সবুজ নীলের দেশে, সাদা কালোর দেশে

পিউ দাশ

 

বেড়াতে যেতে চান অথচ অনেকদিন ঘোরা হয়নি? শুরু হল পিউ দাশের ট্রাভেলগ সবুজ নীলের দেশে, সাদা কালোর দেশে । প্রতি রবিবার ও বুধবার পড়ুন পিউর ভ্রমনকাহিনী।আজ তৃতীয় পর্ব।

 

এগারোটা বেজে গেছে।মওসমাই কেভ দেখা শেষ। নোহ্কালিকাই ফলস্ টাও দেখার ইচ্ছে ছিল। ভারতের সবচেয়ে উঁচু জলপ্রপাত বলে কথা! তাছাড়া ফলস্ টার সঙ্গে জড়িত নৃশংস মিথটাও জানতাম। কিন্তু সময়ের টানাটানি। আর বেলা করলে নোংরিয়াটের রাস্তায় অসুবিধা হবে। তাছাড়া যে কটা ফলস্ দেখলাম এখানে, তাতে স্পষ্টই বুঝতে পারছি এই ফলসের রূপ কেমন করুণ হতে পারে।

কাজেই, সেই প্ল্যান বাদ দিয়ে সিধা নোংরিয়াটের দিকে যাত্রা করাই স্থির হল। কিন্তু তার আগে কোথাও থেমে খেয়ে নিতে হবে একটু। সকাল থেকে টুকিটাকি কিছু খেয়েছি বটে, তেমন ভারী কিছু পেটে পড়েনি।

উত্তর পূর্ব ভারতে গিয়ে একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি।

একথা অস্বীকার করে বা এড়িয়ে গিয়ে তো কোনও লাভ নেই যে ভারতের এই অংশটা যে ভারতবর্ষ দেশটারই অন্তর্গত সেটা অনেকসময়ই অর্ধবিস্মৃত হই আমরা, মানে ‘পাঞ্জাব সিন্ধু গুজরাট মারাঠা দ্রাবিড় উৎকল বঙ্গ’ এই লিস্টির মধ্যে পড়ে না পাহাড়ে ঘেরা এই সাত সুন্দরী। এদের খবর আসে না মেইনস্ট্রিম মিডিয়ায়। এদের এখনও অধরা অছোঁয়া লাগে মনে মনে একটু হলেও।

 

তা সেই মনোভাবের খারাপ কী প্রভাব পড়েছে এই এলাকার উপর, তার রাজনৈতিক অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেক বিশ্লেষণ হয়তো চলতে পারে, আমি অত জানি না। এর সুফলটা কিন্তু সহজেই নজরে পড়ে।

উত্তর পূর্ব ভারতের জল বাতাস যেমন কলুষিত হয়নি মেইনল্যান্ডারদের আবর্জনায়, এখানকার আত্মাও তেমন বাইরের স্পর্শ পায়নি। এরা এখনও অভ্যস্ত নয় আমাদের দ্রুতগতির জীবনছন্দে, যেখানে দু’দন্ড থেমে আশেপাশের দিকে তাকানোর ফুরসত নেই আমাদের। যেখানে ‘আরো চাই, আরো চাই’ এর আবর্তে আটকে পড়ে যা আছে হাতের নাগালের মধ্যে, দু’হাতের মুষ্টিতে আবদ্ধ, তার দিকে আমরা আর ফিরে তাকাই না। আমরা পাওয়ার দিকে এত একচক্ষু হরিণের মত দৃষ্টিবদ্ধ করেছি, যে আত্মীকরণ আর করে উঠতে পারি না কিছুই। না সম্পর্কগুলোকে, না ছোট ছোট পাওয়া গুলোকে, না জাগতিক ভোগ্যবস্তুর টুকরো আনন্দকে।

ভোগ্যবস্তু যে নিমিত্ত মাত্র, আনন্দটাই যে আসল প্রাপ্তি, সেটা ঝাঁকি দিয়ে বোঝাতে হয় আমাদের।

না। এখানকার মানুষ এখনও তেমন হয়ে পড়েনি। এরা এখনও আছে, যাকে বলে ‘গ্রীন’। শেষের কবিতার কথা মনে পড়ল আবার। কেটী বলেছিল না, শিলং পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে অমিত হয়ে উঠেছিল, ‘যাকে বলে গ্রীন, হয়তো আগের চেয়ে স্বাস্থ্যকর, কিন্তু আগের মত ইন্টারেস্টিং নয়’। কেটী ভেবেছিল অমিত খাসিয়া হওয়ার দিকে নামছে, লাবণ্যের সংস্পর্শে এসে।

আগেও সন্দেহ করেছিলাম, এখন শিলং ঘুরে এসে আমি নিশ্চিত, অমিতের উপর একা লাবণ্যের প্রভাব ওর এত বড় পরিবর্তন ঘটায়নি, রবীন্দ্রনাথের সে অভিপ্রায়ও ছিল না। নয়তো, এত দেশ থাকতে ওই গল্পকে তিনি শিলং পাহাড়ের পটভূমিকায় বসাতেন না।

না। এই মাত্র কদিন ঘুরে এসেই আমি বুঝেছি, ওই খাসিয়া জয়ন্তিয়া পাহাড়ের ক্ষমতা আছে, একটা মানুষকে ভিতর থেকে গ্রীণ করে তোলার। সবুজ করে তোলার। একটু কাঁচিয়ে দেওয়ার, ছেলেবেলার মতন। ওখানে মাস দু-তিনেক থাকলেই শহুরে বাবু বিবিদের সফিস্টিকেশনে একটু ভাঁটা পড়বে ওই তাড়াহীন ভাঁটার তালে জীবন চালাতে গিয়ে, ওই বন্ধুত্বপূর্ণ কিন্তু উদাসিন মানুষগুলোর সংস্পর্শে।

তাড়া নেই ওদের, এটা বড় বেশি করে চোখে পড়ে।

সকালে দোকানপাট খোলে না ন’টার আগে। একটা  থেকে তিনটে আবার বন্ধ সব। আবার সন্ধে সাতটার পর থেকে দোকান গোটানোর তোড়জোড় চলে। জীবন চলে দুলকি চালে। অথচ প্রচন্ড পরিশ্রমী ওখানকার মানুষেরা। কিন্তু পরিশ্রমী যতটা, জীবনকে নিজের তালে চলতে দেওয়ার পক্ষপাতীও ততটাই। অলস নয়। কিন্তু লোভীও নয়।

ওদের মধ্যে বয়ে চলা ম্যাট্রিয়ার্ক সোশাইটির ধারা এ ব্যাপারে কোনওভাবে ওদের প্রভাবিত করেছে কিনা কে জানে? সেটা সমাজবিদ্যার গবেষণার বিষয়।

 

যাকগে, যে কারণে এই বিষয়ের অবতারণা করলাম, এখন দেশে ফিরে এসে ওখানকার এই দুলকিচালের জীবনযাত্রার ধরণের কথা ভেবে মনটা বেশ কৌতূহলী আর খুশি খুশি হয়ে উঠছে বটে, ভালই লাগছে স্মৃতির জাবড় কাটতে, কিন্তু ওখানে সশরীরে থাকার সময় এই ঢিলেঢালা মানসিকতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে বেশ অসুবিধাই হচ্ছিল আমাদের। হারিকেন ট্যুর আমাদের, সবসময়ই তাড়া। এখানে এতটুকু সময় থাকব, ওখানে এতক্ষণে লাঞ্চ খাব, সব একেবারে সিড্যুলড্। তার মধ্যে ওই ঢিমেতালের স্থান ছিল না কোনও।

মওসমাই কেভ দেখে নোংরিয়াটের দিকে চলার পথে যখন খেতে ঢুকলাম রাস্তার ধারের এক ভিড়হীন ছোট্ট খাবার দোকানে, সেইটা বড় স্পষ্ট হয়ে গেল।

এদের ধারা অনুযায়ী এরা কাজ করছে ঢিমেতালে, এদিকে আমাদের তাড়া আছে। নোংরিয়াটের পথে গাড়ি যায় ‘তিরনা’ বলে একটা গ্রাম পর্যন্ত। তারপর সেই গ্রাম থেকে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে পায়ে হেঁটে চলা শুরু। যত তাড়াতাড়ি তিরনা পৌঁছতে পারব, ততই ভাল। জঙ্গলের মধ্যে বিকেল নামলে মুশকিলে পড়ব। ঘন্টাতিনেক অন্তত হাতে নিয়ে তো যেতেই হবে।

অথচ, অর্ডার দেওয়ার অন্তত মিনিট পঁয়তাল্লিশ বাদে খাবার এল টেবিলে।

তাড়াহুড়ো করে খেয়ে নিয়ে তিরনার দিকে রওয়ানা দিলাম ঠিকই, কিন্তু নোংরিয়াটের রাস্তায় সিঁড়ি বেয়ে নামা শুরু করতে আমাদের সাড়ে বারোটা বাজল।

তিরনায় যাওয়ার রাস্তাটা সংকীর্ণ, পাহাড়ী রাস্তা। পাহাড় কেটে যে রাস্তা বানানো হয়েছে তার নিদর্শণ ভাঙাচোরা রাস্তার চারিদিকে অসংখ্য ছড়িয়ে আছে। উঁচু নিচু, খোঁদলে ভর্তি রাস্তা।

তিরনা গ্রামটা কিন্তু, মেঘালয়ের আর পাঁচটা গ্রামের মতই সুন্দর, সাজানো গোছানো। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন।

বিদেশের সঙ্গে তুলনা টানতে চাই না আমি ঠিকই, কিন্তু আমাদের দেশের শহুরে শিক্ষিত সম্প্রদায় আমরা নিজেদের দেশের থেকে বিদেশকে বেশি চিনি, তাই নিজের দেশকে বোঝাতে বিদেশের প্রসঙ্গ টানতেই হয়… মেঘালয়ের গ্রামগুলো বিদেশী গ্রামগুলোর মত সুন্দর। বিদেশের সোজা পরিস্কার রাস্তার দুপাশে, ছোট ছোট বাগানে ঘেরা ঢালু চালের একই রকম রঙে রং করা ছোট সুন্দর বাড়িতে সাজানো গ্রামগুলোর কথা মনে পড়ে? ছোটবেলায় ক্যালেন্ডারে দেখেছি? মেঘালয়ের গ্রামগুলো ঠিক ওরকম। নোংরা নেই। বিশৃঙ্খলা নেই। একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার অশোভন বিসদৃশ লোভী চেষ্টা নেই। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন শিশুর দল খেলা করছে রাস্তার পাশে। রাস্তাঘাটে ভিড় ভাট্টা হইচই চোখে পড়ে না। আর তিরনা, বা নোংরিয়াট বা স্নপডেঙের মত গ্রামগুলোতে আলাদা করে কোনো কৃত্রিমতাও সৃষ্টি করা হয়নি ট্যুরিজম আকর্ষণের জন্য বা অন্য কোনও কারণে। এই সৌন্দর্য এদের স্বাভাবিক অযত্নরক্ষিত আটপৌরে সৌন্দর্য।

তিরনা গ্রামই প্রথম মেঘালয়ান গ্রাম দেখা আমাদের। মুগ্ধ হয়ে গেলাম। আমার কাকিমা জন্মসূত্রে খ্রীষ্টান। গ্রামের ভিতর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন অসংখ্য চার্চ দেখে বেশ খুশি।

গ্রামের ভিতর ঢুকে একটু এগিয়ে গিয়ে ডাবল ডেকার রুটব্রিজে যাওয়ার রাস্তার সাইনবোর্ড চোখে পড়ে।

ওখান থেকে গাইড নিতে হয়। আর সিঁড়ি ভাঙার অবলম্বন লাঠিও এখানে ভাড়া পাওয়া যায় কুড়ি টাকা করে। আমরা গাইড নিলাম। দলের তিনজন লাঠি নিল। তারপর রওয়ানা দিলাম নোংরিয়াটের রাস্তায়। যে গ্রামে ডাবল ডেকার রুট ব্রিজ।

তিরনা থেকে নোংরিয়াট যাওয়ার যে রাস্তাটুকু, তাই নিয়ে অসংখ্য আর্টিকেল আছে ইন্টারনেটে।

কিন্তু আর্টিকেল পড়ে সে অভিজ্ঞতা বোঝা সম্ভব নয়। ভ্রমণকাহিনী লিখে বোঝানো সম্ভব নয়। সে পথের কষ্টটুকু, বা সে পথের সৌন্দর্যটা, কিছুই বর্ণনা করা যায় না এভাবে।

কষ্টটুকু বোঝানো যায় না, তার কারণ, না, মরণান্তিক বেদনা হয় না এই পথে। মনে হয় না কোথাও যে আর বোধ হয় পারব না। কিন্তু, যে কষ্টটা হয় সেটাকে ছোট করে দেখারও কোনও মানে নেই। ‘আর পারব না’ তে পৌঁছনোর আগের মুহূর্তেই এসে পৌঁছয় শরীর মন। এক টানা সাড়ে তিনহাজার খাড়াই সিঁড়ি ভাঙা মুখের কথা নয়।

 

না। এই সিঁড়ির মাঝে কোথাও একটু সমতল পথে হেঁটে নেওয়ার স্বস্তিটুকু পাবেন না আপনি। পুরো খাড়াই সাড়ে তিনহাজার সিঁড়ি…কোনও ছেদ নেই, কোনও বিরতি নেই। সামনে পিছনে যেদিকে তাকাবেন কেবল সিঁড়ির সারি চোখে পড়বে।

 

সেই সিঁড়ি পেরিয়ে যেখানে পৌঁছে একটু চওড়া জমি নজরে পড়ে প্রথম, সেই গ্রামটা দেখে স্বর্গসুখ অনুভব করে মানুষ। তৃষ্ণার্ত ঠান্ডা জল দেখতে পেলে যে অনুভূতি অনুভব করে, ঠিক সেরকমই। উপমাটা ক্লিশে শোনাতে পারে, কিন্তু একদম খাঁটি সত্য।

আর সৌন্দর্য বোঝানো যায় না, কারণ, আমাদের চেনা কোনও কিছুর উপমা দিয়েই তাকে প্রকাশ করা অসম্ভব প্রায়। সমতলের মানুষেরা, যাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা নেই, তাদের বোঝানো যাবে কী করে, এক পাহাড় দুই নদী পেরিয়ে অন্য আরেক পাহাড়ের কোলে অবস্থিত গ্রামে যাওয়ার রাস্তার অভিজ্ঞতা?

 

 

যাই হোক। তিরনা থেকে হাঁটার শুরুটা বেশ ভালই হয়েছিল আমাদের।

রাস্তার দুপাশে তখনও তিরনা গ্রাম। সিঁড়ি তখনও খাড়াই হয়নি।

আমরা নোংরিয়াটের রাস্তায় নেমে একটু ডিট্যুর নিয়ে গ্রামের মধ্যে দিয়ে ঘুরে গেলাম। ক্যামেরা হাতে আমার ভাইকে দেখে কয়েকটা শিশু ওর পায়ে পায়ে ছুটেছিল, শিশুসুলভ কলরব আর হাসাহাসি করতে করতে। ভাই তাদের দিকে ক্যামেরা তাক করতেই কিন্তু, “নো ফোটো, নো ফোটো!” বলে হাসতে হাসতে তারা এক ছুট্টে ক্যামেরা রেঞ্জের বাইরে।

কবে, এ গ্রামের কোন শিশু কোন ছবির মুখ হয়ে রাতারাতি সেলিব্রিটি স্ট্যাটাস লাভ করেছিল হয়তো। ট্যুরিস্টদের অস্বাস্থ্যকর কৌতূহল দেখেছে গ্রামের লোক। তারপর থেকে মায়েরা শিশুদের ক্যামেরা সম্পর্কে সাবধান করে দেয় রাতের বেলা খাওয়াতে খাওয়াতে।

বা, হয়তো, সেসব কিছু না। এমনিতেই প্রাইভেট লোক এরা।

গ্রামের প্রতিটা বাড়িতেই ছোট ছোট বাগান আছে। আর সেই বাগানে ফুটে আছে ফুল। সেই ফুল প্রজাপতি ভরা পথ বেয়ে নামতে থাকলাম আমরা।

রাস্তার শুরুতেই কানে এসেছিল বুনো ঝিঁঝিঁর কানে তালা লাগানো ডাক। একটানা। এই ডাক সমস্তটা পথ, সারাদিন সারারাত সঙ্গী হয়েছিল আমাদের।

একটু দূরে গিয়ে গ্রাম শেষ। সিঁড়ি খাড়াই হতে শুরু করল।

চোখে যতদূর সিঁড়ি দেখা যায় ততটুকুই এক্সহস্টিং। তারপর মোড় ঘুরেই দেখা যায় আবারও তেমনই সিঁড়ির সারি সামনে। সেই সিঁড়ি কোথাও জঙ্গলের মধ্যে মিলিয়ে গেছে। কোথাও, পাকদন্ডী হয়ে নেমে গেছে সটান নিচে। কোথাও খাড়া পাহাড়ের গা ঘেঁষে নেমেছে গভীর খাদকে পাশে রেখে। সেই সিঁড়ি বেয়েই টানা দু-আড়াই ঘন্টা নামতে হবে আমাদের।

আমার আর ভাইয়ের পিঠে ছিল ভারী ব্যাগ। রাতে থাকব, স্নান করি যদি নিচে ঝরণার জলে, সেজন্য জামাকাপড়, তাছাড়া খাবার দাবার ইত্যাদি ছিল ওই ব্যাগে। কিন্তু, তার চেয়েও বড় কথা। আমাদের সঙ্গে ছিল শীতের পোশাক। কাল রাত্রে সোহরা ভিউ লজে ঠান্ডায় কাবু হয়েছিলাম। তাই আজ একগাদা শীতপোশাক নিয়ে চলেছি নিচে। সে জিনিস বহন করা এক ঝামেলা।

পরে যখন বুঝেছিলাম যে ওই সোহরা ভিউ লজের তুলনায় বাকি চেরাপুঞ্জি অনেক গরম, আফশোষের শেষ ছিল না আমাদের।

আমরা নামতে লাগলুম।

মাঝে মধ্যে দু একজন ট্যুরিস্ট, যাঁরা ফিরে চলেছেন রুট ব্রিজ দেখে, তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হতে লাগল। ঘেমেনেয়ে ক্লান্তিতে একশা’ সব। কারো অবস্থাই খুব আশাপ্রদ নয়।

 

মোটামুটি এক তৃতীয়াংশ সিঁড়ি নামার পরই হাঁটু কাঁপতে থাকে প্রতি পদক্ষেপে। একে বলে ‘জেলি লেগ সিন্ড্রোম’। এটা কিন্তু নামার সময়ই হয়, ওঠার সময় হয় না। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার সময় হাঁটুতে চাপ পড়ে খুব বেশি, তাই এই উপসর্গ দেখা দেয়।

যাই হোক। সিঁড়ি দিয়ে নামছি তো নামছি।

নেমেই চলেছি।

নেমেই চলেছি।

মোটামুটি মাঝামাঝি পথ নামার পরে, দূরে অন্য পাহাড়ের কোলে আমাদের গন্তব্য নোংরিয়াট গ্রাম উঁকি মারে। সিঁড়ির উপর সেই বাঁক থেকে গ্রামের ঘরগুলোকে দেখায় ডেঙো পিঁপড়ের সাইজের।

ততক্ষণেই আমাদের এনার্জি লেভেল শূণ্যের কাছাকাছি। এই সময় দেখা হল, বেশ বয়স্ক এক ভদ্রলোক আর তাঁর নয় দশ বছরের নাতির সঙ্গে। উল্টো দিক থেকে আসছেন তাঁরা।

প্রশ্ন করে জানা গেল, ভদ্রলোকের বয়স সত্তর। আজকেই সকালে নেমেছিলেন এখানে। এখন ফিরে চলছেন। আমার বাবা বলে, “আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে মনে বল পেলুম মশাই! এই বয়সেও এমন ফিট যখন আপনি—”

তারপর, আবার নেমেই চলেছি।

নেমেই চলেছি।

নামতে নামতে, একসময় আমার কাকিমা বলল, হাঁটুতে টান ধরেছে।

মনে মনে বেশ ঘাবড়ে গেলাম সবাই। নামার রাস্তাই তো এখনও অর্ধেক বাকি রয়েছে। তারপর তো ওঠার ব্যাপার আছে কালকে।

মনে ঘাবড়ালেও, মুখে কেউ কিছু বললাম না।

খানিকটা নামার পর, রাস্তার ধারে সিঁড়ির পাশে একটু চওড়া এক জায়গায় একটা ছোট্ট গীর্জা চোখে পড়ল।

চারিদিকে পাহাড়, আর সামনে সটান নেমে যাওয়া সিঁড়ির মাঝে সে এক মনোহর দৃশ্য।

আবার নামছি। আবার নামছি।

দেখা হল এক বাঙালী দম্পতির সঙ্গে। এঁরাও ফিরছেন ডাবল ডেকার থেকে। মধ্য চল্লিশের আশেপাশে বয়স। লোকটি মোটামুটি ফিটই আছেন। কিন্তু সঙ্গের মহিলাটির অবস্থা খুবই খারাপ। আমরা অভয় দেওয়ার চেষ্টা করলাম, ‘কোনও অসুবিধা নেই। আস্তে আস্তে যান। সময় লাগবে, কিন্তু পৌঁছে যাবেন।’

আরো একটু উৎসাহ দেওয়ার জন্য যোগ করলাম, ‘আরে, আপনার আর এমন কী বয়স? এক বয়স্ক ভদ্রলোককে দেখলাম রাস্তায়। সত্তরের উপর বয়স—’

মহিলাটি আমাদের থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আমার শ্বশুর।’

অ্যাঁ! সেকী?

‘হ্যাঁ। উনি আর আমার ছেলে এগিয়ে গেছেন। খুব এনার্জি ওদের।’ বললেন উনি হেসে। শ্বশুর আর ছেলের এই কৃতিত্বে খুশি।

কিন্তু, তারা তো অনেক উপরে। আধঘন্টা আগে ফেলে এসেছি তাদের।

মহিলাটি হাসলেন। ‘হ্যাঁ। ওদের সঙ্গে পেরে উঠছিলাম না তো আমি। তাই ওদের এগোতে বললাম।’

আমরা ওঁদের বিদায় জানিয়ে আবার নামতে লাগলাম।

নামতে নামতে পোঁছলাম সেই গ্রামে যেখানে সিঙ্গল রুট ব্রিজ আছে। পৃথিবীর দীর্ঘতম লিভিং রুট ব্রিজ এটা। বলে রাখা ভালো, পুরো পৃথিবীর মধ্যে, এক মেঘালয়, আর নাগাল্যান্ডেই লিভিং রুট ব্রিজ আছে। পুরো পৃথিবীর ভ্রমণপিপাসু পর্যটকদের কাছে এ এক অদ্ভুত আকর্ষণ।

তা এই সিঙ্গেল রুট ব্রিজটার রাস্তা ডাবল ডেকারের রাস্তার থেকে আধঘন্টার ডিট্যুর একটা। এতক্ষণ সিঁড়ি ভেঙে আমরা সবাই ক্লান্ত তখন। তাছাড়া, বেলা পড়ে আসছে। কাজেই, আজ আর এই ব্রিজে গেলাম না। কাল ফেরার পথে এই ব্রিজে যাওয়া হবে ঠিক করলাম।

সিঙ্গেল রুট ব্রিজের গ্রামের পরে খানিকটা রাস্তা সিঁড়ি আর অত খাড়াই না। হাঁফ ধরে যাওয়া মন একটু শান্তি পায় দু তিন পা পরপর সমতল ভূমিতে পা রাখতে পেরে।

এর একটু পরেই আসে পাহাড়ী নদী একটা। নদীতে জল নেই এখন, কিন্তু নদীখাত খুব গভীর। আর তার উপর দিয়ে প্রথম সিম্পল সাসপেন্সন ব্রিজ। ব্রিজটা দেখতে বিপজ্জনক। একসঙ্গে অনেকজনকে এই ব্রিজে উঠতে বারন করে গাইডরা। ভয়ংকরভাবে নড়ে বা থরথর করে কাঁপে এই ব্রিজ। কয়েকটা লোহার রড পরপর ফেলে কোনওমতে পা রাখার জায়গা নিচে।

বাকিরা এগিয়ে গেছিল। আমি ছিলাম কাকিমার পিছনে। কাকিমা তো সেই ব্রিজ পেরোতে গিয়ে ভয়ে অর্ধেক। ছোটবেলায় গীর্জায় শেখা ভয়মুক্তির গান গাইতে শুরু করল প্রভু যীশুকে স্মরণ করে গলা ছেড়ে। গানের কথাগুলো এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। নইলে লিখে দিতুম এখানে। কাকিমা আমাকেও বলছিল গানে যোগ দিতে। কিন্তু বিপদে পড়লে কখনো ঈশ্বরকে মনে পড়ে না আমার। তাছাড়া ভয়ও তেমন পাইনি। তাই সেভাবে গলা মেলাতে পারিনি কাকিমার গানে। আমার গান গাওয়ার ওই অলস চেষ্টা দেখে কাকিমা খুব একটু চোটপাট করে নিল আমার উপর।

প্রথম সাসপেন্সন ব্রিজ পেরোনোর পর কিছু সিঁড়ি উঠতে হয়। তারপর আরো বেশ একটু এগিয়ে, কিছু সিঁড়ি উঠে, কিছু সিঁড়ি নেমে, সামনে পড়ে দ্বিতীয় ব্রিজটা।

এই ব্রিজটা আগের ব্রিজের থেকে আরো অনেকটা বেশি লম্বা। তবে অতটা ভয়ংকর নয়। প্রথমটার তুলনায় একটু শক্ত পোক্ত ভাবে বানানো। এই ব্রিজের নিচে নদী চরে বড় বড় পাথরে বসে দল দল ছেলেমেয়েরা বিয়ার টিয়ার খাচ্ছে দেখলাম। কাচের মত স্বচ্ছ জল দেখা যাচ্ছে। মা বায়না ধরল, নিচে নামবে। বাকিরা সেই বায়না থামিয়ে দিলাম। শিগ্গির পৌঁছতে হবে নোংরিয়াট। এই মন্ত্রই জপছিলাম আমরা সকলে তখন।

এই ব্রিজের পর পাহাড়ে ওঠার পালা শুরু। নোংরিয়াট যে পাহাড়ের কোলে অবস্থিত সেই পাহাড়ের গা বেয়ে খানিকটা উঠব।

এখন আর সিঁড়ি নিচে নামে না, ওপরে ওঠে। তিন সাড়ে তিন শ’ সিঁড়ি এখানেও। সেই খাড়াই উঠে যাওয়া সিঁড়ির সারির দিকে তাকালেও ভয় করে।

উঠতে শুরু করলাম সিঁড়ি। জঙ্গল এখানে অদ্ভুত এক গা ছমছমে রূপ ধারণ করেছে। তার কারণটা ঠিক বুঝতে পারিনি। বেলা পড়ে এসেছিল বলেই কি জঙ্গলের রূপ অমন মায়াময় দেখাচ্ছিল? নাকি, এমনিই গ্রামের কাছাকাছি এসে পড়েছি বলে এতক্ষণের অচেনা অচেনা তীব্র সৌন্দর্য্যকে হঠাৎ একটু লাজুক কিশোরী কন্যার মত মনে হচ্ছিল?

নোংরিয়াটের কাছে পৌঁছে ছোট্ট একটা রুট ব্রিজ পেরিয়ে আবার কিছু সিঁড়ি বেয়ে উঠে গ্রামে ঢুকতে হয়।

এটাই প্রথম রুট ব্রিজ আমাদের সেভাবে বলতে হলে। কিন্তু তখন খুব টায়ার্ড ছিলাম, ওই ছোট্ট রুট ব্রিজকে পেরিয়ে গেছিলাম ওর দিকে ভাল করে খেয়াল না করেই।

একদম গ্রামের কাছাকাছি পৌঁছে ভাই বলল ‘আর পারা যাচ্ছে না!’

একেই কালকে ছেলেটার শরীরটা খারাপ হয়েছিল একটু। তার ওপরে কাঁধে অত বড় ব্যাগ, ক্যামেরা। ছবি তুলতে তুলতে এসেছে পুরো রাস্তাটা। ডিহাইড্রেশনের এফেক্ট দেখা দিয়েছে শরীরে। এনার্জি একদম ড্রেইনড্। তখনও শ দেড়েক সিঁড়ি বাকি প্রায়। নোংরিয়াটকে দেখতে পাচ্ছি দূর থেকে। সিঁড়ির উপর একজায়গায় বসে পড়ল ও।

সিঁড়ি বেয়ে একটু নিচেই একটা দোকান চোখে পড়ছিল। একটু আগেই পেরিয়ে এসেছি ওটা। নিজেই গিয়ে সেখান থেকে একটা নিম্বুপানি কিনে এনে খেয়ে ফেলল খানিকটা।

বাকিদের বললাম এগিয়ে যাও। আমি ওর সঙ্গে বসে রইলাম খানিকক্ষণ। কিন্তু তারপরই মনে পড়ল, আরে, এখানে যেখানে রাত্রিবাসের কথা আমাদের, সেই সিরিন হোমস্টের মালিকের সঙ্গে সব কথাবার্তা তো আমিই চালিয়েছি! অতএব, আমার তো যাওয়ার দরকার সবার আগে। কাজেই ওকে একা ওখানে বসিয়ে রেখেই আমি এগোলাম।

ডাবল ডেকার রুট ব্রিজে যাঁরা যেতে চাইবেন, তাঁদের বলব, কখনোই একদিনে যাওয়া আসা পুরো ট্রেকের প্ল্যানিং করবেন না।

প্রথমত, সেক্ষেত্রে শুধু যাওয়া আসাতেই সময় লাগে পাঁচ থেকে ছয় ঘন্টা। মধ্যিখানে যে সময়টুকু রুট ব্রিজের আশেপাশে ঘোরা যায়, তাতে মজুরি পোষায় না।

দ্বিতীয়ত, নোংরিয়াটে একরাত থাকতে পারার অভিজ্ঞতা কারোরই মিস করা উচিত নয়। চারিদিকে পাহাড় দিয়ে ঘেরা, আপনি আছেন পাহাড়ের পাদদেশে। খাসি ভাষায় ‘নোংরিয়াট’ কথাটার অর্থই নাকি, ‘পাহাড়ের কোলে এক গ্রাম’। এখানে সোজাসুজি তাকালে কোনোদিকেই আকাশ চোখে পড়ে না। দৃষ্টি কালচে, সবজে, খয়রেটে পাহাড়ের গায়ে গিয়ে ধাক্কা খায়। আকাশ দেখতে হলে শুধু মাথার উপর।

সত্যি কথা বলতে, মনে হবে, আপনি পৃথিবীর ভিতরে কোথাও, তার গোপন গর্ভে পৌঁছে গেছেন। আমাদের চেনা পৃথিবীর থেকে অনেকটাই আলাদা একটা স্বাদ গন্ধ অনুভূতি এখানে পৃথিবীর। উপরের জগৎটাকে তখন যেন বড় বেশি উন্মুক্ত, নির্লজ্জ খোলামেলা বলে মনে হয়। নোংরিয়াট যেন অর্ধস্ফুট কুঁড়ির সৌন্দর্যের মত সুন্দর। ভীরু কিশোরীর ভীত লজ্জার মত গোপনীয় সুকোমল। সবুজ। লাজুক চঞ্চল অথচ নিভৃত।

কবিত্ব বেশি হয়ে যাচ্ছে মনে হয়। কিন্তু আমি অপারগ। সত্যিই প্রকৃতির কিছু কিছু সৌন্দর্য্য আছে যার বর্ণনা করতে গেলে একটু কবিত্বের আমদানি করতেই হয় ভাষায়।

যাই হোক। আমি বলব, ডাবল ডেকারে গেলে নোংরিয়াটে অন্তত একরাত থাকতে। আরো বেশিদিনও থাকতে পারেন। আমাদেরই আফশোষ হচ্ছিল কেন থাকিনি আমরা আরেকটা দিন অন্তত।

থাকার ব্যবস্থা ওখানে খুব বেশি নেই যদিও। আমি ইন্টারনেট ঘেঁটে সিরিন হোমস্টে আর চ্যালি গেস্ট হাউসের খবর পেয়েছিলাম। আমরা সিরিনে ছিলাম। ওখানে গ্রামে ঘুরতে ঘুরতে চ্যালি হোমস্টেও চোখে পড়েছিল আমাদের।

চ্যালি হোমস্টেতে থাকার ঘর খুবই সীমিত। তবে সামনে খোলা জায়গা আছে। সেখানে টেন্ট পেতে থাকা যায়।

সিরিন হোমস্টে নোংরিয়াটে থাকার সবচেয়ে বিখ্যাত জায়গা। সিঁড়ি বেয়ে নোংরিয়াটে উঠেই প্রথম বাড়িটাই প্রায় মিস্টার বাইরনের। এখানে থাকার ব্যবস্থা ডর্মিটরি স্টাইলে, ভাড়া বেডপিছু ৫০০ টাকা। বুকিং করার সময় ফুল পেমেন্ট করে দিতে হয়। সিরিনের মালিক মিস্টার বাইরন। ট্যুরিস্টদের ফুল প্রাইভেসি দেন। মানুষ হিসেবে কতটা সোজা এবং সৎ সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।

সিরিনে রুমের সঙ্গে অ্যাটাচড্ বাথরুমের ব্যবস্থা নেই। কোনো প্রকৃত খাসি গ্রামেই সে জিনিস নেই। রুমের সঙ্গে অ্যাটাচড্ বাথরুমের ধারণাটাকেই ওরা অপছন্দ করে। একই রুমের একদিকে ল্যাট্রিন, অন্যদিকে স্নানের ব্যবস্থাকেও অপছন্দ করে এরা। এখানে বাথরুম ল্যাট্রিন সম্পূর্ণ আলাদা আলাদা।

অ্যাটাচড বাথরুম নেই। কিন্তু তাতে আমাদের অসুবিধা হয়নি।

আমরা সিরিনে দোতলায় পাশাপাশি দুটো ট্রিপল বেডরুমে ছিলাম। একটাতে আমি মা আর কাকীমা, অন্যটাতে ভাই বাবা আর কাকা।

দুটো রুমই পাশাপাশি, অন্য কোনও রুম ছিল না আশেপাশে। রুম দুটোর সামনে দিয়ে যে বারান্দা গেছে, একটু বেঁকে সেই বারান্দার সঙ্গেই সংলগ্ন দুটো বাথরুম, একটা ইউরোপিয়ান স্টাইল টয়লেট, একটা ইন্ডিয়ান স্টাইল টয়লেট। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। সমস্তরকমের সুবিধাযুক্ত।

যাই হোক, রুমটুম দেখে, জিনিষপত্র রুমে রেখে, আমরা ডাবল ডেকারের দিকে চললাম। সেই দেখতেই তো আসা এত কষ্ট করে।

ডাবল ডেকার একদম সিরিন হোম স্টের সঙ্গে সংলগ্নই বলা চলে। কিন্তু সেই ওইটুকু পথও সিঁড়ি ভাঙতে হয়। সত্যি কথা বলতে, সিঁড়ি দেখলেই আতঙ্ক লাগছে এখন আমাদের।

তবু, কী আর করা, চললুম ধীরে সুস্থে সেদিকে।

ডাবল ডেকার রুট ব্রিজে ঢুকতে টিকিট লাগে। মাথাপিছু কুড়ি টাকা করে। সিঁড়ির যেখান থেকে রুট ব্রিজ দেখা যায় প্রথম উঁকি দিয়ে, সেখান থেকে রুট ব্রিজ দেখে মন দমে গেল। কই যেমন সব জায়গায় পড়লাম, দারুণ দারুণ, তেমন তো কিছু লাগছে না। জলটাও তো, সো সো। একটু স্কেপ্টিকাল হয়েই নিচে নামা শুরু করলাম। নিচে নেমে যদিও, জায়গাটাকে নিদারুণ সুন্দর দেখাচ্ছিল। সোহরাতে আমাদের সঙ্গে ছিল যে ভিনদেশী ছেলেটি, তাকেও দেখলাম এখানে। এক পাথর থেকে আরেক পাথরে ছোটাছুটি করে ছবি টবি তুলছিল।

আমার বাবাও দেখাদেখি একটু দৌড়ে নিল। তারপর তাকে বলল, ‘হেলো! আই অ্যাম সিক্সটি। সি, আই ক্যান রান, জাস্ট লাইক ইউ।‘

সে তো তাতে হেসেই অস্থির। বলে, ‘ইয়েস! আই হ্যাভ সিন ইউ, অ্যাট দ্য টপ।‘

ঠিক ঠিক। এক জায়গা থেকেই তো আসছি আমরা। মুখচেনা তো আগেই হয়ে গেছে।

বেলা তখন চারটে সাড়ে চারটে। পূর্বদিক, সূর্য এখানে পাটে নামে তাড়াতাড়ি এমনিতেই। তার উপরে উঁচু পাহাড়ের আড়ালে সে ততক্ষণে অলরেডিই মুখ লুকিয়েছে।

আমরা, আর ওই ছেলেটি ছাড়া আর কেউ নেই ডাবল ডেকারের আশেপাশে।

ভুল বললাম। আরেকজন স্থানীয় লোক ছিলেন। নিজের কাস্তে বা কাটারি জাতীয় কিছু একটা অস্ত্র ধুচ্ছিলেন জলে ডুবিয়ে। কিন্তু তাঁর উপস্থিতি এত নীরব, এত কম ইন্ট্রুসিভ, যে কোনওভাবেই প্রকৃতির থেকে আলাদা লাগছিল না সেটাকে।

আমার ভাইও স্বচ্ছ টলটলে জলের ছবি নিল কিছু। তারপর, বিদেশী ছেলেটিকে ঝর্ণার জলে পা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিজেও জলের উপর একটা পাথরের উপর পা দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।

ঝর্ণা যেখানে সবে বড় বড় পাথর থেকে নেমে গড়িয়ে পড়ছে, সেখানটা জল গভীর, স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু জলাশয়ের ধারের দিকে জল কম। কম বলতে একহাঁটুরও কম। জলের নিচে নুড়ি পাথর, গাছ থেকে ঝরে পড়া পাতা, মাছ টাছ সব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। প্রচুর মাছ ওই জলে। ওখানে পা রেখে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে ছোট ছোট মাছগুলো এসে পায়ের পাতার উপর ঘোরাফেরা করে। কুড়ে কুড়ে পায়ের নোংরা সাফ করে দেয়। ফ্রি ফিশ স্পা একদম। আমার ভাইয়ের পায়ের উপর যেই মাছ এসেছে, অমনি সে, ‘উঃ, সুড়সুড়ি লাগছে, সুড়সুড়ি লাগছে!’ করে হেসেই অস্থির।

যাই হোক। সারাদিন প্রচুর ধকল গেছে। তাছাড়া, সন্ধেও নেমে আসছে দ্রুত। আমরা আর বেশিক্ষণ বসলাম না ডাবল ডেকারের আশেপাশে। সিরিনে ফিরে গেলাম সেদিনকার মত। কাল সকালে আবার আসব এখানে।

অনলাইনে সিরিন সম্পর্কে যত রিভিউ দেখেছি, সবই মিশ্র প্রতিক্রিয়া। আমাদের কিন্তু সবই বেশ, বে-এ-শ ভাল লেগেছে। লোকেশন নিয়ে তো কথা হবে না। এছাড়া বাথরুম, শোওয়ার ব্যবস্থা সবই ভাল। ওখানে তো আর থ্রি স্টার হোটেলের পরিষেবা চাইব না আমরা? শুধু খাওয়াটা বাদে। যেরকম স্বভাব আমাদের, ওই খাবার নেওয়া যায় না জাস্ট। ভাতটা সিদ্ধ হয়েছে এমনভাবে, যে দানাগুলোকে আলাদা করে চেনার কোনও উপায়ই নেই। তরকারি টরকারি ডাল টালও তথৈবচ। সন্ধে সাড়ে সাতটার সময় ব্যুফে স্টাইলে খাওয়া, নিচের ডাইনিং রুমে। তবে চাইলে খাবার দাবার থালায় তুলে নিজেদের ঘরে নিয়ে যেতে পারো। জল ঐ ডাইনিং এরিয়াতেই ফিল্টার থেকে নিয়ে নিতে হয়। সারারাত খোলা থাকে ওই রুমটা।

যা হোক, সবাই দেখলাম ওই খাওয়াই বেশ হাসিখুশি সোনামুখ করে খেয়ে নিচ্ছে। ইটালিয়ান দুই বান্ধবী, জাপানিজ এক কাপল এবং আরেকটা বিদেশী গ্রুপ ছিল সিরিনে। ইন্ডিয়ান চারজন ছেলের একটা দলও ছিল। এদের কারো সঙ্গেই সেভাবে ইন্টার্যাকশন হয়নি আমাদের।

খাওয়া দাওয়া করে নিলাম কোনওমতে। যে খাবারদাবার উপর থেকে এত কষ্ট করে নিয়ে এসেছি, সেগুলোকে কাজে লাগাতে হবে বোঝাই যাচ্ছে। সকালে ব্রেকফাস্টে আর সিরিনের খাবার খাওয়ার সাহস নেই মনে।

পরেরদিন আশপাশটা ঘুরে দেখতে হবে। কাছাকাছির মধ্যেই অনেক ন্যাচরাল সুইমিং পুল আছে শুনেছি নদীখাতের পাশে পাশে। বর্ষাকালে নদী যখন ফুলে ওঠে তখন জল ঢুকে পড়ে নদীর পাশের বড় বড় পাথর খন্ডগুলোর মধ্যে, পরে জল যখন নেমে যায়, তখন আর ওই জল বেরিয়ে যেতে পারে না। পরিষ্কার টলটলে নীল জল জমে থাকে পাথরের ফাঁকে। এইগুলোই ন্যাচরাল সুইমিং পুল।

এদিকে, ওই সাড়ে তিনহাজার একটানা সিঁড়ি এখনও চোখের উপর ভাসছে।

সত্যি কথা বলতে, যতই সবাইকে বারবার করে বলে থাকি না কেন যে খুব কষ্ট হবে, যতই সাবধান করি না কেন, যতই ওরা সকলে বায়না করুক না কেন— এখানে বেড়াতে আসার প্ল্যানিং আমি করেছি, এদের সকলকে নিয়ে এসেছি আমিই এই লোকচক্ষুর আড়ালে নিভৃত জায়গায়। কাকা আর বাবা পেরে যাবে। হাঁটু ব্যথা ইত্যাদি নিয়েও লড়ে যাবে ওরা। আমার চিন্তা হচ্ছে মা আর কাকিমাকে নিয়ে। মায়ের যদি খুব কষ্ট হয়, আর না পারে, আমি নিজে সেটা সহ্য করব কী করে?

কাকিমারও খুব কষ্ট হচ্ছে বুঝতেই পারছি, তার ওপরে হাঁটুতে টান লেগেছে। ওরা কেউই তো ঘ্যানঘ্যান করে কষ্ট জানানোর লোক নয়। সেই অসহ্য কষ্ট ওরা মুখবুজে সহ্য করলে আমারই তো অসহ্য গিল্ট হবে।

নামতেই এরকম কষ্ট, ওঠার সময় না জানি কী রকম কষ্ট পাবে ওরা!

আর, এ গ্রাম থেকে বেরোনোর তো অন্য কোনও উপায়ও নেই। ওই সিঁড়িই ভাঙতে হবে।

তবে শুনেছি নাকি ওই সিঁড়ি কেউ ভাঙতে না পারলে পাঁচ ছয় হাজার টাকার বিনিময়ে তাঁকে কাঁধে বা পিঠে করে উপরে পৌঁছে দিয়ে আসার লোক পাওয়া যায় এই গ্রামে।

এইসবই ভাবছি রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে। মা আর কাকিমা ঘরের অন্য দুটো খাটে শুয়ে আছে। ঘুম যে কারোরই খুব ভাল হচ্ছে না বুঝতেই পারছি।

আমি আবার চোখ বুজে একটু তন্দ্রা তন্দ্রা মত এলেই দেখছি সিঁড়ি ভাঙছি। সামনে অগুন্তি সিঁড়ি, নামতে গিয়ে পা কেঁপে গিয়ে পিছলে পড়ে যাচ্ছি নিচে। চমক লেগে ঘুমের চটকাটা ভেঙে যাচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে। কিছুতেই আর ঘুমোতে পারছি না। যেই চোখ একটু বুজে আসে অমনি দেখি সিঁড়ি, পিছলে পড়ে যাচ্ছি। মনকে সজাগ থাকার সিগন্যাল পাঠাচ্ছে মস্তিস্ক। ঘুমিয়ে পোড়ো না, সামনে সিঁড়ি, বিপদ। সজাগ মন যত বলে, আরে এখন সিঁড়ি নেই! কিছুতেই কিছু হয় না।

ক্কী জ্বালা! ঘুম আর আসে না!

এমন সময় পাশের ঘর থেকে কাকার গম্ভীর গমগমে গলার আওয়াজ এলো একটা। ‘হে ভগবান!’

আমার কাকা রাত্রে ঘুমের ঘোরে চিৎকার করে। এটা কাকার স্বভাব। সেই ছোট্টবেলা থেকে শুনে শুনে অভ্যস্ত আমি। তখন, এক বাড়িতে আমাদের ঘরের পাশের ঘরে থাকত কাকারা। তখন ঠাকুমা ছিল বেঁচে। কাকা ঘুমের ঘোরে ডাকত, ‘ও মা!’ আমি আর মা হাসতাম।

চব্বিশ বছর হল ঠাকুমা মারা গেছে, তারপরেও কাকা ডাকত কখনো, ‘ও মা!’

তখন আর মা হাসত না ওই ডাক শুনে।

কাকার মস্তিস্ক তারপরে কখন সিগন্যাল পাঠিয়ে দিয়েছে মনকে, মাকে ডেকে লাভ নেই আর। এখন কাকা ঘুমের ঘোরে মায়ের পরেই মানুষের যে দ্বিতীয় আশ্রয়, তাকে খোঁজে। ‘হে ভগবান!’

প্রথমে চমকে উঠে ভেবেছিলাম, কী হল, পায়ে কি এত যন্ত্রণা হচ্ছে যে থাকতে না পেরে কাকা চেঁচিয়ে উঠছে?

তারপর বুঝলাম, না, ঘুমের ঘোরে চলছে হাঁকডাক।

তারপর, কখন যে একটু চোখ লেগে গেছে জানি না।

You may also like...

1 Response

  1. Thank you for another informative blog. Where else could I am getting that type of information written in such a perfect
    manner? I’ve a undertaking that I am simply now operating on, and I’ve been on the look out for such information.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *