সবুজ নীলের দেশে, সাদা কালোর দেশে

পিউ দাশ
লামসহিনা জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আরওয়াহ কেভে যাওয়ার রাস্তায়

বেড়াতে যেতে চান অথচ অনেকদিন ঘোরা হয়নি? শুরু হল পিউ দাশের ট্রাভেলগ সবুজ নীলের দেশে, সাদা কালোর দেশে । প্রতি রবিবার ও বুধবার পড়ুন পিউর ভ্রমনকাহিনী।আজ দ্বিতীয় পর্ব।

দশই মার্চ

আমি এমনিতে ইনসোমনিয়ার রোগী। একটানা দু তিনঘন্টা ঘুম হলে আমি ‘বিশাল ঘুমিয়েছি’ বলি। কেউ আমার বন্ধ ঘরের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে মৃদু শব্দে হাঁচলে কাশলে আমি জানতে পারি ঘুমের মধ্যে থেকেও। একতলায় মা বাবা সকালবেলায় চেঁচামেচি জুড়লে দোতলায় নিজের ঘরে আমার ঘুম ভেঙে যায়। …খুব বেশি বাড়িয়ে বলছি না, সত্যি।

তবে বেড়াতে বেরোলে তুলনামূলকভাবে ভাল ঘুমুই।

সেদিন রাত্রেও ভালই ঘুমালুম। বারোটা সাড়ে বারোটা নাগাদ ঘুমিয়েছিলাম, ঘুম ভাঙল ভোরবেলা। ফোনটা দূরে জানলার পাশে টেবিলে চার্জ হচ্ছিল, সময় দেখতে পাইনি। কিন্তু পাতলা পর্দার আড়ে কাচের জানলা দিয়ে আসা ভোরের আবছা আলো জানান দিচ্ছিল, সূর্য উঠছে। আগের রাত্রে ভেবে রেখেছিলাম ভোরে উঠে সূর্যোদয় দেখব পাহাড়ের গায়ে গায়ে। কিন্তু এখন, এই নির্জন জায়গায়, যখন কারো সাড়াশব্দ নেই কোনওদিকে, ভাইও আমার অঘোরে ঘুমোচ্ছে আমার পাশেই, তখন আর বাইরে বেরোতে সাহস করলাম না একা একা। মনের কষ্ট মনে চেপে রেখে শুয়ে শুয়ে ল্যাদ খেতে লাগলাম।

বেশ অনেকক্ষণ, তা প্রায় এক দেড়ঘন্টা পরে একটু একটু করে প্রাণের স্পন্দন অনুভব করলাম চারপাশে। মা, কাকা কাকিমা এরা উঠেছে মনে হল যেন। চারিদিকে ‘চা-চা’ রব।

আমার চায়ের তেমন নেশা নেই। শখ করে খাই। সন্ধের সময় একবার না পেলে মনটা আনচান করে কখনো সখনো একটু আধটু। কিন্তু না হলেই চলবে না, এমনটাও নয়।

আমার বাবা আবার চা না পেলে বিছানা থেকে উঠতেই পারেন না! মা এবং কাকা কাকিমার অবস্থাও তথৈবচ।

কাজেই চায়ের জন্য গোলমাল শুরু হয়ে গেল। আমিও শীতে কাঁপতে কাঁপতে একটা চাদর গায়ে মুড়িয়ে বাইরে বেরোলাম। এমনিতে এই মার্চ মাসে চেরাপুঞ্জিতে খুব বেশি ঠান্ডা থাকার কথা নয়। ছিলও না। কিন্তু সোহরা ভিউ লজে প্রচন্ড শীত। সামনেই মাউকডক ভ্যালি, আর এনভায়রনমেন্টাল ফগ সরলে ওই ভ্যালির ওপার থেকে উঁকি মারে বরফের সাদা চাদরে ঢাকা পাহাড়, বহুদূর থেকে। ওই ভ্যালির ওপার থেকে ওই বরফ ছোঁয়া ঠান্ডা হাওয়া এসে সটান ঝাপটে পড়ে এখানেই, এই লজের উপর। সেই কারণেই মূল চেরাপুঞ্জি শহরের তুলনায় এখানে ঠান্ডা বেশি।

তখনই এই তত্ত্বটা আমরা বুঝতে পারিনি যদিও। আমরা ভেবেছিলাম বাকি চেরাপুঞ্জিতেও বুঝি ওইরকমই ঠান্ডা পড়বে… সেকথা পরে বলছি।

যাই হোক, ঘরের বাইরে যখন বেরোলাম তখন ছটা বাজে প্রায়। বেরিয়ে দেখি, আজও চারপাশের দৃশ্য অদ্ভুত সুন্দর। তফাৎ শুধু, কাল বিকেল সন্ধের সন্ধিক্ষণে সোহরার উপর যে দিক থেকে সূর্যের আলো পড়ছিল, আজ ভোরবেলা তার উল্টো দিক থেকে পড়ছে।

সোহরা ভিউ লজ থেকে মকডক ভ্যালী

আমি আর কাকিমা বাইরে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখতে লাগলুম। তারপর চা এসে গেল।

মা বাবারা যখন চা খাচ্ছে, সেই সময় আমি সিঁড়ি বেয়ে নেমে লজের বাইরে রাস্তার উপর পায়চারি করতে শুরু করলাম একা একাই। এমন সময় দেখি, আমাদের মাঝের ঘরে ছিল যে শ্বেতাঙ্গ ছেলেটি, সে ক্যামেরা গলায় ঝুলিয়ে আমার সামনে দিয়েই রাস্তা পেরিয়ে রাস্তার ওপারের সিঁড়ি বেয়ে একটু উপরে উঠে তারপর হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেল। সে ঘর থেকে বেরোনোর পরই লজের কুকুরটা তার পায়ে গলা মাথা ঘষে অনেক ভালবাসা জানাচ্ছিল।  কুকুরটার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে তাকেও সঙ্গে করে ডেকে নিয়ে গেল ছেলেটা।

আমি কালকে রাত্রিবেলা আমাদের ঘরের জানলা দিয়ে দুজনকে টর্চ হাতে রাস্তার ওপারের ওই সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসতে দেখেছি। এলাকার লোকজনই হবে তারা ভেবেছিলাম; হয়তো ওদিকে পাহাড়ের গায়ে ছোট বসতি আছে কোনও। এখন ভুরু কুঁচকে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে ওই সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে রইলাম, কোনও ভিউ পয়েন্ট টয়েন্ট আছে নাকি ওখানে?

দেখি আমার মাও লজ থেকে নেমে আসছে। এসে আমায় বলে, “কোথায় গেল বল দেখি ছেলেটা? যাবি নাকি দেখতে?”

“চলো দেখা যাক।”

দুজনেরই পরনে রাতপোশাক। তার উপরে চাদর জড়ানো। চললাম, দুজনে ট্রেজার ট্রোভের সন্ধানে। হতাশ হয়েছিলাম বলতে পারব না।

লজের সামনে ভিউ পয়েন্টের রাস্তায়
ভিউ পয়েন্টে আমি

 কিছু সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে হয়। তারপর বেশ কিছু সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলেই, বিংগো! দারুণ ভিউ পয়েন্ট একটা। দোতলা ভিউ পয়েন্ট। উপরের তলারটার থেকে আরো খানিকটা নিচে আরেকটা।

সামনে তাকালে দিগন্তবিস্তৃত হয়ে ছড়িয়ে রয়েছে মাউকডক ভ্যালি।

নিচের ভিউ পয়েন্টেই চুপচাপ স্ট্যাচুর মত দাঁড়িয়ে ছিল ছেলেটা। কুকুরটাও ছিল সঙ্গে। পাহাড়ের গা কেটে এই ভিউ পয়েন্ট বানানো, একটা উঁচু পাথুরে দেওয়ালের মত জায়গায় ছেলেটা স্থির দাঁড়িয়েছিল নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে। তখন পুরোপুরি বুঝিনি, পরে বুঝেছি, নোংরিয়াটের ডাবল ডেকারের তলায় ন্যাচরাল ফিশ স্পা তে ফিশ পেডিকিওর নেওয়ার জন্য পা স্থির রাখার প্র্যাক্টিস করছিল ছেলেটা।

এখানে, এই ভিউ পয়েন্টে দাঁড়িয়েও ঝর্ণার শব্দ শোনা যায়। দেখি, ভিউ পয়েন্টের একদম পাশেই ধার ঘেঁষে ঝর্ণা নামছে একটা। জল নেই তেমন, তবু, সেভেন সিসটারস্এর তুলনায় এই ছোট্ট ঝর্ণাকে কেন জানি আমার অনেক বেশি আপন লাগছিল। কিন্তু এ ঝর্ণার নাম কী জানি না। নামহীনাই রয়ে গেল সে আমাদের কাছে।

কুকুরটা এদিকে ছেলেটার আশেপাশে লাফালাফি করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল মনে হয়, আমার মাকে দেখে আবার বিশাল হাঁকডাক নাচানাচি শুরু করে দিল।

আমার মাকে, যে কোনও কারণেই হোক, জন্তু জানোয়ারেরা পছন্দ করে খুব। আমাকে যেমন, একেবারেই করে না। এর থেকে বুঝি, আমার মায়ের মনটা সোজা সাদা। আমি মায়ের জটিল বক্র মনের কুপুত্রী।

যাই হোক। একটু পরে ফিরে এলাম সেই ভিউ পয়েন্ট থেকে। কুকুরটা অকৃতজ্ঞদের মত নাচতে নাচতে চলে এল আমাদের সঙ্গে, সাহেবকে ছেড়ে।

বলা ভাল, চলে এল আমার মায়ের সঙ্গে। সিঁড়ি বেয়ে একটু উপরে ওঠে, তারপর অপেক্ষা করে লেজ নাড়তে নাড়তে, কখন মা আসবে। আবার মা কাছাকাছি চলে এলেই তরতর করে উঠে আসে আরো বেশ কয়েকটা সিঁড়ি।

কান্ড দেখে আমার মা স্নেহমাখা গলায় আমায় বলল, “আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বুঝলি?”

একটু পরে ভাইয়ের সঙ্গে আবার গেলাম সেই ভিউ পয়েন্টে। এবার ছবি তুলতে। আর একটু পরে কাকিমাও গেছিল।

ছেলেটা তখনও ছিল সেখানে। কাকিমা বলে, “কী রে, একটু আলাপ কর না ওর সঙ্গে?”

আমার মুখচোরা লাজুক ভাই বলে, “আঃ! দেখতে পারছ না মেডিটেশন করছে?”

সে তখনও স্ট্যাচুর মত দাঁড়িয়েই ছিল।

 —

যাই হোক, নটার মধ্যে সবাই স্নান টান করে রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়া গেল। আমার আর ভাইয়ের পিঠে দুটো ব্যাগ। আমার হাতে খাবার দাবার আর জলের বোতলের একটা কাপড়ের ব্যাগ। ভাইয়ের গলায় ক্যামেরা।

বাকি জিনিসপত্র লাগেজ সব সোহরা ভিউ লজেই রেখে বেরোলাম। আজ রাত্রে এখানে ফিরব না ঠিকই, কিন্তু লাগেজ নিয়ে তো আর নোংরিয়াটে নামা সম্ভব নয়?

আমাদের ঘরে যখন জিনিসপত্র গোছগাছ করছি, তখন পাশের ঘর থেকে ইংরাজী ভাষায় কথোপকথন কানে এলো একটা। ছেলেটা কাউকে বলছে যে ও আজ যেখানে যাবে, সেখান থেকে রাত্রের মধ্যে ফিরে আসা সম্ভব নয়, ওর লাগেজ কি রেখে যেতে পারে লজে? অন্যজন কী উত্তর দিল শোনা গেল না।

আমি ভাইকে বললাম, “এও নোংরিয়াট যাবে বুঝলি?”

“হুম্!” বলল ভাই। তারপর বলল, “অস্ট্রেলিয়ান। অ্যাক্সেন্ট শুনে মনে হচ্ছে।”

“কিংবা নিউজিল্যান্ডের। একটু নিউজিল্যান্ড নিউজিল্যান্ড টান আছে।”

“সেও হতে পারে।” ভাই বলল।

 

আমরা সোহরা ভিউ লজকে টাটা বলে বেরিয়ে পড়লাম তারপরে। মা কুকুরটাকে বিস্কুট দিয়ে জানিয়ে এল আবার ফিরব আমরা।

আজ আমরা প্রথমে যাব আরওয়াহ্ কেভে। লজ থেকে অল্প একটুই দূরে। এমনিতে হেঁটেই যাওয়া যায়। আমরা একেবারে গাড়িতে করে সাইটসিইঙে বেরিয়ে প্রথমেই দেখে নেব।

রাস্তার অবস্থা এখানে খুবই খারাপ। সারাটা রাস্তা থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে যেতে হয়। বড় ‘ঝাঁকানি’ লাগে না, সব ছোটছোট ‘ঝাঁকুনি’। তার কারণ রাস্তার গর্তগুলোও ছোট ছোট এখানে।

আরওয়াহ কেভের রাস্তায়

রাস্তার একপাশে ধূসর পাহাড়, অন্যপাশে সবুজ খাদ, যেমন হয় আর কি।

হঠাৎ দেখি রাস্তার পাশে একদম খাদ লাগোয়া জায়গায় খোলা পার্ক একটা। বাচ্চাদের পার্কই মনে হল। তারপরই একটু এগিয়ে গাড়ি থেমে গেল। এ রাস্তার শেষ এখানেই। সামনেই সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে আরওয়াহ্ লামস্হিনা-র গেট। আরওয়াহ্ কেভ দেখতে হলে গাড়ি এই পর্যন্তই আসে, এর পরে বেশ খানিকটা হাঁটতে হয়, জঙ্গলের মধ্যে পাহাড়ের গা ঘেঁষে সবুজে সবুজ রাস্তা ধরে। সেই রাস্তার প্রবেশপথ এই গেট। গেটের কাছে ব্রেকফাস্ট ইত্যাদি সেরে নেওয়ার জন্য রেস্তোরাঁও আছে একটা। তবে, খুব বেশি ট্যুরিস্ট এখনও আসেন না এই কেভে। লোকজন প্রায় ছিল না বললেই হয়।

আমি পিছনে যে পার্কটা দেখে এসেছি, সেদিকে, অর্থাৎ উল্টোদিকে হাঁটা লাগালাম হঠাৎ। ওখানে পাহাড়ের গায়ে কুয়াশাচ্ছন্ন ভ্যালির সামনে দোল খাব দোলনায় এই ইচ্ছা।

আমার ভাইটি আমার এই সমস্ত অপকর্মের কঠোর সমালোচক। কিন্তু আবার এনেবলারও। দিদিকে একা ফেলে যেতে পারে না। তাই সেও গজগজ করতে করতে চলল আমার পিছন পিছন।

যদিও এই অ্যাডভেঞ্চারটুকু না করলেই হত, পরে বুঝেছিলাম। কারণ আরওয়াহ্ যাওয়ার ওই হাঁটা পথের পাশে ওইরকমই পাহাড়ের গায়ে, ঝরণার শব্দ গন্ধ আসছে ভেসে এরকম জায়গায় আরেকটা পার্ক আছে, এই পার্কটার চেয়েও সুন্দর।

একটু পরে আমি আর ভাই ফিরে এলাম পার্ক থেকে। দেখি বাবা বেশ খানিকটা দূরে সিঁড়ির উপর থেকে ইশারা করে কিছু বোঝাতে চাইছে।

বুঝলাম। বাবার সেই বিখ্যাত কালো পিঠব্যাগটা আছে গাড়িতে রাখা। ওটাকে নিয়ে যেতে হবে ওনার কাছে।

নিয়ে গেলাম সে ব্যাগ টানতে টানতে।

কী ব্যাপার? না, ওই ব্যাগটা পিঠে না থাকলে নাকি নিজেকে কেমন ফাঁকা ফাঁকা অসুস্থ অসুস্থ লাগে বাবার। বোঝো!

আরওয়াহ্ কেভের টিকিট মাথাপিছু কুড়ি টাকা করে।

গেট পেরিয়েই ছোট্ট একটা কাঠের সেতু মত। সেটা পেরিয়ে সবুজ পথের শুরু।

ওই সবুজ পথটা গেছে লামস্হিনা ফরেস্টের মধ্যে দিয়ে।

জঙ্গলের মধ্যে সরু পাহাড়ী রাস্তায় খানিকটা এগোনোর পরেই একটা সাইনবোর্ড চোখে পড়বে। সেই সাইনবোর্ডে সামনের রাস্তার দিকে তীরচিহ্ন দিয়ে লেখা আছে ‘প্লেজেন্ট ওয়াক’, আর আরেকটা তীরচিহ্ন পাশ দিয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে যাওয়া একটা পথকে নির্দেশ করে বলছে, ‘রাগড্ ট্রেইল’।

অর্থাৎ পছন্দ মত আরামের বা অ্যাডভেঞ্চারের পথকে বেছে নিতে পারো তুমি।

আজ এমনিতেই আমাদের কপালে অনেক অ্যাডভেঞ্চার আছে লেখা। কাজেই রাগড্ ট্রেইলের পথ আর বাছলাম না আমরা। সিধে সোজা পথেই এগোলাম।

চারিদিকে সবুজ আর ছায়াঘেরা পথ। অচেনা পাখি আর বুনো ঝিঁঝিঁর ছাড়াছাড়া ডাক আসছে কানে। পুরো রাস্তা জুড়েই ছোট ছোট অসংখ্য ঝর্ণার চিহ্ন রয়েছে ছড়িয়ে। সেই ঝর্ণা এখন সুপ্ত বটে, কিন্তু মে মাসের শেষভাগ থেকে আবার জেগে উঠবে। আমি শুধু ভাবি, ঘোর বর্ষায় চেরাপুঞ্জির কী চেহারা হয়! সেসময় যাঁরা ট্যুরিস্ট আসেন কতটুকু তাঁরা ঘুরতে পারেন জানি না, কিন্তু যেটুকুই পারুন, প্রকৃতির অপূর্ব সিক্তসুন্দর শক্তিময়ী একটা রূপ যে তাঁরা দেখেন, তাতে সন্দেহ নেই।

লামসহিনা জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আরওয়াহ কেভে যাওয়ার রাস্তায়

রাস্তার পাশে খাদের দিকটাতে কাঠের গুঁড়ি দিয়ে শক্তপোক্ত রেলিং দেওয়া। তার ওপারে পাহাড়ের ঢালু জমিতে জঙ্গলের ফাঁকে ফাঁকে গাছ পোড়ানোর চিহ্ন দেখলাম অনেক। এই রাস্তাকে যাতে জঙ্গল গ্রাস না করে ফেলে তার জন্য মাঝে মধ্যেই গাছ পোড়াতে হয় বোঝা গেল।

আমার কাকা কাকিমা আর মা আগে এগিয়ে গিয়েছিল। আমি, ভাই, বাবা, আর বাবার ব্যাগ চলেছি অনেকটা পিছনে। তারা কতটা এগিয়ে গেছে জানি না। একটু এগোলেই দেখা পাব এমন ভাবছি। এমন সময়ে দেখি রাস্তার পাশে সিঁড়ি দিয়ে একটু নেমে সেই পূর্বোল্লেখিত পার্কে বসে আছে তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে।

আমরাও নেমে গেলাম পার্কে।

বেশি কিছু নয়। একটা দোলনা। দুয়েকটা বেঞ্চ। একটু সাজানো গোছানো। ভ্যালির সামনে পার্ক একটা। একটু দূরেই দেখা যাচ্ছে আরেক ঝর্ণা। এটাও প্রায় শুকনো এখন। দূর থেকে মনে হচ্ছে অত্যল্প জল। গর্জন কিন্তু যথেষ্ট। হাওয়ার আর জলের।

জানলাম, এটা, ওয়াহ্ কাবা ঝর্ণা।

জাপানী ভাষায় ওয়াকাবা শব্দের অর্থ নতুন পাতা, কিশলয়।

খাসি ভাষায় ওয়াহ কাবা মানে কী কে জানে?

সুন্দর পার্কে একটু জিরিয়ে নিয়ে আবার চলা শুরু করলাম।

একটু এগিয়ে দেখি এক জায়গায় রাস্তার পাশের রেলিংটা সোজা না হয়ে একটু আঁকা বাঁকা ভাবে বসানো হয়েছে। যেন মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যই।  ব্যাপার কী? সেই আঁকাবাঁকা রেলিঙের সামনে দাঁড়িয়ে বোঝা গেল, এর ঠিক নিচ দিয়েই ঝর্ণা নেমেছে একটা। সেই ঝর্ণার ঠান্ডা জল সামনের ভ্যালি থেকে ভেসে আসা হাওয়ায় চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ছিটকে এসে লাগছে আমাদের চোখে মুখে। আর…দূরে, ভ্যালির ওপারে, ওটা বাংলাদেশের সীমান্ত। কুয়াশাচ্ছন্ন ভ্যালির ওপারে সেই সীমান্তের ছবি ওঠেনি ক্যামেরায়। কিন্তু অনুভব করেছি আমরা।

রাস্তায় চলতে চলতে আস্তে আস্তে বামদিকের জঙ্গুলে পাহাড় হালকা হয়ে আসে, তার বদলে ন্যাড়া পাহাড়ের সাদাটে ধূসর পাথর চোখে পড়ে। একটু পরে দেখলাম সেই ধূসর পাথরে কালো কালো বড় বড় গর্ত। মানুষের সাইজের গর্ত। পর পর দুটো। দেখি, সেই গর্তের মুখে ভিতরের দিক থেকে শক্ত লোহার জাল আটকানো। কৌতূহল হল। উঁকি মেরে দেখতে গেলাম ব্যাপরটা। ভিতরটা ঠান্ডা! ফ্রিজের দরজা খুলে ধরলে যেমন ঠান্ডার ঝাপটা লাগে শরীরে, তেমন ঠান্ডা। উঁকি মেরে নিচে জল দেখা যায়, আর গুহার অন্ধকার।

তার মানে আশে পাশেই আছে, গুহার প্রবেশপথ।

একদম, যা ভেবেছি তাই।

দু পা এগিয়ে মোড় ঘুরতেই গুহার মুখে চলে এলাম আমরা।

আরওয়াহ্ কেভ খুব বেশিদিন আবিষ্কৃত হয়নি।

ট্যুরিস্টদের জন্য এই কেভের দরজা খোলা হয়েছে ২০১৪ সালের অক্টোবর মাসেই মাত্র।

এখানে গুহার বন্য গন্ধ এখনও রয়ে গেছে ষোল আনা।

আগে যত গুহা দেখেছি তার থেকে আরওয়াহ্ কেভকে আলাদা করে রাখব, কারণ, এ গুহার ভিতর দিয়ে গুহাপথের সঙ্গে সমান্তরালে চলেছে এক পাহাড়ী ঝিরঝিরে নদী। ইংরিজিতে যাকে বলে ‘স্প্রিং’।

গুহার ভিতর হেঁটে যাই আমরা, আমাদের পায়ে পায়ে তিরতির করে কলকল শব্দ করতে করতে বয়ে চলে ক্ষীণতোয়া স্বচ্ছ, ঠান্ডা জলের ছোট্ট মিষ্টি নদী।

গুহার ভিতরে জায়গায় জায়গায় ইলেক্ট্রিক আলো লাগানো আছে। আমরা ছাড়া ট্যুরিস্টও তেমন কেউ নেই।

 এ গুহা প্রশস্তও ভালই মোটামুটি, এক একটা অংশ ছাড়া। সেখানে নিচু হয়ে, হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকতে হয় বটে, তবু বলা

গুহার মধ্যে পায়ে পায়ে চলে পাহাড়িয়া ঝিরঝিরে নদী

যায় আরাম করেই গুহা ঘুরলাম।

 

গুহাটা মোটামুটি চার কিলোমিটার লম্বা। তার মধ্যে প্রায় মাঝ বরাবর পর্যন্ত যাওয়া যায়, যতদূর আলো লাগানো আছে, তার পরের অংশ ট্যুরিস্টদের জন্য খোলা নেই। আমরা শেষ পর্যন্ত গিয়েছিলাম, যতদূর যাওয়া যায়। তারপর গুহামুখ দুদিকে ভাগ হয়ে গেছে, একদিকে নদী গভীর, অন্যদিকে অন্ধকারাচ্ছন্ন সরু গলি।

আমার পরিবার আর ওয়াহ কেভের শেষপ্রান্তে

ওঃ! বলতে ভুলেই গেছিলাম প্রায়, আরওয়াহ্ কেভ বিখ্যাত ফসিলের জন্য। তিরিশ কোটি বছরের পুরোনো জীবেরা প্রস্তরিভূত হয়ে রয়েছে পাথরে।

টর্চ মেরে মেরে উদ্ধার করলাম তেমন তিনটে জীবাশ্মকে, ছেলেবেলার ভূগোল বইয়ের পাতায় যেমন দেখেছি ঠিক তেমনই। কোন প্রাগৈতিহাসিক যুগে কী রূপে ছিল এই পাথর, এই জীবেদের আশ্রয়স্থল ছিল, এখনও তাদের বেঁচে থাকার ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পরিবর্তন এসেছে কত, তবু সেই চিহ্ন ক্ষয়ে যায়নি।

বেরোনোর সময় আরওয়াহ গুহামুখে আমরা

ফেরার সময় গুহার উপরের রাগড্ ট্রেইলটাকে এক্সপ্লোর করার ইচ্ছায় সিঁড়ি বেয়ে গুহামুখের উপরে উঠলাম একবার। হ্যাঁ, উপরের সেই রাস্তাটা গুহার মাথার উপর দিয়েই চলেছে। তা, রাগড্ ট্রেইলটাকে কোনও ভাবেই ‘পথ’ বলা যায় না। পায়ে চলা পথও তৈরী হয়নি ওখানে। তবে হ্যাঁ, বোঝা যাচ্ছে গাছপালার মধ্য দিয়ে যাওয়া যাবে ইচ্ছে করলে। আমরা সে ইচ্ছে করিনি, যে পথে এসেছিলাম সেই পথেই ফেরার জন্য হাঁটা লাগালাম।

আমাদের পরের গন্তব্য মওসমাই কেভস্। চেরাপুঞ্জির বিখ্যাত গুহা। এখানকার সবচেয়ে বিখ্যাত ট্যুরিস্ট স্পটগুলোর মধ্যে একটা। এখানে যাওয়ার রাস্তাটুকু ভাল। ঝাঁকুনির ব্যাপার নেই। গুহাটাও সহজে অ্যাক্সেসিবল। গাড়ি থেকে নেমে অল্প কিছু সিঁড়ি ভেঙে উঠেই গুহামুখ। এই গুহায় অনেক ট্যুরিস্ট ছিল স্বাভাবিকভাবেই। আরওয়াহর তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বাদের অনুভূতি দিচ্ছিল।

মওসমাই কেভের গুহামুখ
মওসমাই কেভের ভিতরে

এখানেও টিকিট আছে। প্রবেশমূল্য মাথাপিছু চল্লিশটাকা করে।

আরওয়াহ্ কেভের চেয়ে মওসমাই কেভ অনেক অনেক বেশি সংকীর্ণ। এঁকে বেঁকে ত্রিভঙ্গমুরারী হয়ে এই গুহায় এগোতে হয়। কোথাও কোথাও দুদিকের পাথরের মধ্যের অতিসরু ফাঁক দেখে মাথা চুলকোতে হয়, কী করে এ পেরোবো। তবে, সাহস করে এগিয়ে যেতে পারলে সবাইই পেরিয়েই যান শেষপর্যন্ত। গুহার একপ্রান্ত থেকে প্রবেশ করে অন্যপ্রান্তে বেরোনোর মুখ। এক অন্যধরণের অভিজ্ঞতা।

গুহার মধ্যে আলো আছে এখানেও। ঢোকার মুখটাই বেশ সংকীর্ণ, একটু কেরামতি করে ঢুকতে হয়। ভিতরের দিকে ছোট্ট একটা লোহার সেতু আছে ছোট একটা খাদ মত পেরোনোর জন্য।

অত্যন্ত সুন্দর গুহা। কিন্তু কারো ক্লস্ট্রোফোবিয়া থাকলে এই গুহা থেকে দূরে থাকুন। যদিও, আমারও ক্লস্ট্রোফোবিয়া আছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মলে সেটা অনুভব করি আমি, কিন্তু গুহার মধ্যে কিছু হয়নি।

নিচে এবড়ো খেবড়ো ঢালু পাথর, উপরে নিচু হয়ে নেমে আসা স্ট্যালাকটাইটের ছাদ। পাথরের মাঝের ফাঁক দিয়ে গলে যেতে হবে, সে ফাঁক কিছু, মানুষের সুবিধার দিকে নজর রেখে বানানো হয়নি। একদিকে লক্ষ্য রাখতে গেলে মানুষ অন্যদিকে অন্যমনস্ক হবেই। আমাদের দলের আমরা সবাইই প্রায় মাথায় ধাক্কা, চোট পেয়েছিলাম অল্পবিস্তর। আমার কাকিমা বেঁটে মানুষ। মানে আমার চেয়েও বেঁটে। খর্বাকৃতির সুবিধে পেয়েছিল এখানে। মাথায় ব্যথা পায়নি।

গুহা থেকে বেরোনোর মুখের কাছাকাছি অংশে, এক জায়গায় গুহার ছাদে বেশ বড় গর্ত একটা। উপরের সবুজ গাছপালা এতক্ষণ অন্ধকার গুহায় ঘোরার পরে চোখ জুড়োয়। সূর্যের আলো গুহার আনাচে কানাচে এক এক জায়গাকে আলোকিত করে মায়াচ্ছন্ন রহস্যময় করে তোলে যেন। প্রকৃতির কী বিশালতা, কী উদারতা, এই সব দৃশ্য নতুন করে, সম্পূর্ণ নতুনভাবে আবার মনে পড়ায় তা।

(ক্রমশঃ)

One comment

  1. I loved as much as you will receive carried out right here.
    The sketch is tasteful, your authored subject matter stylish.
    nonetheless, you command get got an shakiness over that you wish
    be delivering the following. unwell unquestionably come further formerly
    again since exactly the same nearly a lot often inside case
    you shield this increase.

Leave a Reply