সবুজ নীলের দেশে, সাদা কালোর দেশে

পিউ দাশ
ভিউ পয়েন্ট থেকে ‘সেভেন সিসটারস্ ফলস্

বেড়াতে যেতে চান অথচ অনেকদিন ঘোরা হয়নি? আজ থেকে শুরু হল পিউ দাসের ট্রাভেলগ সবুজ নীলের দেশে, সাদা কালোর দেশে । প্রতি রবিবার ও বুধবার পড়ুন পিউর ভ্রমনকাহিনী।আজ প্রথম পর্ব।

আমরা ছয়জন মফল্যাঙের পবিত্র জঙ্গলে

তুঙ্গভদ্রার তীরে পড়ে হাম্পি বেড়াতে যাবার মারাত্মক বায়না ধরেছিলুম এককালে। কিছুতেই হল না। এখনও সেই কিশোরীকালের রোম্যান্সের বিজয়নগর ঘোরা আমার অধরাই থেকে গেল।

তেমনই, কিশোরী বেলায় শেষের কবিতা পড়ে মনে মনে শিলঙের অনেক ছবি এঁকেছিলুম কল্পনায়। পিছনে বরফে ঘেরা পাহাড়ের পটভূমিকায় গাড়ির অ্যাক্সিডেন্ট। অমিত রায়ের সঙ্গে লাবণ্যের সাক্ষাৎ..

.বাংলা সাহিত্যে রোম্যান্সের বিষ্ফোরণ!

‘শিলং? না সিমলা? কোথাকার কথা বলছিস? শিলং? হবে না। অনেক ঝামেলা ওখানে বেড়াতে যাওয়ার। সিমলা যদি বলিস–‘ বাবা বলেছিল গম্ভীর গলায়।

ব্যস্, রোম্যান্সের বেলুন আমার বিলকুল চুপসে গেল।

বড় দুঃখ লাগে মনে। যেখানেই আমি বেড়াতে যেতে চাই, সেখানেই, সঙ্গে যাওয়ার লোক জোটে না?

আমার মা-বাবা আবার, শুধু নিজেদের ফ্যামিলি নিয়ে ঘুরতে যাবার পক্ষপাতী নন। সঙ্গে আরো দুয়েকটা ফ্যামিলি না হলে ঠিক–

এবারে যখন বেড়াতে যাবার কথা ঠিক ঠাক হল মোটামুটি, আমার ছোটকাকা কাকীমা যাবে আমাদের সঙ্গে এরকমটাই সাব্যস্ত হল। এবার, এমন একটা জায়গা নির্ধারণ করতে হবে যেখানে আগে ওরাও যায়নি, আর আমরাও যাইনি।

দেখা গেল ভারতে এমন জায়গা, যেখানে আমরা কেউই আগে পদার্পণ করিনি কখনো, আছে দুটো, এক) কেরল কর্ণাটক, আর দুই) নর্থ ইষ্ট ইন্ডিয়া।

নর্থ ইষ্ট ইন্ডিয়া! শিলং! রোম্যান্সটা চাগাড় দিয়ে উঠতে গেল আবার একটু। তবু, মনকে বোঝালুম, দুটো জায়গাই নেড়েচেড়ে দেখা যাক একবার, কোথায় সুবিধে বেশি, কম সময় কম পয়সায় বেশি বেশি সুন্দর সুন্দর জায়গা ঘুরব। আগের বছরই আন্দামান ঘুরে এসেছি, কাজেই সমুদ্র ঘোরার তেমন কোনও টান নেই এবার। পাহাড় বরফ গুহা জঙ্গলই মূল আকর্ষণ।

এখন তো আবার রোম্যান্সকে ধোঁয়া ধোঁয়া কুয়াশাচ্ছন্ন করে রাখার দিনকাল নয়। ইন্টারনেটের কল্যাণে, ‘গিয়ে পড়লুম, তারপর ভেসে গেলুম এলাকার লোকেদের কথা শুনে, ড্রাইভারের পরামর্শে ঘুরে বেড়ালুম আশেপাশের ফাইভ পয়েন্ট, টেন পয়েন্ট’, এর’ম করে আজকাল আর কেউ ঘুরতে যায় না। অল্প সময় হাতে নিয়ে যাওয়া, যতটুকু হয় দুচোখ দিয়ে চেটেপুটে দেখে নিতে হবে, সারা অস্তিত্ব দিয়ে অনুভবে মেখে নিয়ে আসতে হবে যেটুকু পারি সেই জায়গার রস নির্যাস পরিবেশ সমাজকে।

কয়েকদিন ইন্টারনেট ব্রাউজিঙের পরে জিতল শিলংই। পক্ষপাতিত্ব করিনি কোনও, সত্যি!

ইউটিউবে ডাউকি আর ডাবল ডেকার রুট ব্রিজ, ক্রাং সুরি ফলস্ দেখেই আমি একদম সোল্ড। নাঃ! শিলংই যাব!

সোহরা ভিউ লজ

দশ বারোদিনের ট্যুরের পরিকল্পনা ছিল। হঠাৎ আমার মাথায় আরেকটু দুষ্টবুদ্ধি ঢুকল। দুবছর আগে সিমলা কুলু মানালি বেড়াতে গিয়ে রোটাং পাসে যেতে পারিনি। স্ট্রাইক চলছিল কোনও। বরফ দেখা হয়নি। বরফ দেখতে হবে এবার। ব্যস্! যেমন ভাবনা তেমন কাজ। ইটিনেরারিতে ঢুকে এল অরুণাচল প্রদেশ। তাওয়াঙ। সেলা পাস।

ভিউ পয়েন্ট থেকে ‘সেভেন সিসটারস্ ফলস্

কাকাদের জানিয়ে দিলাম শিলঙেই যাওয়া হচ্ছে। বললাম, দারুণ দারুণ সব আনএক্সপ্লোরড্ জায়গা আছে ওখানে। যতটা সম্ভব রাখছি ইটিনেরারিতে। সেই করতে গিয়ে কিছু পপুলার ট্যুরিস্ট স্পট বাদ পড়বে হয়তো, সে যাক। ‘তবে,’ দুঃখ দুঃখ মুখ করেই বললাম একটু, ‘বিখ্যাত যে ডাবল ডেকার ব্রিজ, তাতে যাওয়া যাবে না, বুঝলে? মানে, কষ্টকর ট্রেকিঙের পথ। আমি আর ভাই পারব, কিন্তু তোমরা–‘ তোমরা বলতে আমার মা বাবা কাকা আর কাকীমা। চারজনেরই পঞ্চাশের উপর বয়স হল। তাছাড়া হাঁটুর ব্যথা কোমরের যন্ত্রণা এসবেও কাবু প্রত্যেকেই কমবেশি।

কাজেই–

আহা! এসব বুড়োবুড়িদের জন্য আমারও যাওয়া হবে না, ভেবে সত্যিই একটু দুঃখু দুঃখু ফিলিং আসতে যাচ্ছে মনে, কাকা আমার, ‘অ্যাঁ? ডাবল ডেকারেই যাব না? তবে আর শিলঙে বেড়াতে যাওয়া কিসের জন্য?’ বলে বিকট এক তাচ্ছিল্যের মুখভঙ্গি করে দুঃখ টুঃখ আমার দমিয়েই দিল এক ঝটকায়।

মানে, চিন্তার বিষয় সত্যি। ডাবল ডেকারে যাওয়ার ইচ্ছা তো খুবই, কিন্তু, এই এতগুলো মানুষ মিলে সাত ঘন্টা ট্রেকিং করা কি সম্ভব? তার উপর এমনি রাস্তা নয়। সিঁড়ি। খাড়া সিঁড়ি সাড়ে তিনহাজার পেরিয়ে তবে পাহাড়ের নিচে নামা যায়, তারপরে দুটো ছোট ছোট পাহাড়ী নদীর উপরে টলোমলো ব্রিজ পেরোনো। তারপর, আবারো কিছু সিঁড়ি দিয়ে আরেক পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে তবে নোংরিয়াট গ্রাম, যেখানে আমাদের আদরের রুট ব্রিজ। জিংকিয়েং নোংরিয়াট। খাসি ভাষায় যে শব্দের অর্থ, “নোংরিয়াটের রাবার গাছের সেতু”।

সেভেন সিসটারস্ ফলসের ভিউ পয়েন্ট

আবার শুরু করলাম ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটি। বুড়োরা সকলেই দেখলাম ‘যেতেই হবে’ বলে একদম দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমি আর ভাইই যেন কিন্তু কিন্তু করছি একটু। কিন্তু না। এমন কিন্তু কিন্তু করলে চলবে না। ইটিনেরারি ফাইনালাইজ করতে হবে। কাজেই মনস্থির করেই ফেললাম। সবাই যখন যেতেই চায়, তো যাব।

ইন্টারনেটের পরামর্শ মেনে ঠিক করলাম একরাত থাকব ওখানে, নোংরিয়াট গ্রামে। পাহাড়ের কোলে একটুকরো খাসিয়া গ্রাম একটা। অদ্ভুত রকম পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। গ্রামের বুক চিরে পাহাড়ি নদী, সেই নদীর উপর প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে তৈরী সেতু। সে এক ছবির মতন গ্রাম। বলল সবাই। একরাত তো থাকতেই হবে। তাছাড়া, যাওয়া আসাও একদিনে করতে হবে না সেক্ষেত্রে।

ব্যস্। সব ঠিকঠাক! এবারে ফ্লাইটের টিকেট কাটতে হবে। তারপর ডেট অনুযায়ী থাকার জায়গা ঠিক করতে হবে–হোটেল বুকিং। তারপর…বেরিয়ে পড়লেই হয়।

নয়ই মার্চের গো এয়ারের ফ্লাইটের টিকিট কাটলুম, সকাল নটা পনেরোর। ফিরব একুশে মার্চ, সকাল এগারোটার ফ্লাইটে। তেরোদিনের ট্যুর। এদিকে শিলং আর তার আশপাশ, আর ওদিকে সেলা পেরিয়ে তাওয়াং এর কমে সম্ভব নয়।

আমার বিজনেসম্যান কাকা, আর ফ্রিল্যান্সার আর্টিস্ট ভাই একটু গাঁই গুঁই করছিল। তাদের বাকিরা দমিয়ে দিলুম বেশ করে। আরে বাবা! ইনকাম করা তো সারাজীবন পড়েই আছে, বেড়ানো তো আর রোজ রোজ হবে না?

নয়ই মার্চ

নয় তারিখে বেশ ভোর ভোর সময়ে বেরিয়ে পড়া গেল। নটা পনেরোর ফ্লাইট, গৌহাটিতে অ্যারাইভাল টাইম সাড়ে দশটা। তারপর ওখান থেকে সিধা চেরাপুঞ্জি যাব আমরা।

একটা কথা বলে রাখি এখানে, আমরা বলি বটে চেরাপুঞ্জি। সুবিধে হয় আমাদের, লোকেদের বোঝাতে, সেই ছোটবেলা থেকে পড়েছি কিনা, চেরাপুঞ্জি, পৃথিবীর সবচেয়ে ভিজে জায়গা? কিন্তু, ওই এলাকার লোকজনেরা জায়গাটাকে ডাকেন সোহরা বলে। সোহরাই চেরাপুঞ্জির আসল নাম।

চেরাপুঞ্জিতে ট্যুরিস্টদের থাকার জায়গা খুঁজে পাওয়া বেশ চাপের ব্যাপার। কিছু আপস্কেল ট্যুরিস্ট লজ আছে, কটেজ আছে। সা ই মিকা রিসর্ট যার মধ্যে ভাল বেশ। এখানে দুজনের জন্য এক একটা কটেজ ভাড়া ৪৫০০/- থেকে শুরু মোটামুটি। একটু ভাল কটেজ ৬০০০-৭০০০/- এর মধ্যে পাওয়া যাবে। আমি এতটা ভাড়া দিতে চাইছিলাম না।  বাজেট অ্যাকোমোডেশন খুঁজছিলাম।

 

আমাদের চেরাপুঞ্জিতে থাকতেই হবে। নোংরিয়াটে নেমে একদিন থাকতে হলে চেরাপুঞ্জিতে থাকা মাস্ট। কিন্তু তা না হলে, শুধু চেরাপুঞ্জি ঘুরতে চাইলে  শিলং থেকে ডে ট্রিপ করা যায়। তাই চেরাপুঞ্জিতে থাকেন না বেশির ভাগ ট্যুরিস্টই।

বাজেট অ্যাকোমোডেশন খুঁজতে গিয়ে খোঁজ পেলাম ডি ক্লাউড হোমস্টের।

প্রথমেই চেরাপুঞ্জিতে থাকার জায়গাটা ঠিক করে নিতে হবে, এর উপরেই পুরো ঘোরার প্ল্যানিং নির্ভর করছে, কাজেই নেট থেকে পাওয়া ডি ক্লাউড হোমস্টের ফোন নম্বরে ফোন করলাম তাড়াহুড়ো করে। কিন্তু, যিনি ফোন ধরলেন তিনি জানালেন এই মুহূর্তে ব্যস্ত আছেন, পরে যোগাযোগ করবেন আমার সঙ্গে। দশ-বারোদিন পরেও যখন ওদিক থেকে যোগাযোগ করা হল না, তখন বাধ্য হয়ে আমাকে অন্য কোন জায়গার খোঁজ শুরু করতে হল। এইভাবেই খোঁজ পেলাম সোহরা ভিউ ট্যুরিস্ট লজের। ভাড়া বেশ কম। একটা ডবল বেড রুম ৮০০/- টাকা। তিনটে রুম বুক করে নিয়েছিলাম চটপট তাই।

নয় তারিখে দমদম এয়ারপোর্টে পৌঁছে গেসলাম তো আমরা সকাল আটটার আগে, কিন্তু চেক ইন করতে গিয়ে হল ঝামেলা। আমার বাবার এক অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী কালো ব্যাগ আছে। ওই ব্যাগে থাকে (বাবার মতে) বাবার অনেক প্রয়োজনীয় সব টুকিটাকি জিনিষপত্তর। ভারী ব্যাগটা। আর প্রতিবারই, কোনও না কোনও কারণে ওটাকে আটকে দেওয়া হয় চেক ইনের সময়।

এইবারেও… বড় তালা ছিল একটা।

চেক ইনে আটকে পড়ে সিকিওরিটিকে বোঝাতে বোঝাতে অ্যাতো সময় চলে গেল দেখতে দেখতে যে বলার কথা নয়।

ওই গন্ডগোলের মধ্যেই ভাইয়ের ফোনে এক অচেনা নম্বর থেকে ফোন এল। ভাই তো তিতিবিরক্ত হয়ে অচেনা নম্বর দেখেই কেটে দিয়েছে। কয়েক মুহূর্ত পরেই আবার ফোন, সেই একই নম্বর থেকে। বললুম, ধর না, হয়তো ইম্পর্ট্যান্ট?

মুখ বেজাড় করে ধরল ফোনটা। তারপরই দেখি তার মুখের অভিব্যক্তি পাল্টে গেছে পুরো। ‘ওঃ ইয়েস ইয়েস উই আর হেয়ার। অন আওয়ার ওয়ে। ইয়েস ইয়েস!’

কীই না, আমাদের ফ্লাইট থেকে ফোন করেছেন ফ্লাইট অ্যাটেন্ড্যান্ট। দরজা বন্ধ করার সময় হয়ে গেছে, অথচ ছয়জন যাত্রী মিসিং এখনও। পড়ি কি মরি করে ছুট লাগালুম সবাই।

ক্কী জ্বালা!

যাই হোক, বোর্ডিং হয়ে গেল ঠিকঠাকই। ফ্লাইটের জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখি মেঘে মেঘ। কিস্যু দেখা যায় না। চুপচাপ চোখ বুজে পড়ে রইলাম।

ফ্লাইটের শিড্যুলড টাইম মেনে সাড়ে দশটায় পৌঁছনোর কথা প্লেন, অর্থাৎ কিনা একঘন্টা পনেরো মিনিটের ফ্লাইট। ওমা! দেখি পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে গেছি গৌহাটিতে। অবাক করলে! তা, ভালই সূচনাটা হয়েছে বলতে হবে বেড়ানোর। লেট হওয়ার বদলে আর্লি অ্যারাইভাল। খুশি খুশি মনে সবাই বেরোলাম এয়ারপোর্ট থেকে।

আগে থেকে এক গাড়ি বুক করা ছিল আমাদের। দেখি, ড্রাইভার তার টাটাসুমো নিয়ে উপস্থিত। বেরিয়েই সোহরার দিকে শুরু করে দিলাম যাত্রা।

গৌহাটি শহরে পদার্পণ (গাড়্যর্পণ?) করেই কিন্তু আর্লি অ্যারাইভালের খুশি খুশি ভাবটা একদম কেটে গেল এক ঝটকায়। মার্চ মাসের রোদ, গরম, গাড়িটাও এসি নয়। হিল স্টেশনে ঘোরার জন্য কে আর কবে এসি গাড়ি বুক করে? কিন্তু গৌহাটি শহরটা তো আর হিলস্টেশন নয়? সে তো দিব্যি গরম হয়ে জাঁকিয়ে রয়েছে।

তার উপরে হঠাৎ লম্বা জ্যামে আটকে পড়ে গাড়ি আমাদের একেবারে নট নড়নচড়ন নট কিচ্ছু অবস্থা হল।

ব্যাপার কী?

জানা গেল, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মহম্মদ আবদুল হামিদ গৌহাটি সফরে এসেছেন আগের দিনই। এখন তিনি গৌহাটির প্রধান রাস্তার উপর দিয়ে চলেছেন রক্ষী সম্বলিত হয়ে। সেই কনভয় যতক্ষণ না যাচ্ছে, সব গাড়ি আটক।

বোঝো!

এই, ফ্লাইটে যে সময়টুকু জমিয়েছিলুম বলে কাক্কেশ্বর কুচকুচের মত খুশি হয়ে উঠেছিলুম টাক ডুমাডুম ডুম, সে সময়টুকু তো গেলই ওই গরমে ট্রাফিকে আটকে, তার চেয়ে বেশিই সময় চলে গেল। তারপরে, ব্যাপার দেখে বুঝে গরমে হাঁসফাস করতে করতে  বাবা আর কাকা যেই বেরিয়েছে একটু স্মোক করবে আর কয়েকটা জলের বোতল কিনবে বলে, অমনি ট্র্যাফিক ছেড়ে দিয়েছে। তারপর তো গাড়ির হর্ণ বাজিয়ে তাদের ডেকে আনার চেষ্টার মধ্যেই আমার ভাইও ছুটল গাড়ি থেকে বেরিয়ে, তাদের ডাকতে।

পিছনের গাড়িওলারা খুব বেশি অসহিষ্ণু হয়ে ওঠার আগেই অবশ্য আমাদের গাড়ি ছুটে চলল আবার।

গৌহাটি শহরের সীমান্তেই সম্ভবত রাস্তার ধারে এক চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে পাঁউরুটি টোস্ট, কলা, ডিম সিদ্ধ, বাড়ি থেকে নিয়ে আসা মিষ্টি খেয়ে নিলাম সবাই চুপচাপ একবার।

তারপর আবার গাড়িতে।

একটু পর থেকেই রাস্তার দুপাশের দৃশ্য সুন্দরতর হয়ে উঠতে লাগল। পাহাড়ী রাস্তার ফিয়ার ফ্যাক্টরটুকু ডোন্ট মাইন্ড করতে পারলে, পাহাড়ের রাস্তা সবসময়ই সুন্দর। শিলঙের পর থেকে চেরাপুঞ্জি যাওয়ার রাস্তাটাও—দারুণ! দারুণ! মাইন্ডব্লোয়িং সৌন্দর্য তার।

রাস্তা ভালও। কিন্তু প্রচন্ড আঁকা বাঁকা, একেবারে একশো আশি ডিগ্রী টার্ণ নিচ্ছে হামেশাই। টাটা সুমোর পিছনের সিটে বসে একবার আমি বাঁয়ে হেলছি একবার ডাঁয়ে। এত জোরে গাড়ি বাঁক নিচ্ছে মাঝে মধ্যে যে হেলতে হেলতে শুয়েই পড়ছি কখনো সিটের উপরে।

 

আমার ভাইয়ের আবার মোশন সিকনেসের রোগ আছে। একটু পরে থেকেই শুরু হয়ে গেল তার ভেলকিবাজি।

শরীর খারাপ লাগছে।

গাড়ি থামিয়ে হাওয়া খেতে বেরোনো হল তাই একটু। ভাইয়ের শরীরটা খারাপ, তাই মনটাও একটু খারাপ, তবু যেখানেই গাড়ির বাইরে পা রাখি, সেখানেই অদ্ভুত সৌন্দর্য। এমনই একজায়গায় দাঁড়িয়ে দেখলাম, রাস্তার পাশ দিয়ে সিঁড়ি নেমে গেছে নিচে, আর একটা ঠেলা গাড়িতে করে অল্পবয়সী একটা ছেলে খাওয়ার জল নিয়ে আসছে বয়ে, আর সিঁড়ির নিচে দাঁড়ানো একটা মেয়ের সঙ্গে গল্প করছে, আলোচনা কিছু।

আস্তে আস্তে রাস্তার সৌন্দর্য অন্য রূপ নিল। শিলং এলাকার সবুজে সবুজ পাহাড় ছেড়ে একটু ধূসর উপত্যকা উপত্যকা ভাব। তার উপর লম্বা টানা আঁকাবাঁকা রাস্তা। ভূমিরূপ যেন ঢেউ খেলানো, সেই ঢেউয়ের খাঁজে খাঁজে হঠাৎ হঠাৎ ঠিক ছবির মত সুন্দর ছোট্ট ছোট্ট সাজানো গোছানো বাড়ি দৃষ্টিগোচর হচ্ছে, আবার গাড়ি এগিয়ে যেতে থাকলে দেখতে দেখতে অদৃশ্য হচ্ছে ঢেউয়ের আড়ালে। দুঃখের মধ্যে এই জায়গার তেমন ছবি নেই আমাদের কাছে। স্মৃতিই ভরসা। ক্যামেরাম্যানটি সেইসময়ই অসুস্থ হয়ে ছিল কিনা?

অপূর্ব দৃশ্য যত চোখের উপর ভেসে উঠতে লাগল, ততই মনটাও উৎফুল্ল হয়ে উঠতে থাকল।

এই সময়েই রাস্তার ধারে হঠাৎ দেখি ভিউ পয়েন্ট একটা। কিছু ট্যুরিস্ট শ্রেণীর ছেলেমেয়ে ঘোরাঘুরি করছে। ব্যাপার কী?

আমরাও নামলাম সবাই গাড়ি থেকে।

তারপর রাস্তার পাশের সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলাম ‘ভিউ’ দেখতে। তার জন্য অবশ্য কুড়ি টাকা করে টিকিটও কাটতে হল।

ও হরি! ওটাই চেরাপুঞ্জির বিখ্যাত সেভেন সিস্টার ফলসের ভিউ পয়েন্ট। যে ঝর্ণার আসল নাম নহ্সঙিথিয়াং।

ফলস্ বটে, আর দিব্য ঝর্ণার শব্দও কানে আসে ভিউ পয়েন্টে দাঁড়ালে, কিন্তু এই মার্চ মাসে ঝর্ণার অস্তিত্ব চোখে খুঁজে পেতে গেলে দূরবীণ লাগবে। তিনটে সরু সরু সুতলির মত জলের ধারা চোখে পড়ল বহু কষ্টে। তবে হ্যাঁ, ক্যানিয়নটাই বেশ সুন্দর দেখতে। ভিউ পয়েন্টে একেবারেই যে ভিউ নেই সে কথা কেউ বলতে পারবে না। এনভায়রনমেন্টাল ফগে ক্যানিয়নটা ঢাকা। বিকেলের আলো পড়ে অদ্ভুত মায়াবী হয়ে উঠেছে। ক্যানিয়ন থেকে হাওয়া আসছে পতপত করে।

 

একটু সময় কাটানো গেল ওখানে। ঝরণা নেই ঠিকই দৃষ্টিগোচর, কিন্তু গর্জনটা আছে। বর্ষাকালে কী রূপ নেবে কল্পনা করে নেওয়া যায়। সেই বিকেলের পড়ে আসা আলো, ক্যানিয়ন থেকে ভেসে আসা বাতাস, আর ঝর্ণার গর্জনে ভরা অনুভূতিটুকু সারা মনে মেখে নিয়ে আবার উঠলাম গাড়িতে।

 

অল্প একটুক্ষণ অপূর্ব সুন্দর পথে গাড়ি চালানোর পর, আর বাবা কাকাদের, ‘ইশশ্! ইন্ডিয়ার স্কটল্যান্ড কী সাধে বলে? ক্যালেন্ডারে তো ঠিক এরম ছবিই দেখি!’ বলে চেঁচামেচির আর তার মাঝে আমার, ‘দুর্! ইওরোপের সঙ্গে তুলনা করো কেন? আমাদের দেশের মত এক্সট্রিম বিউটির বৈচিত্র্য আছে নাকি কোনওদেশে?’ এরকম ফুট কাটার পর, আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের লজে।

 

আরওয়াহ্ লামস্হিনা ট্যুরিস্ট হাবের মধ্যে সোহরা ভিউ লজ অবস্থিত। আরওয়াহ্ কেভ আর লামস্হিনা ফরেস্ট এর একদমই কাছে অবস্থিত, একই বাউন্ডারির মধ্যে। লজের সামনেই একটা ভিউ পয়েন্ট আছে রাস্তার ওপারে, চোখের একটু আড়ালে।  লজে উঠে বারান্দায় দাঁড়ালেই বোঝা যায় ‘সোহরা ভিউ লজ’ নাম কেন এর। লজের ঠিক সামনে, ক্যানিয়নের ওপারে ছোট্ট শহর সোহরা বা চেরাপুঞ্জি পাহাড়ের গায়ে ছবির মত ছড়িয়ে আছে। আমরা যখন লজে পৌঁছই তখন শেষ বিকেলের লাল আলো শহরটাকে মায়াবী রঙিন করে তুলেছে।

ভোরবেলা থেকে খুব ছোটাছুটি হয়ে ধকল গেছে খুবই। কিন্তু এই হাবের মধ্যে খাওয়ার বন্দোবস্ত করতে হলে লজের কেয়ারটেকারদের রান্নাঘরই ভরসা। নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ঠিক হল কাকীমা নিজেই রান্না করবে। বাবা কাকা কাকীমা চলে গেল ড্রাইভারকে সঙ্গে নিয়ে চেরাপুঞ্জির মার্কেটে বাজার করতে। আমি, মা আর ভাই ঘরে জিনিষপত্র গোছগাছ করতে লাগলাম।

সোহরা ভিউ লজ, লোকেশনের দিক থেকে চেরাপুঞ্জির একদম টপ ক্লাস জায়গায় অবস্থিত, কিন্তু এখানে থাকার ব্যবস্থা একেবারেই বেসিক। ডাবল বেডরুম ঘরগুলো কোনওমতেই ডাবল হওয়ার যোগ্য নয়। আর বেডগুলোও খুবই সংকীর্ণ। দুজন রোগা লোক কোনওক্রমে ঘেঁষাঘেঁষি করে শুতে পারে হয়তো, কিন্তু ওগুলো সিংগেল বেডই। যে রুমটার সঙ্গে ইউরোপীয় স্টাইল বাথরুম লাগোয়া তার দরজাটা মাঝখান থেকে আড়াআড়িভাবে কাটা, যদিও বন্ধ করা যায় রাতে, তবু প্রাথমিকভাবে চমক লাগে চোখে। লজের বাকি তিনটে রুমের সঙ্গেই ইন্ডিয়ান স্টাইল বাথরুম। একটা ঘরে কোনও জানলা নেই। আমরা তো প্রথমেই বাতিল করে দিয়েছিলাম ওটাকে। আমরা চেক ইন করার পরে একজন নিউজিল্যান্ডের ট্যুরিস্ট এসে উঠলেন সেটাতে। একাই মোটরবাইকে ঘুরতে বেরিয়েছেন, হাসিখুশি যুবক এক। তাঁর সঙ্গে পরে নোংরিয়াটেও আবার দেখা হয়েছিল আমাদের, আলাপও হয়েছিল। কিন্তু নামটা জানা হয়নি তাঁর। কী আর বলি! যাকগে। একটা পোষা কুকুর আছে লজে। সেটা আবার ভীষণ ট্যুরিস্ট ফ্রেন্ডলি! মাঝেমধ্যেই ঘরে এসে ঢুকতে চায়। বাথরুমগুলো বিশাল বড় বড়, ঝাঁ চকচকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন নয়। গরম জলের ব্যবস্থা নেই। তবে কেয়ারটেকার বা ম্যানেজারকে বললে যতটা সম্ভব ব্যবস্থা করে দেন সুযোগ সুবিধার।

আমরা থেকেছিলাম ভালই, কিন্তু অনেকেরই অসুবিধা হতে পারে। কোনওমতে রাত কাটানোটাই উদ্দেশ্য হলে, বা বারান্দায় বসেই নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখতে হলে, বা, ক্যাম্পফায়ার করতে হলে ওখানে থাকতে পারেন, বেড়াতে বেরিয়ে একটু আরাম চাইলে ওখানে না থাকাই ভাল।

আমাদের নিজেদের অবশ্য ক্যাম্পফায়ার করা হয়নি। তবে সন্ধেবেলায় বারান্দায় বসে ক্যানিয়নের দিক থেকে বয়ে আসা হাড়কাঁপানো ঠান্ডা হাওয়া খেতে খেতে সূর্যাস্তের মায়াবী আলোর খেলা উপভোগ করেছি আমরা। …আর আফশোষ করেছি, আরো একদিন ওখানে থাকতে পারলে হত!

যাই হোক, রাত্তিরের খাওয়া তো ওখানেই রান্নাঘর ভাড়া করে রান্না করে খাওয়া হল। বেশি কিছু না, জাস্ট ভাত, ডিমসেদ্ধ আর মুরগির ঝোল।

তারপর অল্প একটুক্ষণ আড্ডার পর টেনে ঘুম লাগালুম একটা। কালকেই আমরা যাব আমাদের সেই বহু আকাঙ্খিত ডাবল ডেকার রুটব্রিজের পথে। এছাড়া, তার আগে চেরাপুঞ্জির বাকি সাইট সিইংও আছে। সেভেন সিস্টারস ফলস্ দেখে যা বুঝেছি, ফলস্ তেমন কিছু দেখতে পাব না। ফলস্ দেখার জন্য আসিও নি আমরা আসলে। এক ক্রাং সুরি ফলস্ টাই ইচ্ছা কাছ থেকে উপভোগ করার। কিন্তু ফলস্ ছাড়াও, কেভ আছে দুটো, সেদুটো দেখতে হবে। তারপরে নামব নোংরিয়াটে। কষ্টসাধ্য ট্রেকিং! মনে উত্তেজনা নিয়েই ঘুমিয়ে পড়লাম সবাই চুপচাপ।

You may also like...

2 Responses

  1. What’s Taking place i am new to this, I stumbled upon this I’ve discovered It positively
    useful and it has aided me out loads. I am hoping to contribute & help different customers like its
    aided me. Good job.

  2. Deborni Biswas says:

    Mone hochhe jeno Ami nijei berate gechhi.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *