সবুজ নীলের দেশে, সাদা কালোর দেশে

পিউ দাশ

 

বেড়াতে যেতে চান অথচ অনেকদিন ঘোরা হয়নি?  পিউ দাশের ট্রাভেলগ সবুজ নীলের দেশে, সাদা কালোর দেশে । প্রতি রবিবার ও বুধবার পড়ুন পিউর ভ্রমনকাহিনী।আজ পঞ্চম পর্ব।

 

 

বেড়াতে যাওয়ার সময় সবসময়ই দুটো জিনিস নিয়ে আমি খুব চিন্তিত থাকি, এক, সঙ্গী সাথিরা যেন সমমনস্ক হয়, দুই, ড্রাইভার যেন ভাল হয়।

সঙ্গী সাথী মনের মত হওয়া সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। নইলে পুরো বেড়ানো একদম কেঁচিয়ে যেতে পারে। মানে, কোনারকের মন্দির দেখে হাই তোলে এমন মানুষের সঙ্গে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা আছে আমার, বিষ্ণুপুরে বেড়াতে গিয়ে রাসমন্দিরের থেকে তার পাশের নতুন চুণকাম করা ‘মায়ের মন্দিরে’র দিকে টান বেশি এমন লোক আমি দেখেছি। আন্দামানের হ্যাভেলকের রাধানগর বিচ, নীল আইল্যান্ডের ভরতপুর বিচ আর সেই বিচের সাদা বালি আর ঘন নীল স্বচ্ছ জলে রঙিন প্রবালের মধ্যে রঙবেরঙের মাছের খেলা দেখার পরে, ‘যাই বলো, দীঘাই আমার বেশি ভাল লাগে’ এরকম রিডিক্যুলাস কথা বলে এমন ব্যক্তির সঙ্গে ঘোরার অভিজ্ঞতাও আমার আছে।

এইরকম লোকেরাই যদি তোমার ট্রাভেল কমপ্যানিয়ন হয় তবে ঘোরা মাথায় ওঠে। একদম বারোটা!

শরীর অসুস্থ হতেই পারে, কার কখন হয় বলা যায় না। কিন্তু যাদের মানসিক গঠনই এরকম যে তারা প্রকৃতিকে বা শিল্পকে অ্যাপ্রিসিয়েট করতে পারে না, এমন লোকেদের সঙ্গে ঘোরা একধরণের শাস্তি। তার থেকে ঘরে বসে থাকা আমি ঢের বেশি প্রেফার করি।

এবারে, যদিও, সঙ্গীদের ব্যাপারে আমাদের কোনও প্রবলেম ছিল না।

কিন্তু প্রবলেম হয়েছিল ড্রাইভারকে নিয়ে। আমি একটু অফ রুটের প্ল্যানই করেছিলাম, বেশি নয়, অল্পই। দু’একটা জায়গা যেখানে খুব বেশি ট্যুরিস্ট যায় না, ছিল আমার ইটিনেরারিতে। তাতেই আমাদের ড্রাইভার প্রচন্ড অফেন্ডেড। এই তিরনাতেও আমাদের নিয়ে আসার ইচ্ছা তাঁর ছিল না। বহু জোরাজুরি করে, অশান্তি করেই আসতে হয়েছে।

এখন, নোংরিয়াট থেকে উপরে উঠে, আমার প্ল্যানে ছিল এশিয়ার পরিচ্ছন্নতম গ্রাম ‘মওলিনং’ ঘুরে ডাউকি হয়ে স্নপডেং যাব। স্নপডেং একটু অপরিচিত নাম, ডাউকির কাছেই অবস্থিত। এখানেই রাত্রিবাসের প্ল্যানিং ছিল।

ড্রাইভার বলে বসলেন ডাউকি ঘুরে মওলিনঙে রাত্রি কাটাতে হয়, মওলিনং ঘুরে ডাউকিতে রাত্রি কাটানো যায় না।

যে দাবির কোনও অর্থই হয়না, ফালতু কথাবার্তা। ম্যাপ দেখলেই বোঝা যাবে তা। চেরাপুঞ্জি থেকে খানিক দূরে গিয়ে রাস্তা দুভাগে ভাগ হয়ে গেছে, একটা রাস্তা মওলিনঙের দিকে, অন্যটা ডাউকির দিকে। দুটোই সমান দূরত্বের প্রায়। একটা দেখে অন্যটায় যাওয়া গেলে, কেন উল্টোটা করা যাবে না তার কোনও যুক্তিসম্মত কারণ নেই।

ট্যুরিস্টেরা যাঁরা শিলং থেকে ডে ট্যুর করেন, তাঁরা সাধারণত ডাউকি দেখে তারপর মওলিনঙ যান কারণ ডাউকির উমংগট নদীর যে নীল স্বচ্ছ জল, তার সৌন্দর্য বুঝতে গেলে ঠিক মধ্যাহ্ণে ডাউকিতে থাকা প্রয়োজন।

কিন্তু আমাদের প্ল্যানিং তো অন্যরকম। আমরা চেরাপুঞ্জী হয়ে যাচ্ছি, অর্থাৎ উল্টো দিক থেকে। আর ডাউকির কাছে স্নপডেঙে যেহেতু আমাদের রাত্রিবাসের প্ল্যানিং, বুকিং টুকিং সব আগে থেকে কমপ্লিট, তাই ওখানে তো যেতেই হবে, কিন্তু রাত করে পৌঁছলেও ক্ষতি নেই। নদী তো কাল দেখব।

যাই হোক, নোংরিয়াট থেকে উঠে এসে তো গাড়িতে বসলাম। হয়তো জোর করে বলতেও পারতাম ড্রাইভারকে, আমার বলা পথ ফলো করেই চলতে। কিন্তু, ভেবে দেখলাম, সেক্ষেত্রে ড্রাইভারের সঙ্গে অশান্তি করতে হবে, এখনও অনেকটা ঘোরা বাকি আমাদের, এই ড্রাইভারেরই সঙ্গে ঘুরতে হবে সে পথ, আগে থেকে কনট্রাক্ট হয়ে আছে। জলে বাস করে কুমীরের সঙ্গে অশান্তি করা যায় না।

আর অন্যদিকে, এতটা রাস্তা সিঁড়ি ভেঙে উঠে ক্লান্তও সবাই আজ অল্পবিস্তর। এখন শিগগির হোম স্টেতে ঢুকতে পারলেই সবাই বাঁচি।

এবং, আরো আরো অন্যদিকে, ইন্টারনেট ঘেঁটে মওলিনং সম্পর্কে যে তথ্য পেয়েছিলাম, তা আহামরি কিছু ছিল না। মওলিনং সবচেয়ে পরিষ্কার গ্রামের শিরোপা পেয়েছে বটে, কিন্তু অনেকেই বলেছেন যে সেই কারণেই ওই গ্রামের স্বভাবসৌন্দর্য নষ্ট হয়ে গেছে অনেকটা। ওই গ্রামের থেকে দু’কিলোমিটার দূরে রুট ব্রিজও আছে একটা। যেটা সহজগম্য। ওই রুট ব্রিজ আর পরিচ্ছন্নতার সার্টিফিকেট নিয়ে মওলিনং এখন পপুলার ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন। সে গ্রামের গ্রাম্য সৌন্দর্য এখন আর সেভাবে বজায় নেই।

যদিও, নিজেরা যাইনি, কাজেই সত্যমিথ্যা বিচার করতে পারব না। তবে, সেইসব সাতপাঁচ ভেবেই আর সবার শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে মওলিনঙে যাওয়ার প্ল্যান ত্যাগই করলাম। চললাম সিধে ডাউকির দিকেই।

যাই হোক। তিরনাকে বিদায় জানাবার পর গাড়ি যখন চলতে শুরু করল তখন প্রায় বেলা একটা হবে। আস্তে আস্তে চেরাপুঞ্জি শহর চলে এল। আমরা পৌঁছে গেলাম সোহরা ভিউ লজে। এখান থেকে আমাদের লাগেজ উঠল গাড়িতে। দেখা গেল নতুন একদল ট্যুরিস্ট এসে উঠেছেন লজে। অল্পবয়সী ছেলেদের দল একটা। তাঁরা ক্যাম্প ফায়ারের ব্যবস্থা করছেন লজের বারান্দায়।

মা আর কাকিমা লজের কুকুরটাকে খুঁজতে গেল। কিন্তু সে ততক্ষণে নতুন গেস্টদের পেয়ে তাদের সঙ্গেই জমিয়ে নিয়েছে। মায়েদের নাকি চিনতেই পারল না।

বিদায় জানালাম সোহরা ভিউ লজকে। বিদায় জানালাম সামনের মকডক ভ্যালিকে। আবার শুরু হল পথ চলা।

গাড়িতে উঠে ভাইয়ের মোশন সিকনেস ফিরে এল আবার। এ জিনিসটা ওর সাধারণত বেড়ানোর প্রথমদিনেই হয়। তারপরে আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যায়। এটা তৃতীয় দিন আমাদের এবারের ট্যুরের। এখনও ঠিক হল না দেখে একটু চিন্তাতেই পড়ে গেলাম।

তবে এটাও ঠিক যে প্রচন্ড র্যাশ ড্রাইভিং করেছিলেন আমাদের ড্রাইভার এইদিনে। আমার সন্দেহ হয় যে, লোকটার মেল ইগোতে আঘাত লেগেছিল আমার কথা শুনে চলতে। মানে, আমি ছোটখাটো চেহারার একজন মেয়ে। বিয়ে হয়নি, সন্তানের জননী নই। যদিও বত্রিশ বছর বয়স আমার, তবু আমাদের সমাজের চোখে পুরোপুরি মানুষই এখনো হয়ে উঠিনি ঠিক।

কিংবা হয়তো সেটা আমার মনের ভুল। আমরা মেয়েরা একটু প্যারানয়েডই হয়ে গিয়েছি হয়তো এইসব বিষয়ে। খোদায় মালুম।

যাই হোক, আমার এক অনলাইনে পরিচিতা দিদি আমি শিলং বেড়াতে যাচ্ছি শুনে আমাকে এক ড্রাইভারের ফোন নং দিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে ঘুরতে পারিনি আমরা কারণ তাঁর ছিল ছোট গাড়ি। ফোরসিটার। যেখানে আমাদের চাই সিক্স সিটার। আফশোষ হচ্ছিল পরে সে কারণে। সত্যিই এই যাত্রায় ড্রাইভার খুব জ্বালিয়েছে আমাদের।

তবে এটাও ঠিক, আমরা ঠিক যে পথে ট্যুরিস্টরা ঘোরে তার থেকে একটু অন্য পথে ঘুরেছি, হয়তো ড্রাইভার পেতে বা এই রুটটুকু ড্রাইভারককে বোঝাতে অসুবিধা হতই আমাদের, যেভাবেই যা করি না কেন।

এখানে একটা কথা বলে রাখি, একান্তই আমার ব্যক্তিগত মত, আমার মনে হয়েছে শিলঙে বেড়াতে গেলে উপায় থাকলে অসমিয়া ড্রাইভারদের এড়িয়ে চলাই ভাল। খাসি ড্রাইভাররা একটু ওভারচার্জ করে, কিন্তু ভাল ঘোরায়। অসমিয়া ড্রাইভারেরা বেশিরভাগ সময়ই কয়েকটা ‘পয়েন্ট’ ঘুরিয়ে ছেড়ে দেওয়ার তালে থাকে।

ডাউকির রাস্তায় একটু এগিয়ে দেখা পেলাম ‘বাই দ্য ওয়ে’ হোটেলের। চেরাপুঞ্জিতে বাজেট হোটেল খুঁজতে গিয়ে বারবার দেখেছি এর নাম। যাঁরা ব্যাকপ্যাকার, বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে ট্যুর করবেন, এবং লাক্সারী চান না, বাজেটও টানটান, তাঁদের পক্ষে আদর্শ এই হোটেল। খুব কম পয়সায় এখানে লজিং। চেরাপুঞ্জির মত কস্টলি জায়গায় বাজেটের মধ্যে থাকতে গেলে সোলো ট্রাভেলারদের এটা একটা ভাল চয়েস হতে পারে। তবে, আগে থেকে বুকিং করা যায় না। এটা একান্তই বেড়াতে বেরিয়ে পথে হঠাৎ বিপদে পড়া পথিকদের জন্য। ইন্টারনেটে ‘বাই দ্য ওয়ে’র কথা শোনার পর থেকে, কেন জানি না হোটেলটা একবার দেখার খুব ইচ্ছা জেগেছিল আমার মনে। এখন সেই হোটেলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় উৎফুল্ল হয়ে মায়ের কাছে হোটেলটার পুঙ্খানুপুঙ্খ গল্প করতে লাগলাম।

আরো একটু চলার পর, যখন চেরাপুঞ্জির আওতা ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছি প্রায়, গাড়িতে চলতে চলতে একজায়গায় একটু দূর থেকে দেখি রাস্তার ধারে এক খোলা মাঠে বেশ ভিড়ভাট্টা জমে রয়েছে। মাঠটাকে ঘিরে রঙবেরঙের পতাকা টতাকা সাজানো। মাইকে মিষ্টি ধ্রিমিধ্রিমি বাজনা বাজছে একটা। মাঠের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বুঝলাম সাংস্কৃতিক কোনও অনুষ্ঠান চলছে সেখানে। কিউট ট্র্যাডিশনাল সাজে সেজে ছোট্ট ছোট্ট খাসি সুন্দরীরা বাজনার তালে তালে অদ্ভুতভাবে নেচে চলেছে ছোট ছোট পা ফেলে। ভারি মিষ্টি! গাড়ি থামিয়ে নেমে গিয়ে ছবিটবি তোলা হল।

ভাইয়ের শরীরটা খারাপ লাগছিল। তবু, ওই গিয়ে ছবি তুলল কিছু।

তারপর, আবার চলল গাড়ি।

ডাউকি হচ্ছে মেঘালয়ের পশ্চিম জয়ন্তিয়া জেলার এক শহর। এই শহর ভারত-বাংলাদেশের বর্ডারে অবস্থিত।

বাংলাদেশের বর্ডার ডাউকির একটা ট্যুরিস্ট আকর্ষণ। যদিও ডাউকি মূলতঃ বিখ্যাত হয়েছে আজকাল, উমংগট নদীর জন্য। এই নদীর জল অদ্ভুত স্বচ্ছ। জলের নিচে যতদূর পর্যন্ত সূর্যের আলো প্রবেশ করে ততদূর পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যায়। মাছ, নদীতলের পাথর। নীলচে সবুজ টলটলে জলের উপর বোটিং এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা।

স্নপডেং ডাউকি শহর থেকে মোটামুটি ছয় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এক গ্রাম। এই গ্রাম একদম উমংগট নদীর তীরে অবস্থিত। ট্যুরিস্ট ম্যাপে সবেই একটু একটু জায়গা করে নিয়েছে।

ওই গ্রামেই নদীর তীরে এক হোমস্টেতে রাত্রিবাসের কথা ছিল আমাদের। হালাটং হোমস্টে।

স্নপডেঙের সবচেয়ে বিখ্যাত হোমস্টে সাতস্ঙি হোমস্টে। তারপরই নাম ব্রাইট স্টার হোমস্টের। মার্চ মাসে বেড়াতে যাওয়ার জন্য জানুয়ারি মাসের শুরুর দিকে ঘর বুক করা শুরু করেছিলাম আমি। তাও ঘর পাইনি ওই দুটোতে।

এমনিতেও এই স্নপডেঙ ঠিক ফ্যামিলি নিয়ে যারা ট্যুর করে তাদের ইটিনেরারিতে কমই থাকে। এখানে অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমই চলে মূলত। থাকার জায়গা খুবই কম। হোম স্টে গুলোতে চার ছয়জনের বেশি থাকার ব্যবস্থা নেই। আর, নদীর ধারে টেন্ট নিয়ে থাকা যায়।

আমরা টেন্ট চাইছিলাম না, হোম স্টেই খুঁজছিলাম। শেষটায় তিন নম্বর হোমস্টে হালাটঙে ঘর বুক করতে হয়েছিল আমাদের।

হালাটঙের মালিকের নাম মানভা কঙবাম। অত্যন্ত ভদ্রলোক। কিন্তু ভাল ইংরাজী জানেন না। হিন্দী তো নয়ই। কমিউনিকেশন করা অত্যন্ত মুশকিলের।

যাই হোক, আমরা নোংরিয়াট থেকে উঠে আসার পর থেকেই তিনি বারবার ফোন করছিলেন, কখন আমরা ডাউকিতে পৌঁছব জানতে চেয়ে। এতই বেশিবার যে শেষপর্যন্ত বিরক্তিই আসছিল আমার। আরে বাবা, রাস্তায় আছি। পৌঁছে যাব সন্ধের মধ্যে বলছিই তো। এদিকে যেহেতু উনি ভাল ইংরাজী বোঝেন না, সেই ফ্রাস্ট্রেশনটুকুও ঠিকমত কনভে করতে পারছি না।

এদিকে আমাদের ড্রাইভার বারবার হোমস্টে থেকে আমায় ফোন করছে দেখে ইচ্ছাকৃত গাড়ি আরো স্লো করে দিয়েছে। মানে কী আর বলব! মারাত্মক বদ লোক!

সকালেই নোংরিয়াটে ছিলাম। সেখান থেকে উঠে এসে তো একেই মন খারাপ হয়ে গেছে একটু। অত সিঁড়ি ভাঙার ধকলে শরীরও ক্লান্ত। তার উপরে প্রতিমুহূর্তে ড্রাইভারের অসহ্য অসহযোগিতা।

আমার মেজাজ গরম হচ্ছে প্রতি মুহূর্তে।

তারপরেই শুরু হল, যাকে বলে পিঠভাঙা রাস্তা। কী যে খারাপ রাস্তা!

আমি ভেবে পেলাম না…মানে ডাউকি এখন যথেষ্ট পপুলার ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন, ওখানে যাওয়ার রাস্তার হাল এত খারাপ কেন? এত গাড়ি ঘোড়ার চলাচল যেখানে, সে রাস্তা সারানোর কোনও উদ্যোগ নেই কেন, সে তো আমার আদপেই বোধগম্য হল না। গাড়ির মধ্যে নাচতে নাচতে মাথা খারাপ হওয়ার খাপ।

যাই হোক, শেষপর্যন্ত বহুকষ্টে ডাউকিতে পৌঁছলাম। রাস্তার পাশে খাদের নিচে উমংগট নদী দেখা যাচ্ছে। যদিও আমরা যেসময় ওখানে পৌঁছেছিলাম তাতে নদীর রূপ সেভাবে বোঝা যাচ্ছিল না। সূর্য যখন থাকে মাথার উপরে তখনই ওই নদীর সৌন্দর্য সমহিমায় প্রকাশ পায়। তবু, পাহাড়ী নদী সবসময়ই সুন্দর।

রাস্তার পাশে সারে সারে গাড়ি দাঁড় করানো। গাড়ি থেকে নেমে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে হয় নদীর কাছে পৌঁছতে। কিন্তু আমাদের এখন যে অবস্থা শরীর মনের, সিঁড়ি দেখলেই গলা শুকিয়ে যাচ্ছে প্রায়।

বাংলাদেশের বর্ডার দেখা যাচ্ছে। কাছেই।

তখন বিকেলের কমলা ছটা চারিদিকে। প্রকৃতি অপরূপ মনোরম। কিন্তু ট্যুরিস্টদের ভিড়ে ডাউকির পরিবেশটা আদপেই সেরকম উপভোগ্য নেই। রাস্তা খারাপ, জ্যামে জ্যাম, ধোঁয়ায় ধোঁয়া। সোহরা ভিউ লজে রাত কাটানোর পরে, আর তার চেয়েও বড় কথা এই সবেমাত্র নোংরিয়াটের ওই অপার্থিব সৌন্দর্য, ওই প্রকৃতির কোলের থেকে ফিরে, ডাউকির ওই হইচই হট্টগোল আদপেই একটুও ভাল লাগছিল না আমাদের।

যাই হোক, ডাউকিতে তো পৌঁছনো গেল। এবারে স্নপডেঙে যেতে হবে। ওখানে হোম স্টে খুঁজে পেতে হবে।

এবার আমিই মিস্টার কঙবামকে ফোন করে জানালাম আমরা ডাউকিতে পৌঁছে গেছি। তখনই বুঝলাম যে তিনি বারবার কেন ফোন করছিলেন আমাদের। এবং খানিকটা খানিকটা আমাদের ড্রাইভারের এই ভীষণ অসহযোগিতার কারণও। এখানকার বেশিরভাগ ড্রাইভারই স্নপডেঙের পথ চেনেন না।

মিস্টার কঙবামের নির্দেশ অনুসারে ডাউকি ব্রিজ ক্রশ করে নদীর ওপারের পাহাড়ে গেলাম। তারপর একটু এগিয়ে মূল ডাউকি শহরের বাজার এলাকা। সেখানে এস বি আইয়ের এটিএম সেন্টারের পাশ দিয়ে এক রাস্তা ঢুকেছে। ওই রাস্তা দিয়েই এগোতে হবে নাকি। নদী হারিয়ে গেছে রাস্তার পাশ থেকে অনেকক্ষণই হল। এখন আমরা চলেছি সবুজে সবুজ পাহাড়ী রাস্তায়। দেখেশুনে মনে হচ্ছে নদীর কাছাকাছি যাওয়ার বদলে আমরা নদীর থেকে দূরেই চলেছি বরঞ্চ।

ব্যাস! আমাদের ড্রাইভারকে পায় কে! আমি যে ভুল করেছি, তাঁর পরামর্শ শুনে চললেই যে আমাদের ঘোরা একদম নির্ঝঞ্ঝাট শান্তিময় হত তা বোঝাতে তিনি উঠে পড়ে লাগলেন।

ওই সাড়ে তিনহাজার সিঁড়ি পেরিয়ে উপরে উঠেছি আজ দুপুরেই। তারপর এতক্ষণ গাড়িতে। রাস্তাও বেশ খানিকক্ষণ খুব খারাপ ছিল। ভাইয়ের শরীর খারাপ করছে আবার। মওলিনং যাওয়া হল না। মন মেজাজ এমনিতেই খুব খারাপ হয়েই উঠছিল আমার। তিনি তাতে ঘি প্রদান করেই চললেন।

এত সুন্দর যে স্নপডেঙে যাওয়ার রাস্তাটুকু, আদপেই সেটাকে উপভোগ করতে পারলাম না আমি।

তবে হ্যাঁ, তা সত্বেও এটুকু বুঝেছিলাম যে, ডাউকি থেকে স্নপডেঙে যাওয়ার রাস্তাটুকু অসম্ভব সুন্দর। যদি ড্রাইভার জ্বালাতন না করে, বা অন্যান্য কোনও ঝঞ্ঝাটের সম্মুখীন না হতে হয় আপনাকে, তবে প্রত্যেক প্রকৃতিপ্রেমীই এই ছয় কিলোমিটার পথটুকু চুটিয়ে উপভোগ করবেন। যে সময় আমরা ওই রাস্তায় চলেছিলাম সেই সময়টাও ওই রাস্তায় চলার পক্ষে একেবারে আদর্শ ছিল বলেই মনে হল আমার। শেষ বিকাল। বেলা পড়ে আসা কিন্তু জোরালো আলো।

স্নপডেঙে যাওয়ার রাস্তাটুকু সরু কিন্তু ভাল, কোনও ঝাঁকানি নেই। দুপাশ থেকে পাহাড় যেন সবুজে মুড়ে নেমে এসেছে একদম রাস্তার দুপাশে। ঘন সবুজ জঙ্গল, ঝোপঝাড়। স্নপডেঙের রাস্তার দুপাশের সবুজে এক অদ্ভুত সজীব প্রাণবন্ততা ছিল বলে মনে পড়ছে। হঠাৎ একপশলা বৃষ্টির পরে প্রকৃতিতে যে সজীবতা আসে সেরকম।

কিছুটা যাওয়ার পর রাস্তায় সাইনবোর্ড দেখলাম স্নপডেঙের।

আরও একটু এগোলাম ওই পাহাড়ী আঁকাবাঁকা সবুজ রাস্তা ধরে। রাস্তার দুপাশেই সবুজ। কোনও বাড়িঘর বসতি কিছুই চোখে পড়ে না। কোনও মানুষও না।

তারপর, উল্টোদিক থেকে আসা কয়েকটা গাড়ি চোখে পড়ল। আমরা প্রশ্ন করার আগেই তারা আমাদের জানিয়ে দিল স্নপডেং সামনেই আছে। বুঝলাম, একমাত্র স্নপডেঙের দিকে চলা ট্যুরিস্টেরাই আসেন এই রাস্তায়। এইরকম মজাদার ঘটনা তিরনাতে যাওয়ার সময়ও দেখেছি। চলতে চলতে কোনও মানুষ বা অন্য কোনও গাড়িকে দেখে গাড়ি একটু স্লো করে দিয়ে গলা বাইরে বাড়ালেই তাঁরা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ঠিক দিকের রাস্তা দেখিয়ে দেন। মুখ ফুটে কিছু জিজ্ঞাসাও করতে হয় না। এর থেকে বোঝা যায়, পথ বাতলে দিয়ে দিয়ে একদম অভ্যস্ত এসব জায়গার মানুষ। অনেক ড্রাইভারই পথ চেনেন না এসব জায়গার।

স্নপডেঙের কাছাকাছি এসে গেছি শুনে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

সত্যি এইদিনের গাড়ি জার্ণিটা খুব কষ্টকর হয়ে উঠেছিল শেষদিকে আমার পক্ষে।

তা, একটু এগিয়ে দেখি ছোট্ট মত একটা গাছের নিচে ছোট্ট একটা টেবিল পেতে দুজন বসে রয়েছেন। মানে, ওই রাস্তার পাশে টেবিল পেতে দুজন মানুষের বসে থাকাটা বেশ চোখে পড়ার মত।

আমরা সবাই চেয়ে চেয়ে দেখলাম। তারপর এগিয়ে গেলাম গাড়ি নিয়ে দিব্যি পাশ কাটিয়ে। ওমা! দেখি সেই দুজনের মধ্যে একজন আমাদের তাড়া করে আসছেন গাড়ির পিছু পিছু। যাব্বাবা! ব্যাপার কী? দেখেশুনে ড্রাইভার গাড়ি থামাল। তারপর বোঝা গেল, স্নপডেঙে ঢুকতে টিকিট লাগে।

বোঝো!

টিকিট কাটা হল। তারপর আবার এগোলো গাড়ি।

অন্ধকার নামার অনেক আগেই আমরা পৌঁছে গেলাম স্নপডেঙে। একদম উমংগট নদীর দুধারে ছড়িয়ে থাকা ছবির মত সুন্দর গ্রাম একটা।

হালাটং হোমস্টে দেখলাম। রাস্তার ধারেই সুন্দর কাঠের ঘর। একটা ফোর বেডেড রুম আমাদের চারজনের জন্য, একটা ডাবল রুম কাকিমাদের জন্য। পাশাপাশিই ঘরগুলো। দুটোর সঙ্গেই সংলগ্ন যে ব্যালকনিগুলো আছে, সেগুলো থেকে দূরে নদী দেখা যায়। যদিও, একদম নদীর তীরে ছিল না ঘরগুলো। ঘরের ব্যবস্থা, বন্দোবস্ত আমার নিজের খুব পছন্দ হয়েছিল। কাকিমারও। ভাই আর বাবা নির্লিপ্ত। মা কাঠের ঘর দেখে একটু চিন্তিত, এবং ততটা খুশি নয়, কাকা, একদম নদীর তীরে ঘর নয় বলে একটু দুঃখিত।

মিস্টার কংবাম বোধ হয় আমাদের নিজেদের আদানপ্রদান ও মুখভঙ্গি দেখে কিছু বুঝেছিলেন, আমাদের বললেন রাস্তার পাশেই সিঁড়ি দিয়ে নেমে নদী তীরের পাথরের উপর যে পাড়া আছে, সেখানে ঘরের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আমি, বাবা আর কাকা সেই কথা শুনে ওঁর পিছু পিছু আমাদের ঘরের পাশের সরু গলি দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলাম। উঃ! বাবা! এইখানে ওই কটা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই তখন যে প্রাণ যায় যায় ভাব হচ্ছিল আমাদের! দুইদিনে সাত হাজার সিঁড়ি ভাঙার ফলভোগ করতে শুরু করে দিয়েছি আমরা তখন।

যাই হোক, সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে যে গ্রাম্য পাড়ায় এলাম সেটা খুব খু-উ-ব সুন্দর। সেই একরকম রঙে রঙ করা বাড়ি। সেই সোজা সোজা বাঁধানো রাস্তা। সেই শিশুরা দৌড়োদৌড়ি করছে। এছাড়া এ গ্রামে মোরগ মুরগীও ঘুরে বেড়াচ্ছিল অনেক এদিক ওদিক। ছাগলও বাঁধা রয়েছে একটা দেখলাম। এখানে অনেক বাড়িতেই নানাধরণের পুষ্যি আছে।

মিঃ কংবাম আমাদের ঘর দেখালেন। উপরে যেমন আমাদের আর কাকিমাদের ঘর পাশাপাশি ছিল, এখানে তা নয়। হোম স্টে গুলো পরস্পরের থেকে দূরে দূরে। অ্যাটাচড্ বাথ নেই। একটা কমন বাথরুম আছে। ঘরগুলো নদীর একদম পাশেও নয়। দূর থেকে নদী দেখা যায় বটে, কিন্তু নদীর রূপ ঘরে বসেই উপভোগ করা যাবে এমন নয়।

দেখেশুনে আমরা আর এখানের রুমগুলো নিলাম না। উপরে থাকাই ঠিক হল।

আবার সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠা!

সত্যিই! এইদিন ওই কয়েকটা করে সিঁড়ি ভাঙতেই প্রচুর কষ্ট হয়েছিল আমাদের।

জিনিসপত্র লাগেজ সব গাড়ি থেকে নামিয়ে নিলাম। ঘরে গুছিয়ে বসা হল।

সেদিনটা ছিল রোববার। আগেই জানতাম আমি, এখন মিস্টার কংবামও বললেন, এখানে দোকানপাট সব বন্ধ আজকে। এই মেঘালয়ের গ্রামে, যেখানে  বেশিরভাগ মানুষই খ্রীষ্টান, রবিবার বন্ধ থাকে সব কিছু। রবিবার ওঁদের গীর্জায় যাওয়ার দিন। তাই দোকানপাট খোলা হয় খুবই কম। এমনকি গাড়ি ইত্যাদিও পাওয়া মুশকিল এখানে রবিবারে।

তো সেই কারণে খাবার দাবার পেতে অসুবিধা হবে। কংবাম বললেন, নদীর দিকে যেতে কাছেই যে দোকান আছে, সেখানেই খাবার দাবার, চা পাওয়া যায় এমনিতে। তবে, আজ পাওয়া যাবে না। রাত্রের ডিনার আর চায়ের ব্যবস্থা কংবাম করে দেবেন। কিন্তু সন্ধের টিফিন ইত্যাদি?

কী আর করা। আবার নিজেদের পুঁটুলি থেকেই মুড়ি চানাচুর বেরোলো। ঘরের বাইরে ব্যালকনিতে বসে সবাই মুড়ি চা খেলাম।

একটু পরে, সবাই ঘরে গিয়ে নিজের নিজের ফোন, জিওফাই, ক্যামেরার ব্যাটারি চার্জে বসানো শুরু করলাম, এবং এইসময়ে আবিষ্কৃত হল, মায়ের ফোনটা নেই। মা জানত যে ফোন মায়ের ব্যাগে নেই। ভেবেছিল যে বাবার কাছে আছে। নোংরিয়াট থেকে নামার সময় জঙ্গলের ওইসব অপরূপ রূপ দেখে মাঝে মধ্যে বাবাকে বলেওছিল, ‘আমার ফোন আমায় দাও, ছবি তুলব।’ কিন্তু, তখন আর সেদিকে আলাদা করে কেউ নজর দেয়নি।

এখন, বোঝা গেল, ফোন নোংরিয়াটেই ফেলে আসা হয়েছে। সিরিনেই।

তাও সবাই মিলে সব লাগেজ উল্টে পাল্টে দেখলাম আমরা। না। ফোন নেই।

এবার? নোংরিয়াটে গিয়ে ফোন ফিরিয়ে আনা তো সম্ভবই নয়। মানে ওই সিঁড়ি ভেঙে? অসম্ভব! চোখের উপর সর্ষেফুলের মত আমাদের শুধু সিঁড়ি ভাসছে স্বপ্নে জাগরণে।

ভাই মাকে একটু আদর টাদর করে বলল, ‘তোমার নতুন ফোন কেনার ইচ্ছা ছিল না? চলো, বাড়ি গিয়ে তোমায় ফোন কিনে দেব।’

মায়ের তো মন মেজাজ এক ঝটকায় একদম খারাপ হয়ে গেছে। মানে, ফোন হারানোর ব্যথা…বুঝিবে সে কিসে? কভু আশীবিষে দংশেনি যারে ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমি বললাম। যা গেছে তাকে যেতে দাও, তবু দেখি মিস্টার বায়রনকে ফোন করে পেয়েছেন কিনা ওটা। পেলে তারপরে না হয় ভবিষ্যৎ কার্যপ্রণালী ঠিক করা যাবে। নিদেন, সিমকার্ডটাকে নষ্ট তো করে দিতে বলতেই পারব?

তা, ফোন তো করব, কিন্তু এই মেঘালয়ের কোণের দিকে নির্জন গ্রামে ভোডাফোন কাজ করে না। কোনও সিগন্যালই নেই।

মিস্টার কংবাম যে নেটওয়ার্কই ব্যবহার করুন না কেন, সেটা নিশ্চয়ই কাজ করবে, কিন্তু তিনি বিশাল ব্যস্ত মানুষ, তাঁর দেখা পাওয়া যায় মাঝে মধ্যে কালেভদ্রে। নয়তো বেশিরভাগটা সময়ই তিনি ব্যস্তসমস্ত হয়ে এদিক ওদিক দৌড়ে বেড়াচ্ছেন।

এর মধ্যে একটা বেড়াল আমাদের ঘরের দরজা খোলা দেখলেই ঘরে ঢুকে একবার খাটের তলায় ঢুকে পড়ছে, বিছানার চাদরের কোণা যেটা মাটিতে লুটোচ্ছিল, একবার সেটা নিয়ে টানাটানি করছে। পারে তো খাটেই উঠে আসে প্রায়।

তা, আমরা যখন সেটাকে নিয়ে ব্যতিব্যস্ত ছিলুম, এমন সময়ে একবার মিস্টার কংবাম এসে আমাদের চা দিয়ে গিয়েছিলেন ফ্লাস্কে করে, কিন্তু তখন আমরা ওঁর কাছ থেকে ফোনটা চাইতে ভুলে গেছিলুম।

যা-ই হোক।

শেষপর্যন্ত, একসময় মিস্টার কংবামের নাগাল পাওয়া গেল। তাঁর কাছ থেকে ফোনটা একটু ধার চাইলাম আমরা। মায়ের ফোন নোংরিয়াটে মিস্টার বায়রনের হোম স্টেতে রেখে আসতে পারি শুনে তিনি বললেন, ‘ওঃ! মিস্টার বায়রন! মাই ফ্রেন্ড! গুড পার্সন। এ ভেরি গুড পার্সন!’

এখানে আসা থেকে শুনছি, হাসি হাসি মুখে মিস্টার কংবাম বলে চলেছেন, সবাইই ওঁর ফ্রেন্ড। দোকানদার, এখানকারই অন্য হোম স্টের মালিকেরা, প্রমুখ প্রমুখ সবাইই। সত্যি কথা বলতে এমন সদাহাস্যময় ছটফটে পরিশ্রমী যুবকের ফ্রেন্ড যে সবাই তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেইও।

এখন, ওঁর ফোন থেকে নোংরিয়াটে ফোন লাগালাম। ফোন তুলে যেই বলেছি, আমি পিউ দাশ বলছি, যে পিউ দাশ আজ সকালেই উঠে এসেছে সিরিন থেকে, মিস্টার বায়রন বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, আপনি ফোন ফেলে গেছেন। আমি আপনাকে ফোন করার চেষ্টা করছিলাম বহুক্ষণ ধরেই, কিন্তু পাইনি। তারপর বললেন, বলুন আপনার ফোন কোথায় পৌঁছিয়ে দিতে পারি? শিলং বা চেরাপুঞ্জিতে আপনি থাকলে আমি আপনাকে ফোন পাঠিয়ে দিতে পারব। তবে, শিলং থেকে ফোন নিলে বেলা একটার আগে ফোনটা আপনাকে নিয়ে নিতে হবে। যে যাবে ফোন নিয়ে তাকে আবার চেরাপুঞ্জি হয়ে, তিরনা হয়ে, নোংরিয়াটে ফিরতে হবে কিনা?

বুঝুন ব্যাপার! এ তো মেঘ না চাইতেই জল! কোথায় ভাবছি ফোনের আশা হয়তো ছাড়তে হল, বা ক্যুরিয়ার ট্যুরিয়ারে পাঠানো যায় কিনা জিজ্ঞেস করব, আর ইনি বলেন এক্কেবারে হাতের কাছে হাতে হাতে পাঠিয়ে দেবেন?

পরের দিনই আমাদের শিলঙে পৌঁছনোর কথা। কিন্তু, উমংগট নদীতে নৌকোবিহার করে, তারপর ক্রাং সুরি ফলস্ দেখে শিলং পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধে হবে।

মিস্টার বায়রনকে বললাম, তার পরের দিন শিলং থেকে ফোনটা নেব আমি। উনি বললেন শিলঙে পৌঁছে ওঁকে জানিয়ে দিতে। উনি যে ড্রাইভারের সঙ্গে ফোন পাঠাবেন তাঁর গাড়ির নাম্বার আর ফোনের নাম্বার আমাদের তখন জানিয়ে দেবেন।

যাই হোক, এই কথাবার্তা হয়ে যাওয়ার পরে আমরা সবাই তো মনে মনে একটু শান্তি পেলাম।

মনটা স্বান্ত্বনা পেল একটু।

একটু পরে মিস্টার কংবাম আমাদের ডিনার দিয়ে গেলেন হটপটে করে। এবং, যথারীতি, এই ডিনার গলাধঃকরণ করা এক শাস্তি প্রায়। এখানে খাসি গ্রামের লোকেরা রুটি খায় না। ভাত খায়। সে ভাত এত গলা যে বাড়িতে থাকলে মুখে তুলতুম না আমরা। ওখানে যদিও সেই ভাতই খেয়ে নিতে হল ঠ্যালায় পড়ে।

তারপর, সবাই লম্বা হলাম নিজেদের বিছানায়। গ্রাম ততক্ষণে শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। দূর থেকে নদীর মৃদু মধুর কুলকুল শব্দ আসছে।

তাড়াতাড়িই ঘুমিয়ে পড়লাম আজ।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *