRING!
ও বাংলার দিদিমণি আর স্যারেরা, বসন্তের বিগ্রহপদ তো জেনে গেলাম, – বাসনার অন্ত ; কিন্তু সমাসটা কি হবে? একটু বলে দিন না প্লীজ।

You may also like...

2 Responses

  1. constantly i used to read smaller articles that as well clear their motive, and that is
    also happening with this paragraph which I am reading
    at this time.

  2. খুব ভালো লাগল মাসি। মন ভরে গেলো যাকে বলে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *