সবুজ নীলের দেশে, সাদা কালোর দেশে

পিউ দাশ

 

বেড়াতে যেতে চান অথচ অনেকদিন ঘোরা হয়নি? শুরু হল পিউ দাশের ট্রাভেলগ সবুজ নীলের দেশে, সাদা কালোর দেশে । প্রতি রবিবার ও বুধবার পড়ুন পিউর ভ্রমনকাহিনী।আজ চতুর্থ পর্ব।

এগারোই মার্চ

ঘুম ভাঙল ভোর সাড়ে চারটেয়। আশেপাশে পাখি ডাকছে, কানে আসছে তাদের চেঁচামেচি, কিন্তু সত্যি কথা বলতে পাহাড়ের কোলে এই খাসিয়া গ্রামে জঙ্গুলে ঝিঁঝিঁর ভয়ানক শব্দের কাছে সেই সব পাখির ডাক নিতান্তই ম্লান। ঝিঁঝির ডাক এত জোরালো এখানে, যে দু’হাত দূরের লোকের সঙ্গে কথা বলতে হলে চেঁচাতে হয় রীতিমতো। প্রকৃতি যে এত সশব্দ হতে পারে, নোংরিয়াটে না এলে সে কথা আমি জানতে পারতুম না।

ভোর পাঁচটার মধ্যে সবাই উঠে পড়লাম বিছানা ছেড়ে। নোংরিয়াটের অন্ধকারে তখন একটু আবছা ভাব এসেছে। চারিদিক থেকে পাহাড়েরা হালকা কালচে আকাশের গায়ে ঘন কালো হয়ে রয়েছে। সিরিনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটু দূরে পাহাড়ের গায়ে গ্রামের গীর্জার আলো দেখা যাচ্ছে। সে আলো দেখলেই মন ভাল হয়ে যায়।

আমাদের আটটা সাড়ে আটটার সময় এখান থেকে বেরিয়ে পড়তে হবে। যাওয়ার সময় ন্যাচারাল সুইমিং পুল, সিঙ্গেল রুট ব্রিজ, এসব দেখতে দেখতে যাব। প্লাস এবারে গ্র্যাভিটির বিরূদ্ধে সাড়ে তিন হাজার সিঁড়ি ভেঙে ওঠা… দুপুর বারোটার মধ্যে তিরনায় পৌঁছতে গেলে এর চেয়ে বেশি দেরি করা যাবে না।

মায়ের পায়ে ব্যথা নেই বলেই বরঞ্চ মাকে খুব চিন্তিত দেখাল, ব্যাপারটা কী? এ তো স্বাভাবিক নয়! এদিকে কাকিমার পায়ের অবস্থা খুব একটা ভাল নয়! সবাইই কম বেশি চিন্তিত ওঠার রাস্তা সম্পর্কে।

বেশ অন্ধকার রয়েছে চারিদিকে, কিন্তু বড়রা সবাই ঘুম থেকে উঠেই অভ্যেসমতো চা চা করতে শুরু করেছে। মেঘালয়ের লোকেদের ধারা অনুযায়ী এই গ্রামের সবাই যদিও এখনও গভীর ঘুমে মগ্ন বলেই বোধ হচ্ছে। লক্ষ্য করেছি, এসব জায়গার লোকেরা সবাই আর্লি টু বেড অ্যান্ড লেট টু রাইজ।

যাই হোক, আমি আর ভাই রুট ব্রিজের দিকে হাঁটা লাগালাম তখনই।

এবং, এখানে, আবার একটা সাহিত্যের ক্লিশে লাইন ধার করে বলতেই হচ্ছে, ‘আহা! কী দেখিলাম! জন্ম জন্মান্তরেও ভুলিব না!’

কাল সন্ধেবেলায় যা দেখেছিলাম, সে ডাবল ডেকারের ছায়ামাত্র ছিল, এই ভোরের বেলায় এই রুট ব্রিজ দেখে বোঝা যায়, কেন প্রকৃতিপ্রেমী, সৌন্দর্যপ্রেমী মানুষদের কাছে এমন আকর্ষনীয় এই ডাবল ডেকার রুট ব্রিজ। যেন বইয়ে পড়া কোনও এক ফ্যান্টাসী ওয়ার্ল্ড থেকে তুলে আনা হয়েছে একে। এমন জিনিষ বাস্তবে আছে, এবং আমাদের দেশেই এত কাছাকাছির মধ্যে, এ কথা বিশ্বাস করা কঠিন সত্যিই।

দুপাশ দিয়ে সিঁড়ি নেমেছে, সামনে ঝর্ণা নামছে পাথরের উপর দিয়ে কলকল শব্দে, সেই ঝর্ণার জলে যে নদী তৈরী হয়েছে সে নদীর নাম ‘উমশিয়াং। টলটলে স্বচ্ছ জলে নিচ পর্যন্ত দেখা যায়, অসংখ্য মাছ খেলা করছে নির্ভয়ে।

আর সেই নদীর উপর প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরী এই ডাবল ডেকার ব্রিজ। গাছের শিকড় পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে জড়িয়ে তৈরী করেছে সেতু। শিকড়ে শিকড়ে জমাট বুনোন।

এখানে যে মানুষই থাকে, এবং রূপকথার হুরী পরীরা নয়, সেই এক আশ্চর্য।

রুট ব্রিজ কিভাবে তৈরী হয় সে সম্পর্কে একটু জ্ঞান দিই এখানে। মানে, আমি যেটুকু বুঝলাম। নদীর পাশে লাগানো হয় রবার গাছ, যার বৈজ্ঞানিক নাম ফিকাস ইলাস্টিকা। এই গাছের একধরণের মূল আছে, পাথুরে ঢালু জমিতে বেড়ে ওঠা গাছকে ব্যালান্স ঠিক রেখে দাঁড়িয়ে থাকতে সাহায্য করার জন্য। এই মূল খুব শক্তপোক্ত হয়, যথেচ্ছ লম্বা হতে পারে এবং সামনে কোন পাথর ইত্যাদি থাকলে তাকে আঁকড়ে ধরে গাছকে খাড়া থাকতে সাহায্য করে। তা, খাসিয়া জয়ন্তিয়া পাহাড় এলাকার অধিবাসীরা এখানে এই প্রবল বৃষ্টিপ্রবণ জায়গায় এই পাহাড়ী গ্রামে টিকে থাকার জন্য কোন আদিকালে কে জানে, আবিষ্কার করে ফেলেছিল এই ফিকাস ইলাস্টিকাকে ব্যবহার করে ছোট্ট ছোট্ট পাহাড়ী ঝর্ণা বা নদীর উপর সেতু বানানোর পদ্ধতি। ক্ষীণদেহী পাহাড়ী নদীর ধারে যেখানে সেতুর প্রয়োজন তা ঠিক করে নিয়ে, সেখানে গাছ লাগিয়ে সেই গাছের মূলকে কোনওভাবে পাকিয়ে পাকিয়ে, এখানে ওখানে ঠ্যাকনা দিয়ে ওপারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ওপারে পৌঁছে সেই মূল পাথর আঁকড়ে ধরে শক্ত হয়ে ওঠে আপনা থেকেই। এইভাবেই বেশ কিছু মূলকে পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে পাকিয়ে দিয়ে গড়ে ওঠে এক একটা সেতু। একটা ব্রিজ তৈরী করতে পঞ্চাশ থেকে একশো বছর সময় লাগে। গ্রামের সবাইই কম বেশি জড়িত থাকে এই কাজে।

তেমন শক্তপোক্ত রুট ব্রিজের উপর পাঁচশজন একসঙ্গে উঠতে পারে। যতদিন গাছ মরে শুকিয়ে না যাবে, ততদিন জীবন্ত এবং ফাংশনাল থাকবে এই ব্রিজও।

শুনলাম, আগে এই খাসিয়া জয়ন্তিয়া পাহাড়ের আরো অসংখ্য রুট ব্রিজের মতই এই জিংকিয়েং নোংরিয়াটও একতলাই ছিল। পরে একসময় একবছরের প্রবল বর্ষায় ঠিক ঝর্ণার মুখে তৈরী এই ব্রিজ, ফুলেফেঁপে ওঠা উমশিয়াং নদীর জলের তোড়ে ডুবে যায়। তখনই গ্রামবাসীরা উপরের তলার ব্রিজটির পরিকল্পনা করে। পরে যখন একসময় এই দোতলা ব্রিজ আবিষ্কৃত হয়ে দেশবিদেশের ভ্রমণপিপাসুদের আগমন ঘটতে থাকে এখানে, প্রকৃতি এবং মানুষের মেলবন্ধনের এই অদ্ভুত সৃষ্টি দেখতে, তখন এখানকার নির্ঝঞ্ঝাট নিস্পৃহ বাসিন্দারা এই দোতলা রুটব্রিজ পুড়িয়ে ফেলাই মনস্থ করেছিল। বেকার ভিড় ভাট্টা পছন্দ করে না এরা। কিন্তু এখানকার বনদপ্তরের লোকেরা সেকথা জানতে পেরে এদের নিরস্ত করেন। এখন অবশ্য এই ডাবল ডেকারকে আরো আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য একে তিনতলা করার পরিকল্পনা চলছে নাকি। অল্প হলেও কমার্শিয়ালাইজড্ হয়েছে এই নোংরিয়াট গ্রাম।

আমি আর ভাই ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম এই ভোরবেলায় পাহাড়ে ঘেরা আধো আঁধারে এই ব্রিজকে। এখানে কিছু সিঁড়ি ভেঙে জলের কাছে যাই, ওখানে কিছু সিঁড়ি ভেঙে ঝর্ণার পাশের পাথরে গিয়ে বসে থাকি। উপরের ব্রিজে উঠি, নিচের ব্রিজে নামি। তখনও সূর্য ওঠেনি এখানে।

খানিকক্ষণ বাদে বাবা আর কাকাও দেখলাম ব্রিজের কাছে চলে এল। না। চা পায়নি বেচারারা। গ্রাম এখনও গভীর ঘুমে।

চারজনে ব্রিজের উপরে নিচে ঘোরাঘুরি করে একটু ফোটোসেশন করা হল। জলে হাত ডুবিয়ে দেখলাম কতটা ঠান্ডা জল, স্নান করা যাবে কিনা। না। একেই মোটামুটি ঠান্ডা জায়গা, তার উপরে এই ভোরবেলা, স্নান করা উচিত হবে না। ট্যুরের একদম প্রথমদিক। ঠান্ডা লাগলে বিপদে পড়ব।

কাকা জলে নামল একটু, মাছেদের কাছ থেকে পেডিকিওর নেওয়ার ইচ্ছায়।

তারপর ঠিক হল, ব্রিজের যেদিকের সিঁড়ি দিয়ে নেমেছি আমরা, তার উল্টোদিকের সিঁড়ি দিয়ে উঠে গিয়ে দেখা যাক কী কী আছে গ্রামে। গ্রামটা একটু ঘুরে নেওয়াও যাবে, আর আশেপাশের মধ্যেই কিছু ন্যাচরাল সুইমিং পুল আছে শুনেছি সেগুলোরও দেখা পাওয়া যাবে হয়তো।

যেমন ভাবনা তেমন কাজ। চললাম চারজনে ব্রিজ পেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে গ্রামের অন্যদিকে।

গ্রামের এইদিকের রাস্তাতে সিঁড়ি তুলনামূলকভাবে কম। তবে আছে। রাস্তা সটান সমতল নয় এখানে কোথাওই।

গ্রামের ভিতরে ঝিঁঝিঁর একটানা কানফাটা আওয়াজ, আর পাখপাখালির বিক্ষিপ্ত ডাকের মধ্য দিয়ে কিছুটা হেঁটে গিয়ে দেখলাম চ্যালি হোমস্টে। ইন্টারনেটে ছবি দেখেছি, তাই একবারেই চিনতে পারলাম। বাইরে তাঁবু পাতা রয়েছে বেশ কিছু। কয়েকজন অল্পবয়সী ছেলেমেয়ে হোমস্টের বারান্দায় দাঁড়িয়ে রয়েছে।

আমরা এগিয়ে গেলাম আরো। কিছুটা এগিয়ে দেখলাম ছোট্ট নালা মত পাহাড়ী নদীর উপর মানুষের তৈরী সিমেন্টের ব্রিজ একটা। রুট ব্রিজ নয় এটা। নদীতে জল নেই, একদম শুকনো খটখটে। জঙ্গলের রূপ কিন্তু দারুণ সুন্দর এখানে।

আসলে, এই কথাটা বুঝেছি, কোনও জায়গার রূপ অনেকটাই নির্ভর করে কোন সময়ে তুমি সেখানে আছো তার উপরে, ঝর্ণার জন্য যেমন বর্ষাকাল, আর বরফের জন্য শীতকাল, তেমনই পাহাড়িয়া নদীর টলটলে স্বচ্ছ নীলজল দেখতে হলে ঠিক দুক্কুরবেলা আর জঙ্গলের মধুর রহস্যময় অথচ উজ্জ্বল রূপ অনুভব করতে হলে একদম ভোরবেলায়।

নোংরিয়াটের ভোর সত্যিই অপূর্ব সুন্দর।

জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে রাস্তায় চলতে চলতে হঠাৎ দেখা মিলল একটা মাঠের। খেলার মাঠ, মাঠের দুপ্রান্তে বাঁশ পুতে গোল পোস্টও বানানো হয়েছে। মাঠ জিনিসটা এখানে দুষ্প্রাপ্য। বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে সমতল স্থান এই ঢালু পাহাড়ের বুকে— চোখে অদ্ভুত জিনিস বলেই প্রতিভাত হয়, সত্যি!

নইলে এই মাঠ ঘাটের দেশের লোক যে আমরা, তারাও হঠাৎ পাহাড়ের বুকে জঙ্গলের মধ্যে মাঠ দেখে বিলকুল খুশি হয়ে উঠেছিলাম সবাই। যেন, কী আজিব একটা জিনিস দেখে ফেলেছি!

মাঠ দেখে ভারি উৎফুল্ল হয়ে উঠে বাবা আর কাকা তো দৌড়াদৌড়িও করে নিল খানিকটা। যদিও বাড়িতে থাকার সময় দু’পা পেরোলেই যে মাঠ পড়ে চোখে তাতে ব্যাটারা কতবছর যে নামেনি কে জানে? আমিও তথৈবচ।

যাই হোক, মাঠের পাশ দিয়ে রাস্তা চলে গিয়েছে আরো জঙ্গলের মধ্যে। আর, মাঠটুকুর অপর প্রান্ত গাছপালায় ঢাকা। সেই গাছপালার মধ্যে একটুখানি জায়গা ফাঁক হয়ে যেন ‘গেট’ মত হয়ে আছে একটা। সবাই রাস্তা বাদ দিয়ে মাঠেই নেমে পড়লাম। তারপর, মাঠ পেরিয়ে সেই ‘গেট’ দিয়ে উঁকি মেরে দেখি, আরে! এ যে একটা গ্রেভইয়ার্ড!

যখন ধরমশালায় বেড়াতে গিয়েছিলাম, সেখানে সেন্ট জন্স চার্চ ইন দ্য ওয়াইল্ডারনেসের সঙ্গে সংলগ্ন অদ্ভুত সুন্দর শান্ত বিউরিয়াল গ্রাউন্ডটা দেখে অদ্ভুত আধচেনা নস্টালজিয়ার একটা অনুভূতি হয়েছিল। আন্দামানে, বারাতাং আইল্যান্ড যাওয়ার পথে একটা নিঃসঙ্গ বিউরিয়াল গ্রাউন্ড দেখেছিলাম, সেখানে কবর ছিল মাত্র তিনটে, তিনজনই একই পরিবারের, কী একটা একাকিত্বের নির্জনতার কারুণ্য মনকে ছুঁয়ে গিয়েছিল…আর এই নোংরিয়াটের বিউরিয়াল গ্রাউন্ড দেখলাম, দূরে যেদিকে তাকাও পাহাড় শুধু, তার মধ্যে চারিদিকে ঘন সবুজে ঘেরা কবরস্থান। সবুজ ঘাসের উপর সাদা কবরগুলো মনকে আনমনা করে দেয়।

এর সৌন্দর্যও। এর শান্তিও। এর নির্বেদও।

কবরস্থান দেখে আবার রাস্তা ধরলাম। আরো এগোলাম খানিকটা, যদি ন্যাচারাল সুইমিং পুলের দেখা পাওয়া যায়। কিন্তু, না, রাস্তা চলেছে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে। সুইমিং পুলের দেখা নেই। লোকজনও নেই কেউ যে জিজ্ঞাসা করব। জিজ্ঞাসা করলেও এরা ভাষা বুঝবে না। সুইমিং পুলের দিকেরই রাস্তায় চলেছি কিনা তাও জানি না।

কাজেই, আর বেশি না এগিয়ে আবার ডাবল ডেকারের দিকে ফিরে চলাই ঠিক হল। ওয়েল, ফিরে এসে ইন্টারনেট ঘাঁটতে ঘাঁটতে জানতে পেরেছি, ঠিক রাস্তাতেই চলেছিলাম, যতটা এগিয়েছিলাম, ওই রাস্তা ধরেই আরো ততটা গেলে ন্যাচারাল সুইমিং পুলের দেখা পেতাম আমরা। যাকগে, যা হয়নি তা হয়নি। কী আর করা যাবে?

ফেরার সময়, আবার দেখা হয়ে গেল আমাদের বিদেশী বন্ধুটির সঙ্গে। তখনই তার সঙ্গে তার আর আমার ভাইয়ের ক্যামেরার তুলনামূলক বিচার করে আলোচনা চলার মধ্যেই আমরা জেনে নিয়েছিলাম যে সে নিউজিল্যান্ডেরই অধিবাসী। একা বাইকে করে ভারত ঘুরছে। এখানে রয়েছে চ্যালি গেস্ট হাউসে।

যাই হোক, সিরিনে পৌঁছে মা আর কাকিমার কাছে আমাদের গ্রাম ঘোরার বর্ণনা করলাম। আমি বললাম, ‘চলো, তোমাদের দুজনকেও ঘুরিয়ে নিয়ে আসি, যাবে?’

বাবা আর কাকা আপত্তি জানালো, ‘না না। আর সিঁড়ি ভেঙে কাজ নেই। এখনই বেরিয়েও পড়তে হবে। এতটা রাস্তা সিঁড়ি…’ ইত্যাদি ইত্যাদি।

কাকিমাও একটু ইতস্তত করছিল। আমি আর মা আবার বেরিয়ে পড়লাম ওইসব আপত্তি টাপত্তি গ্রাহ্য না করে। এখানে বেড়াতে এসে যদি ডাবল ডেকারের ভোরবেলাকার রূপই না দেখল, তবে আর কী দেখল?

সিরিনের দোতলা থেকে নিচে নামতেই কিন্তু কাকিমা হাঁক দিল, যাবে আমাদের সঙ্গে।

যাই হোক, ওদের দুজনকে নিয়ে গেলাম ওই রাস্তায়ই আবার। সেই ডাবল ডেকার, সেই জঙ্গুলে রাস্তা, সেই মাঠ, সেই বিউরিয়াল গ্রাউন্ড।

অবশেষে সাড়ে সাতটার সময় বাবাদের বহু আকাঙ্খিত চা মিলল।

সবাই রেডি হয়ে সিরিন থেকে বেরোতে বেরোতে বেজে গেল সাড়ে আটটা।

সিরিনে বিল পেমেন্ট মিটিয়ে দিলাম। বেরোনোর সময় বাবা আরেক কাপ চা নিয়েছিল, যেটার দাম দিতে গেলে মিস্টার বায়রন বললেন, ‘অন দ্য হাউজ’। এমন কিছু ব্যাপার নয় এই এককাপ চায়ের দাম। কিন্তু এই টুকরো সৌজন্যগুলো মনকে ভাল করে দেয়।

এবার, আবার সিঁড়ির সঙ্গে লড়াই শুরু। যে পথে এসেছি সে পথেই ফিরতে হবে।

প্রথমে নোংরিয়াট থেকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে সেই ছোট্ট রুট ব্রিজ পেরোলাম আবার। তারপর, কিছু সিঁড়ি পেরোনোর পর সেই লম্বা সাসপেন্সন ব্রিজ এল। তারপর এল সেই বিপজ্জনক দ্বিতীয় ব্রিজটা।

আমি আর ভাই, মা আর কাকিমার সঙ্গে একটু পিছিয়ে ছিলাম। বাবা আর কাকা এগিয়ে গিয়েছিল। এখন এই ব্রিজে উঠে দেখি, বাবা নিচে নদীর চরায় পাথরের উপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছে। তারপর দেখি কাকাও রয়েছে পাশে।

ভাইও নেমে গেল হুড়হুড় করে ওদের দেখাদেখি।

আমার মা ছিল আমার পাশেই, বলে, ‘আমিও নামব।’

সবাই বাধা দেওয়া সত্বেও (রাস্তা তো সবে শুরু, সাড়ে তিনহাজার খাড়াই সিঁড়ি এই ব্রিজ পেরোনোর ঠিক পরেই আসবে, কাজেই—) ঠিকই নেমে গেল নদীর পাশের পাথরে পা রেখে রেখে। তখন, কাকিমাই বা কেন পিছিয়ে থাকে? সেও নামল।

কী আর করি। আমিও নামলাম শেষে। সবাইই যখন নামবেই—

আমাদের গাইড বাহব আর আমার ভাই ব্রিজের নিচে নদীচরে

এখানে, চারিদিকে পাথুরে জায়গার উপর উপরে ঝুলন্ত ব্রিজ। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে প্রায় শুকিয়ে আসা স্বচ্ছ পাহাড়ী নদী। সবচেয়ে বড় কথা, বড় বড় পাথরের ফাঁকে স্বচ্ছ সবুজ নীল জল আটকে রয়েছে। ন্যাচারাল সুইমিং পুল না দেখতে পাওয়ার আফশোষটা গেল কিছুটা হলেও।

বেশ খানিকটা সময় আমরা কাটালাম ওখানেই। মনে হচ্ছিল আরও খানিকক্ষণ থাকি। কিন্তু, কিছু করার নেই। চলতেই হবে আমাদের। থামার ফুরসত নেই। চরৈবেতি, চরৈবতি।

নদীচর থেকে উঠে এসে আবার চলা শুরু করলাম।

আমাদের গাইডের নাম বাহব। একটু এগোনোর পর সে বলল, আশেপাশের মধ্যে ন্যাচারাল সুইমিং পুল আছে দুয়েকটা, নিয়ে যাবে আমাদের। রাস্তা ভাল না। ব্যাগপত্তর সব গ্রামের মধ্যে রাস্তার ধারেই রেখে যেতে হবে। তা, আমরা সবাই ব্যাগ ট্যাগ সব রাস্তার ধারের একটা বেঞ্চিতে ভগবানের নামে গচ্ছিত রেখেই তার পিছু পিছু যাওয়ার জন্য রেডি হয়েছিলাম, কিন্তু বিধি বাম। সেই ‘ভাল না’ রাস্তাকে ‘ভাল’ করার কাজ চলছে এখন। বন্ধ রাস্তা।

আবার ন্যাচারাল সুইমিং পুল দেখা স্থগিত রইল। আবার এগোলাম আমরা।

একটু এগোনোর পরে সেই গ্রামে পৌঁছলাম যেখানে সিঙ্গেল রুট ব্রিজ আছে। মনে আছে যাওয়ার সময় যাইনি পৃথিবীর সবচেয়ে লম্বা সিঙ্গেল রুট ব্রিজে? এবারে যাব।

সিঙ্গেল রুট ব্রিজে যাওয়ারও টিকিট লাগে। কুড়ি টাকা করেই সম্ভবত। গ্রামের মধ্যে একজায়গায় একটা টেবিল পেতে টিকিট বিক্রী হচ্ছে। গ্রামটা অপরূপ সুন্দর। এই গ্রামের নাম জানতে পারিনি, সে দুঃখ রয়ে গেছে আমার।

যাই হোক, ওঠার রাস্তা থেকে ডিট্যুর নিয়ে সিঙ্গেল ব্রিজের দিকে চলা শুরু করলাম। এই সিঙ্গেল রুট ব্রিজে যাওয়ার পথটুকু মনে হয় নোংরিয়াটে যাওয়ার এই এত সুন্দর সাড়ে তিন কিলোমিটারের পাহাড়ী জঙ্গুলে রাস্তার মধ্যেও সবচেয়ে মনোহর।

নিজে অনুভব করতে হয় জঙ্গলের সেই দারুণ সৌন্দর্য। বুঝিয়ে বলা মুশকিল।

সেই সুন্দর পাথুরে জঙ্গুলে রাস্তায় সিঁড়ি ভেঙে কিছুদূর গিয়ে সিঙ্গেল রুট ব্রিজে পৌঁছলাম।

রুট ব্রিজই। কিন্তু ডাবল ডেকারের সঙ্গে যেন কোনও মিলই নেই এই ব্রিজটার। প্রথমত তো এর নিচে নদীখাত অনেকটাই বেশি গভীর।

দ্বিতীয়ত, এই ব্রিজের আশেপাশে কোনও গ্রাম বা বসতি চোখে পড়ল না। জায়গাটা বেশি বুনো। আমাদের গাইড বললও, এখানে শিয়াল আর ভাল্লুক আসে মাঝে মধ্যে।

এই রুট ব্রিজ অনেকটাই বেশি লম্বা ডাবল ডেকারের চেয়ে। কিন্তু হয়তো সেই কারণেই, ততটা শক্তপোক্ত নয়। একবারে দুজনের বেশি লোকের ওঠা মানা এই ব্রিজে। ব্রিজে ওঠা নামা করার জন্য বাঁশের একটা করে পথ মত করা আছে। সেগুলোও বেশ বিপজ্জনক। আমার ভাইয়ের প্যান্টের পকেটে ছিল একটা ছোট জলের বোতল। এই ব্রিজ থেকে নামার সময় সেটা নিচে পড়ে গেল। আর তোলা যায়নি।

ব্রিজ পেরিয়ে ওপারে গিয়ে কয়েক পা এগোলেই ফাঁকা টুকরোমত একফালি জমির সামনে একটা ছোট্ট গুহার দেখা মেলে।

এই গুহাটা ঠিক ছোটবেলায় কার্টুনে দেখা গুহার মত। লাইমস্টোনের কেভ নয়। পাহাড়ের পাথরে পাথরে পরস্পরের গায়ে হেলান দিয়ে গুহা তৈরী হয়েছে। সামনে শুয়ে রয়েছে মৃত গাছের গুঁড়ি। ঠিক যেন মোগলি বা সিম্বার রাত কাটানোর জায়গা।

পাশে আর একটা গুহা। সেটা ‘ব্যাটকেভ’। পরপর দুটো ইয়াআ বিশাল লম্বা ভারি পাথরের চাঁই দাঁড়িয়ে আছে। মধ্যিখানে কোনমতে একটা মানুষ গলার মত সরু পথ। সেই অন্ধকার পথ দিয়ে একটু এগিয়ে গিয়ে উপরে তাকালে দেখা যায় অসংখ্য বাদুড় ঝুলে আছে সেখানে। হাতে তালি দিলে ওই বাদুড়েরা পটপট শব্দ করে ডানা ঝাপটে উড়ে যায়। অদ্ভুত লাগে দেখতে।

ব্যাট কেভের সামনে খানিকক্ষণ বসলাম আমরা। তারপর আবার ফিরে চললাম সিঙ্গেল রুট ব্রিজ পেরিয়ে।

সিঙ্গেল রুট ব্রিজের রাস্তা যেখানে ডাবল ডেকারে যাওয়ার রাস্তায় মিলেছে, সেইখান থেকেই শুরু হচ্ছে সেই ভয়ংকর অশেষ খাড়াই সিঁড়ির সারি।

এখানে পাশে শান্তশিষ্ট নির্জন গ্রাম। সামনে সিঁড়ির নিচে বসে খাওয়া দাওয়া করলাম আমরা। যে খাবারদাবার ছিল সঙ্গে—মুড়ি, চানাচুর, ঝুরিভাজা, মিষ্টি, সেসবই খেয়ে নিলাম যতটা সম্ভব।

তারপর, ওঠা শুরু করলাম।

ইন্টারনেট ঘাঁটার সময় অনেককেই বলতে শুনেছিলাম, এবং কখনোই সে কথায় আগে বিশ্বাস করি নি, যে, এই সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় নামার সময়ের চেয়ে কম কষ্ট হয়।

কার্যক্ষেত্রে আমার নিজের অভিজ্ঞতাও কিন্তু সেরকমই হয়েছে। ওঠার সময়ের চেয়ে আগের দিন নামার সময় কষ্ট বেশি হয়েছিল আমার।

আমাদের দলের অন্যদের অভিজ্ঞতা যদিও তা নয়। বাকিদের ওঠার সময়ই বেশি কষ্ট হয়েছে।

যাই হোক, সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় একটা জিনিস লক্ষ করিনি আমরা। এখন ওঠার সময় দেখলাম, যে রাস্তা দিয়ে চলেছি, তার উপরে পড়ে থাকা পাতাগুলো সব তেজপাতা।

অন্যান্য পাতাও হয়তো মিশে আছে একটা দুটো, কিন্তু খুবই কম সংখ্যায় তারা। যে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলেছি, তার পুরোটাই প্রায় তেজপাতার গাছের জঙ্গল। বাবা একটা তেজপাতা কুড়িয়ে নিয়ে একটু শুঁকে টুঁকে নিয়ে বলল, তেজপাতা শুঁকতে শুঁকতে সিঁড়ি ভাঙলে নাকি সিঁড়ি ভাঙার কষ্ট কম হবে। সবাই তাই করতে শুরু করলাম। একটা করে শুকনো তেজপাতা নিয়ে শুঁকতে শুঁকতে চললাম।

রাস্তায় দেখা হল অনেক ট্যুরিস্টদের সঙ্গে। সব ডাবল ডেকারের দিকে চলেছেন। সবাই ক্লান্তির বিভিন্নরকম পর্যায়ে।

একদম উপরের দিকে এসে, তখন আর মিনিট দশেক মত সিঁড়িভাঙা বাকি আছে হয়তো, এমন জায়গায় এসে দেখা হল এক বাঙালী পরিবারের সঙ্গে। স্বামী স্ত্রী আর বছর এগারো বারোর বাচ্চা ছেলে একটা। তাঁদের ড্রাইভার নাকি তাঁদের তিরনায় নামিয়ে দিয়ে ডাবল ডেকার ব্রিজটা ঘুরে আসতে বলেছেন। এদিকে এঁরা বেচারারা প্রায় মিনিট দশেক সিঁড়ি ভেঙেও ডাবল ডেকারের কোনও চিহ্ন না খুঁজে পেয়ে চিন্তিত। এই রাস্তার ট্রেকিং সম্পর্কে কোনও আইডিয়াই নেই এঁদের। নেই মানসিকভাবে কোনরকম পূর্বপ্রস্তুতিও। অদ্ভুত ড্রাইভার! বললাম আমরা। তাঁদের বুঝিয়ে বললাম রাস্তাটার সম্পর্কে। না বুঝে এই সিঁড়ি ভাঙতে শুরু করলে মুশকিল। দারুণ সুন্দর জায়গা সামনে। কিন্তু ভেবে দেখুন পারবেন কিনা। ভদ্রলোকের হয়তো একটু ইচ্ছা ছিল, কিন্তু ভদ্রমহিলা এবং বাচ্চাটি অনিচ্ছুক বোঝা গেল। আমরা তাঁদের ফেলে এগিয়ে গেলাম।

মিনিট পাঁচেক আরো ওঠার পর রাস্তার ধারে একটা দোকান দেখে বাবারা খুব খুশি হয়ে উঠল। সেই বেরোনোর আগে সকালবেলায় চা খেয়েছে। কিন্তু না, এটা চায়ের দোকান নয়। দোকানদার ভদ্রলোক স্থানীয় খাসিয়া জনগোষ্ঠীরই, কিন্তু তিনি অসমিয়া আর হিন্দী জানেন। এখানে এটা খুব কমই দেখা যায়। কমিউনিকেশন বড় সমস্যা এখানে। যাই হোক, আমাদের ক্লান্ত বিধ্বস্ত চেহারা দেখেই হোক বা বাবাদের চা না খুঁজে পেয়ে মুষরে পড়া দেখেই হোক, তাঁর মনে দয়া জন্মাল মনে হয় একটু। আমাদের জন্য বাড়ি থেকে চা বানিয়ে আনানোর প্রস্তাব দিলেন। বাবারা তো নগদ খুশি!

সিঁড়ির ধারে পাথরে, কাটা গাছের গুঁড়িতে বসে পড়লাম সবাই।

আমার কাকিমা খুব মিশুকে মানুষ। এটা ওটা গল্প জুড়ল দোকানদারের সঙ্গে। দোকানে বিক্রী হচ্ছিল লোকাল একধরণের ফল। টক টক। খেলে নাকি ক্লান্তি দূর হয়। সেই ফল কিনে নিল এক প্যাকেট।

তারপর চা এসে গেল। গৃহস্থ বাড়িতে তৈরী চা বোঝাই যায়। যদিও চেরাপুঞ্জি শিলং এলাকায় সব জায়গায়ই চায়ের কোয়ালিটি বেশ ভালই পেয়েছি আমরা। তবু, তার মধ্যেও এই ‘চায়ের দোকান নয়’এই সবচেয়ে ভাল চা পেয়েছি।

সেই যে পরিবারটির সঙ্গে দেখা হয়েছিল পথে, তাঁরা দেখলাম ফিরেই আসছেন। ঠিকই করেছেন, বললাম আমরা, হুট্ করে এই রিস্ক নেওয়া উচিত নয়।

তারপর? আর কি? এবারে একদম মূল তিরনা গ্রামে প্রবেশ করলাম আবার। আবার চওড়া সিঁড়ির দুপাশে গ্রামের বাড়িঘর বাগান দেখা দিল।

রাস্তার শেষপ্রান্তে এসে সবসময়ই ক্লান্তি সবচেয়ে নিবিড় হয়। বারোটা বেজে গেছে, সাড়ে বারোটা বাজে প্রায়। ক্লান্ত বিধ্বস্ত শরীরে আমরা উঠে এলাম সিঁড়ি পেরিয়ে।

এখানে, এই উপরে ছায়া নেই কোনও। চারিদিকে যতদূর চোখ যায় দেখতে পাচ্ছি আকাশ। লোকজন ভর্তি চারিদিকে। ঝিঁঝিঁর ডাকের বদলে মানুষের গলার গুঞ্জণ, গাড়িঘোড়ার শব্দ। রূপকথা থেকে বাস্তবে ফিরে এলাম এক লহমায়।

তারপর, নোংরিয়াটকে বিদায় জানালাম। তিরনাকে বিদায় জানালাম। গাড়িতে চড়ে বসলাম আমরা।

31 comments

  1. [url=https://cialisq.com/]cialis[/url] [url=https://ventolin90.com/]ventolin medication[/url] [url=https://prednisone20.com/]prednisone[/url] [url=https://albuterolhf.com/]albuterol[/url] [url=https://lasix40.com/]lasix[/url]

  2. [url=https://prednisone20.com/]prednisone[/url] [url=https://albuterolhf.com/]albuterol inhaler[/url] [url=https://ventolin90.com/]ventolin[/url] [url=https://cialisq.com/]40mg cialis[/url] [url=https://lasix40.com/]lasix[/url]

  3. [url=https://ventolin90.com/]buy ventolin[/url] [url=https://lasix40.com/]lasix[/url] [url=https://albuterolhf.com/]albuterol mdi[/url] [url=https://cialisq.com/]where to buy cialis[/url] [url=https://prednisone20.com/]prednisone[/url]

  4. [url=https://lasix40.com/]lasix 100mg[/url] [url=https://prednisone20.com/]buy prednisone[/url] [url=https://ventolin90.com/]ventolin[/url] [url=https://cialisq.com/]cialis[/url] [url=https://albuterolhf.com/]albuterol inhaler no prescription[/url]

  5. [url=https://prednisone20.com/]buying prednisone on line[/url] [url=https://ventolin90.com/]ventolin[/url] [url=https://lasix40.com/]lasix water pills[/url] [url=https://albuterolhf.com/]buy albuterol[/url] [url=https://cialisq.com/]cialias[/url]

  6. [url=https://lasix40.com/]lasix without prescription[/url] [url=https://cialisq.com/]buy online cialis[/url] [url=https://ventolin90.com/]ventolin inhaler[/url] [url=https://albuterolhf.com/]albuterol[/url] [url=https://prednisone20.com/]prednisone 10 mg[/url]

  7. [url=https://lasix40.com/]lasix[/url] [url=https://albuterolhf.com/]buy albuterol online[/url] [url=https://cialisq.com/]cilias[/url] [url=https://ventolin90.com/]ventolin hfa[/url] [url=https://prednisone20.com/]prednisone[/url]

  8. [url=https://cialisq.com/]where to buy cialis[/url] [url=https://ventolin90.com/]ventolin[/url] [url=https://lasix40.com/]lasix to buy[/url] [url=https://albuterolhf.com/]albuterol inhaler[/url] [url=https://prednisone20.com/]prednisone[/url]

Leave a Reply