সবুজ নীলের দেশে, সাদা কালোর দেশে

পিউ দাশ

বেড়াতে যেতে চান অথচ অনেকদিন ঘোরা হয়নি?  পিউ দাশের ট্রাভেলগ সবুজ নীলের দেশে, সাদা কালোর দেশে । প্রতি রবিবার ও বুধবার পড়ুন পিউর ভ্রমনকাহিনী।আজ ষষ্ঠ পর্ব।

বারোই মার্চ

কানের কাছে মোরগের (আর হয়তো মুরগীরও) চিৎকার চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙল। ভাঙল তো ভাঙল, কোনওভাবেই আর সেই ঘুম জোড়ার কোনও উপায়ও রইল না। মানে কানের কাছের মোরগ ডাক থামায় তো পায়ের কাছে মোরগের ডাক শুরু হয়। পায়ের কাছের মোরগ শান্ত হয় তো মনে হয় আমাদের ছাদের উপরেই উঠে কেউ একজন কোঁকড় কোঁ লাগিয়েছে। এই মনে হয় আমাদের কাঠের হোমস্টের ভিতরেই ঢুকে এসেছে তারা তো ওই শুনি রাস্তার ওপারের পাহাড়ে জঙ্গলে মনের সুখে ঝুটোপুটি ডাকাডাকি করছে।

মোরগের ডাকে ঘুম ভাঙে এমন কথা আগে শুনেছিলাম। এবং কখনো কখনো এই অধমের ঘুম ভেঙেছেও আগে মোরগের ডাকে। কিন্তু যা বুঝলাম, মোরগের ডাকে ঘুম ভাঙার সম্পূর্ণ মহিমা বুঝতে পারি নি এতদিন। এখানে মনে হচ্ছিল মোরগের দঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়েছি আমরা। আমার ঘরে আমার একদম পাশ থেকে দূর দূরান্ত পর্যন্ত শুধু মোরগের ডাক আর ডাক আর ডাক।

এদিকে, যে ঘরে আমরা আছি সেই ঘর একদম খাঁটি জয়ন্তিয়া পদ্ধতিতে তৈরী লোকাল কাঠের ঘর। তা, এই কাঠের তৈরী জয়ন্তিয়া বাড়ির বিশেষত্ব হল, ঘর তৈরীর কাঠগুলোর মধ্যে অনেক ফাঁক ফাঁক এখানে। ঘরের মধ্যে ভোরের আলো সেই অসংখ্য ছিদ্র পথে ঢুকে এসে ঘরটাকে একেবারে যাকে বলে আলোয় আলো করে তুলেছে।

মোটমাট পরিস্থিতি যা, আলো ফোটার পর থেকে চোখ ও কানের উপরে যে অত্যাচার এখানে শুরু হয়, তাতে মটকা মেরে পড়ে হয়তো থাকা যায় কম্বলের তলায়, কিন্তু ঘুমোনো অসম্বব।

কাজেই উঠে পড়লাম। কাঠের নড়বড়ে দরজা খুলে বাইরে বেরোলাম। সামনেই পাহাড় আর সিঁড়ি। আমাদের ঘরের সামনে রাস্তা পেরিয়েই যে পাহাড় উঠে গেছে তাতে আমাদের ঘরগুলোর হুবহু রেপ্লিকা, শুধু একটু পুরোনো আর জীর্ণ, দুখানা জয়ন্তিয়া বাড়ি রয়েছে একদম আমাদের চোখের সামনেই। সেখানে জয়ন্তিয়া মহিলারা জামাকাপড় শুকোতে দিয়েছে দেখতে পাচ্ছি আমরা। সেখানে ঘরের আশেপাশে মোরগ ঘোরাঘুরি করছে, ঘরের চাল থেকে লাফিয়ে নিচে রাস্তায় সিঁড়িতে নামছে, গলা ফুলিয়ে রাজার চালে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

পাহাড়ের গায়ে জয়ন্তিয়া গ্রাম জেগে উঠছে একটু একটু করে।

পায়ের অবস্থা একটুও ভাল হলে ওই সিঁড়ি বেয়ে একটু উঠে গিয়ে দেখে আসতাম কেমন গ্রাম ওদের, গ্রাম্য জঙ্গলের স্বাদ নিয়ে আসতাম একটু। কিন্তু, না, প্রচন্ড বাস্তব পায়ের ব্যথা আমাদের সেই রোম্যান্সের দম বন্ধ করে রেখেছে। আমি আর কাকিমা ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সেই নিয়ে দুঃখ করলাম খানিকক্ষণ।

তারপর আমি নদীর দিকে চললাম। বেশ হাওয়া দিয়েছে তখন। দেখি একটি বাচ্চা মেয়ে ঝাঁটা হাতে রাস্তা ঝাঁট দেওয়ার চেষ্টা করে নাজেহাল হচ্ছে। যেই কোনওমতে নোংরাগুলোকে জড়ো করে একজায়গায়, অমনি প্রবল হাওয়ায় তাদের উড়িয়ে নিয়ে যায়। মেয়েটি কিন্তু অক্লান্তভাবে নিজের কাজ করেই চলেছে। হাল ছেড়ে দিচ্ছে না।

মেঘালয়ের রাস্তাঘাট, বনজঙ্গল যে এত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, তার পিছনে এটাই কারণ। নোংরা এরা সহ্য করে না। এই খাসিয়া জয়ন্তিয়া এলাকার অধিবাসীদের পরিচ্ছন্নতাপ্রিয়তা এদের সংস্কৃতিতে এমনভাবে মিশে আছে যে দেখে অবাক হতে হয়। সৌন্দর্যপ্রীতি এদের স্বাভাবিক। প্রকৃতির সৌন্দর্য এরা বোঝে, এবং সেই সৌন্দর্যকে রক্ষা এবং সুযোগ থাকলে তার বৃদ্ধির চেষ্টা এরা করে অক্লান্তভাবে, বিনিময়ে কিছু পাওয়ার আশা না করেই। এখানকার মানুষ দরীদ্র। কিন্তু শ্রী জিনিসটার প্রতি এদের স্বাভাবিক যে আকর্ষণ আছে তার কারণেই এরা লক্ষ্মীছাড়া নয়। সুচারু লক্ষ্মীশ্রী চারিদিকে।

যাই হোক, আমি এগিয়ে গেলাম। রাস্তার পাশে ঘর বাড়ি গাছপালার ফাঁক দিয়ে যেখানে নদী দেখা যাচ্ছে…মুখে বলে বোঝানো সম্ভব নয় সেই নীল স্বচ্ছ নদীর সৌন্দর্য।

তবে, নদীর একদম পাশে যেতে হলে সিঁড়ি ভাঙতে হবে। রাস্তার পাশ দিয়ে নেমে গেছে বাঁধানো সিঁড়ি। সিঁড়ি থেকে আপাতত দূরে দূরেই থাকছি আমি, তাই সেই দিকে গেলাম না আর। সামনেই স্নপডেং ব্রিজ। সেদিকে হাঁটা লাগালাম। স্নপডেং ব্রিজ নদীর দুদিকের তীর জুড়ে ছড়িয়ে থাকা স্নপডেং গ্রামের সংযোগ রক্ষা করেছে। স্নপডেং ব্রিজে উঠতেও সিঁড়ি ভাঙতে হয়। তবে তুলনামূলকভাবে কম। আমি ব্রিজের মুখের কাছে গিয়ে দেখলাম, সুন্দর। কিন্তু, ব্রিজে উঠিনি। এদিকেই রাস্তার উপরে এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি করছিলাম।

পাঠক এতক্ষণে বুঝে গেছেন নিশ্চয়ই, আমার মনে মাঝে মধ্যে কবি কবি ভাব জেগে ওঠে। এই নদীতীরে, পাহাড়ে ঘেরা গ্রামে ঘোরার সময় সেরকম কবিত্বের সঞ্চার হয়েছিল। মনে হল, সকাল তো প্রতিদিনই হয়। ঘুমিয়েই থাকি তখন বেশিরভাগ দিন। কিন্তু আজ এই সবুজে সবুজ জয়ন্তিয়া পাহাড়ের কোলে, এই স্বচ্ছ নীল উমংগট নদীর তীরে এই ছোট্ট শান্ত গ্রামে আমি এই প্রথম সকালকে এরকম ভাবে উদয় হতে দেখলাম যেন। আগামী গোটা দিনের কত সম্ভাবনা, কত প্রতিশ্রুতি সঙ্গে নিয়ে সে এল। সকাল এখানে অনেক ব্যাপ্ত, অনেক বেশি দৃপ্তও। এই সকাল আমাদের নিত্যনৈমিত্তিক সকালের থেকে অন্তত দুই শেড বেশি উজ্জ্বল। এখানে আকাশের, নদীর নীল উজ্জ্বল, চারিদিকের পাহাড়ের সবুজ উজ্জ্বল। এমনকি নদীতীরের পাথরের খয়েরি ধূসরও উজ্জ্বল।

তারপর, মনে হল এই সৌন্দর্যকে এরকমভাবে যেতে দেওয়া যায় না। ক্যামেরাবন্দী করা প্রয়োজন। ছুট লাগালাম ঘরের দিকে। ভাইকে ঘুম থেকে তুলে দিলাম। ও ঘুম থেকে উঠে ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

ব্রিজের দিকেই গেছে ভাবলাম। ওমা! আমি ঘরের মধ্যে এদিক ওদিক কিসব টুকিটাকি কাজ টাজ সেরে একটু পরে পিছু পিছু এসে দেখি ব্রিজের আশেপাশে তার দেখা নেই। ব্রিজের উপরেও নেই যতদূর দেখতে পাচ্ছি। কোথায় গেল! রাস্তা এখানে ব্রিজে গিয়েই শেষ। আশেপাশেই ওর থাকার কথা।

তন্নতন্ন করে এদিক ওদিক খোঁজাখুঁজি করছি, দেখি রাস্তার পাশের সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছে ভাই। সিঁড়ি দিয়ে যে ও নামতে পারে সেটাই আমি ভাবিনি! মানে, এখনও গায়ে জ্বর আসছে আমার সিঁড়ি দেখলে।

কিন্তু, ক্যামেরা গলায় থাকলে সে সব মনে থাকে না। ভাই ওদিকে নেমে গিয়ে নদী তীরের পাথর টাথরের উপর থেকে ছবি তুলছিল। এই নদী তীরের পাথর নিজেও এক রকম আশ্চর্য দ্রষ্টব্য জিনিস কিন্তু। নানা আয়তনের, নানা রঙের। গোল, চ্যাপ্টা, ডিম্বাকার নানা আকৃতি তাদের।

এবার, আমি আর ভাই দুজনেই ব্রিজের দিকে চললাম। ব্রিজটা লম্বা, কতটা লম্বা  সেটা প্রথম নজরে বোঝা যায় না।

এই স্নপডেঙে এলে মানুষের চোখের ডেপ্থ পারসেপশন একদম গন্ডগোল হয়ে যায়। এত স্বচ্ছ উমংগট নদীর জল যে নদীর জলতলের দশ কুড়ি ফিট নিচের পাথর টাথর সব স্পষ্ট দেখা যায় ব্রিজের উপর থেকে, নৌকোগুলোর ছায়া দেখা যায় জলের নিচে। তাতে একটা অপটিকাল ইল্যুসন তৈরী হয়। মনে হয় নদীতে জল অল্প। স্নপডেং ব্রিজটা এপার ওপার হতে মিনিমাম মিনিট সাত আটেক সময় তো লাগেই, অথচ দেখে মনে হয় ইট্টুখানি ছোট্ট ব্রিজ একটা। নিচের নৌকোগুলো কত নিচে বোঝা যায় না। নিচের পাথরগুলো যে প্রায় এক মানুষ সমান মাপের উপর থেকে সে কথা কেউই ভাবতেই পারবে না।

যাই হোক। এখন ব্রিজে উঠে আমরা তো অবাক। হাঁটছি তো হাঁটছিই। হাঁটছি তো হাঁটছিই। ব্রিজ আর শেষ হয় না। আর প্রচন্ড হাওয়া সেই ব্রিজের উপরে। ওই যে বললাম, ডেপ্থ পারসেপশন এবং পার্স্পেক্টিভ। আমাদের তো মনে হচ্ছে নদী এমন কিছু চওড়া নয়। পাহাড়গুলো কাছে কাছে। নদীর চড়া এই তো কাছেই। নদীর ওপার এই তো কাছেই। কিন্তু আসলে তো তা নয়! এখানে নদী যথেষ্ট চওড়া। আর তার উপরে দুদিকে উঁচু উঁচু পাহাড়ের মধ্যে এই নদী উপত্যকা। এখানে বাতাস সব সময়েই ঝোড়ো। মনে হয় উড়িয়ে নিয়ে যাবে। আক্ষরিক অর্থেই। আর জল ছোঁয়া উপত্যকার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সেই হাওয়া ঠান্ডাও তেমন। স্নপডেঙে গ্রামের মধ্যে আমরা ফিনফিনে পাতলা হাতকাটা জামা পরে ঘুরছিলাম সবাই। এখানে স্নপডেং ব্রিজের উপর উঠে মনে হচ্ছিল মোটা জ্যাকেট ট্যাকেট কিছু গায়ে চাপানো প্রয়োজন।

ব্রিজের উপরের সেই প্রচন্ড হাওয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতেই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলাম চারিদিক। হাঁ করে তাকিয়ে থাকার মতই সুন্দর। একদিকে নদী নীল হয়ে সোজা চলে গিয়েছে। অন্যদিকে নদীর মাঝে বিশাল চরা। ব্রিজের পাশেই নদীর অন্য একটা শাখা দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে বেঁকে গিয়েছে। সেই শাখা এই মার্চ মাসে শুকনো। এক ফোঁটাও জল নেই তাতে।

ব্রিজের উপর থেকে নদীবুকে নৌকো গুলিকে ছোট্ট ছোট্ট দেখাচ্ছে। এখানে কোন যন্ত্রচালিত নৌকা নেই। সব দাঁড়েটানা কাঠের সরু সরু নৌকো। যেগুলোকে সাদা বাংলায় আমরা বলি ছিপনৌকা। তাদের স্বচ্ছন্দে নদীর বুকে ভেসে বেড়াতে দেখে মনে হয়, আর কোনো ধরণের নৌকাই মানাত না এখানে। প্রকৃতির উপর জুলুম বলে মনে হত। এই নৌকোগুলো যেন এখানকার প্রকৃতিরই এক অংশ হয়ে গেছে।

ভাই এদিক ওদিক ছবি তুলছিল। হঠাৎ আমি দেখি, একটা কুকুর নিচে নদীতীর থেকে জলে নেমে পড়ল। তারপর সাঁতরে সাঁতরে চলল ওপারে। এই নীল নদীতে এই ছোট্ট ছোট্ট নৌকোর ভিড়ে মধ্যে সেই কুকুরের সাঁতার কাটা কেমন অন্যরকম! তারপর দেখি, আরও দুয়েকটা কুকুর নদীর বুকে এদিক সেদিকে ছড়িয়ে আছে। সবাই সাঁতরে এপার ওপার করছে। ভাইকে দেখালুম। কিন্তু ওর সঙ্গে জুম লেন্স ছিল না, তাই সেই কুকুরের ছবি ওঠেনি ভাল।

যাই হোক, বেশ অনেকক্ষণ ওই অপূর্ব, অদ্ভুত, অসাধারণ (আরও যা যা সুপারলেটিভ অ্যাডজেক্টিভ মাথায় আসে বসিয়ে নিতে পারেন। পুরোপুরি বর্ণনা তাতেও হবে না।) সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশে ব্রিজের উপর হাঁটলাম। কিন্তু ব্রিজ শেষ হল না। এদিকে মা-বাবাকে বলে আসিনি এদিকে এসেছি আমরা। অনেকক্ষণ বাইরে থাকলে ওরা খোঁজাখুঁজি করতে পারে। তাই ব্রিজের মাঝামাঝি পর্যন্ত গিয়ে, তারপরে আরেকটু গিয়ে, তারপরে আরো আরেকটু গিয়ে, তারপরে ফিরলাম দুজনে। ফেরার ইচ্ছা ছিল না। বলাই বাহুল্য। তবু, ফিরতেই হয়।

পরে, কাকা কাকিমা এবং মা বাবা নাকি পুরো ব্রিজটা পেরিয়ে নদীর ওপারে গিয়েছিল। ওদিকের গ্রামের মানুষদের সঙ্গে কথাবার্তাও বলেছিল ওরা।

আপাতত নিজেদের দারুনির্মিত কুটীরে ফিরে এসে মা-বাবাদের বললাম নদীর উপরের ব্রিজের থেকে ঘুরে আসতে একবার, তারপর কাকিমাদেরও গিয়ে সদুপদেশ দিয়ে এলাম।

এ এমন জিনিস, চোখে না দেখলে তবু বিশ্বাস হয়, নিজের চোখে দেখলে আর বিশ্বাস হওয়ার জো টি নেই।

মায়েরা নদীর দিকে গুটিগুটি পায়ে হাঁটা লাগানোর পরে আমি বাইরে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দাঁত টাঁত মাজতে মাজতে, ফ্রেশ হতে হতে হাঁ করে দূরের নদীর দিকে তাকিয়ে রইলাম।

স্নপডেঙের ওই কাঠের তৈরী, ছোট্ট বাগানে ঘেরা ঘর আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে বহুদিন!

নটা সাড়ে নটা নাগাদ সবাই স্নান ট্নান করে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়া গেল। প্রথমে কিছু খেতে হবে। তারপর নৌকোয় চড়ব। হালাটং হোমস্টের নিজস্ব নৌকা। চাইলে ক্যাম্পিং, ফিসিং ইত্যাদি ইত্যাদির ব্যবস্থাও মিস্টার কংবাম করে দেন। অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস করতে চাইলে সে ব্যবস্থাও আছে।

এখানে নৌকাভ্রমণ সকাল দশটার আগে শুরু হয় না। সূর্য মোটামুটি মাথার উপরে না উঠলে নদীর জলের টলটলে স্বচ্ছতা অত স্পষ্ট হয় না চোখে।

নদীতীরে মিস্টার কংবামের সেই ‘ফ্রেন্ড’এর দোকানে ব্রেক ফাস্ট সারা হল। ব্রেক ফাস্ট হল রুটি আর আলু মটর। খাওয়া যায়, একদম অখাদ্য নয়, এটুকুই।

তারপর চা টা খেয়ে ধীরে সুস্থে আমরা চললাম নদীর দিকে। এবার চড়ব নৌকায়।

ডাউকিতে যে বিশ্রী ভিড় কাল দেখেছি, স্নপডেঙে তার উলটো। এখানে এই আমরা ছয়জন ছাড়া আপাতত আর কেউ নেই নৌকোয় চড়ার জন্য। কোনও তাড়া নেই আমাদের তাই। লাইনের ব্যাপার নেই। সত্যিকারের ছুটির আমেজ।

স্নপডেঙে এক একজনের নৌকা চড়তে খরচ একশ টাকা করে। শুনে আমি অবাক হয়েছিলাম। কারণ আগে ইন্টারনেট থেকে খবর পেয়েছি ডাউকিতে নৌকাভ্রমণের ভাড়া মাথাপিছু পাঁচশ-সাতশ টাকা। সিজন অনুসারে পরিবর্তন হয়। এখানে এত কম?

বুঝলাম স্নপডেঙে খরচ কম। অথচ একই নদী, তার একই রূপ। অথচ, দুটো স্থানের মধ্যে দূরত্ব মাত্রই ছয় কিলোমিটারের।

যাই হোক, সিঁড়ি দিয়ে নেমে উমংগট নদীর তীরে গেলাম। আমি এই প্রথমবার গেলাম নদীর কাছে। ভাই ছাড়া বাকিরাও সবাই। একা ভাইই নেমেছিল আগে নদীচরে।

বড় বড় গোল গোল রঙবেরঙের পাথরে পা ফেলে ফেলে শেষটায় জলের কাছে পৌঁছনো গেল। সবাই  লাইফ জ্যাকেট গলিয়ে নিলাম। তারপর একে একে টলমলে নৌকায় চড়ে বসলাম। নৌকা ছেড়ে দিল।

নৌকায় বসেই তো কাকিমা মনের সুখে যা ইচ্ছা তাই ভুলভাল কথা টথা বসিয়ে ‘ও নদী রে!’ গান জুড়ল। জানবেন মানুষ যখন ভুল কথা বসিয়ে গান গায় বুঝতে হবে তুরীয় আনন্দ হয়েছে তার তখন। কারা যেন দুঃখ করছিল এই টলমলে সরু নৌকার উপর নাচানাচি করা যাবে না বলে। অর্থাৎ আনন্দটাকে মনের মধ্যে ধরে রাখা যাচ্ছে না। একটু লাফালাফি করার প্রয়োজন।

আনন্দটা অকারণ নয়। সত্যিই এমন দৃশ্য চারিদিকে যে একটু নেচে নিতে ইচ্ছা করলে তাতে দোষ দেওয়া যায় না।

নদীর নাম উমংগট। খাসিয়া-জয়ন্তিয়া ভাষায় ‘উম্’ শব্দের অর্থ জল। তাই সমস্তরকম ওয়াটার বডির নামেই ‘উম্’ কথাটা থাকে। নোংরিয়াটে নদীর নাম উমশিয়াং, স্নপডেঙে নদীর নাম উমংগট, শিলঙে লেকের নাম উমিয়াম।

নদীর যে তীরে আমরা রয়েছি তার অপর তীরে সাতস্ঙি হোমস্টের টেন্টগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ছবির মতন। একটু দূরে স্নপডেঙ ব্রিজ পেরিয়ে ব্রাইট স্টার হোম স্টেও দেখা যাচ্ছে।

আমরা সেই ব্রিজ পেরিয়ে গেলাম, ছেড়ে এলাম ব্রাইট স্টারকেও।

নৌকো এগিয়ে যাচ্ছে দুলতে দুলতে আস্তে আস্তে। দেখি নদীতীরের এক বিশাল খয়েরি পাথর খন্ডের গায়ে বড় বড় সাদা ইংরিজি অক্ষরে লেখা, ‘অ্যাটিচিউড ইস দ্য ডিফারেন্স বিটুইন অ্যান অরডিল অ্যান্ড অ্যান অ্যাডভেঞ্চার’!

সবেই কালকে নোংরিয়াট থেকে অ্যাডভেঞ্চার করে ফিরেছি, পায়ের ব্যথা এখনও জানান দিচ্ছে সে কথা। কাল রাতে সবাই সারা পায়ে ভলিনি লাগিয়ে শুয়েছি। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে নামতে হলে মনে হচ্ছে প্রাণ বেরিয়ে যাবে। এখন এই বাণী হঠাৎ চোখে পড়ে মনকে এত উৎসাহ দিয়েছিল না, যে কী বলব! সব্বাইকে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে পড়ে শোনালুম কথাটা। পায়ের ব্যথা মনে চেপে সবাই বলল ‘ঠিক ঠিক!’

আরো অনেক বাণী রয়েছে লেখা পাথরের গায়ে, যেমন, ‘এজ ইস জাস্ট এ নাম্বার’, ‘ইটস্ নেভার টু লেট টু স্টার্ট ইয়োর জার্নি’ ইত্যাদি ইত্যাদি। সবই বেশ উৎসাহব্যঞ্জক!

হঠাৎ নজরে পড়ল, নদীর পাশে পাশে পাথরের বড় বড় চাঁইগুলোর উপর রাখা রয়েছে মাছ ধরার ছিপ। সেই ছিপের সুতো পাহাড়ের গা ঘেঁষে নেমে এসেছে জলে।

আমার বাবা কাকারা এককালে প্রচুর মাছ ধরত। বর্ষাকালে সারারাত জেগে মাছের চার তৈরী চলত আমাদের বাড়িতে। পিঁপড়ের ডিম থেকে ঘিয়ের গাদ, জায়ফল জয়ত্রী, কী ছিল না সেই মাছের চারের লিস্টিতে। বর্ষাকালে মাছ ধরার সিজন। আমার জন্মদিন ২১শে জুন। ছোটবেলায় আমার কোনও জন্মদিনে এমন কোনওদিন হয়নি যে মিনিমাম তিন চার কিলোর একটা মাছ ধরা পড়ল না, আর ভোজ হল না বাড়িতে। তবে, কোনওদিন তার চেয়ে বড় মাছ ওঠেনি আমার জন্মদিনে। দুঃখু!

তা এখানে ছিপে হুইল লাগিয়ে চার দিয়ে মাছের উদ্দেশ্যে ছিপ ফেলে রাখতে দেখে তাই একটা পরিচিতের ভাল লাগা আসছিল আমাদের। বাবা-কাকার বেশি নিশ্চয়ই। কিন্তু আমাদেরও।

নৌকা এগিয়ে যাচ্ছে। নানারকম কথাবার্তার টুকরো ছুঁড়ে দিচ্ছি পরস্পরকে। ‘এ জিনিস নিজে না দেখলে কাউকে যে বলে বোঝাবি, সে সম্ভব নয়’. ‘নাঃ! কী আর বলব! প্রকৃতিই পারে…’, ‘আমি নিজেই দেখছি তো ক্যামেরা স্ক্রিণে, আসছে না, পুরো সৌন্দর্য…’, ‘দারুণ জিনিস বানিয়েছেন দাদু!’, ‘কে দাদু? ভগাদা?’, ‘ভগাদা!’

নদীতীরের অগভীর জলের থেকে ক্রমশঃ গভীর জলের দিকে চলেছি আমরা। জলের উপর দুপাশ দিয়ে উঠে গেছে খাড়া পাহাড়, মানে একদম খাড়াই ন্যাড়া পাথর সোজা দাঁড়িয়ে রয়েছে, তা, এক দেড়শো ফুট উঁচু হবেই দুদিকে।

নিচে, আমাদের মাঝি বললেন, জল এখানে আড়াইশ তিনশ ফুট গভীর। অত স্বচ্ছ জলও নিচে আরও নিচে গিয়ে নিকষ কালো হয়ে রয়েছে। সেদিকে তাকালে গা একটু ছমছম করেই। সূর্যের আলো প্রবেশ করতেই পারে না আর জলের ভিতরে অত গভীরে।

এখানে শুধু দুদিকেই খাড়া পাহাড় নয়, নদীর মধ্যিখানে মধ্যিখানেও এক একটা পাথর হঠাৎ লম্বা হয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেই রকম দুদিকে ভেসে থাকা পাথরের মধ্য দিয়ে চলেছে আমাদের নৌকা। আবার কোন কোন চওড়া পাথর জলের উপরে ভেসে নেই, কিন্তু জলের উপরের তলের থেকে একটু নিচেই ছড়িয়ে রয়েছে অনেকটা জায়গা জুড়ে। স্বচ্ছ জলে স্পষ্ট বুঝতে পারছি তার রং, তার আকৃতি, সেই পাথরের পাশে আর এক পাথর। জলের নিচে দুটিতে যেখানে ঠেকাঠেকি হয়েছে, তার নিচে তৈরী হয়েছে এক গহ্বর। সূর্যের আলো যায় না সেখানে। দেখলাম ছোট ছোট মাছের বিশাল ঝাঁক সেই গহ্বর থেকে বেরিয়ে আসছে পিলপিল করে।

আবার একটু এগিয়ে গিয়ে কোথাও নদী জল তুলনামূলকভাবে অগভীর। সেখানে কুড়ি তিরিশ ফুট নিচে পর্যন্ত ছোট বড় পাথর আর পাথরের উপর ঘুরে বেড়ানো খুদে খুদে মাছেদের স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।

জলের সারফেসের রং এখানে নীলচে সবুজ। হঠাৎ দেখলে মনে হবে একগাদা কালি কেউ ঢেলে দিয়েছে জলে। আর নৌকোর কানা ঘেঁষে নিচে তাকালেই নিচের অনেকদূর পর্যন্ত দেখা যায়।

সবাই জলে হাত দিয়ে দিয়ে ছুঁয়ে দেখলাম। তবে টলটলায়মান নৌকায় অনেক নড়াচড়া করতে বারণ করেন মাঝিরা।

একটু এগিয়ে গিয়ে এক জায়গায় দেখি জলের উপর হঠাৎ জেগে থাকা এক পাথরের খন্ডের উপর ছিপ নিয়ে বসে আছেন একজন স্হানীয় লোক। চমক লাগার মতন ছবি একটা।

তারপর, বারবারই দেখলাম সে দৃশ্য। নানা বয়সের নারী-পুরুষ নদীর উপর জেগে ওঠা পাথর খন্ডে ছিপ হাতে বসে রয়েছেন। কোনও পাথরখন্ডে নৌকো বাঁধা। কোথাও নৌকার উপর উপুড় হয়ে শুয়ে নৌকোর কানা ধরে নিচে উঁকি মেরে কেউ দেখছেন নিচে মাছ টাছ আছে কিনা। কেউ অদ্ভুত কায়দায় নৌকো বাইছেন জলের উপর।

মানুষ যখন প্রকৃতিকে অতিক্রম করে যেতে চায় না, মানুষ যখন প্রকৃতির অংশ, তখন সেও খুব সুন্দর। এখানে এই নদীর উপরে মানুষগুলোকে যে কী সুন্দর লাগছিল! নিজের কাজ করে চলেছেন প্রত্যেকে আপন মনে। আমরা যে বহিরাগত, ট্যুরিস্ট, হৈচৈ শব্দে এই নদীবক্ষের শান্তি ভঙ্গ করছি, আমাদের প্রতি তাঁরা নির্বিকার। প্রকৃতির সঙ্গে মিশে প্রকৃতির মতই চুপচাপ। সুখে দুংখে নিরুদ্বিগ্নমনা যেন।

আমাদের পাশ দিয়ে চলা এক নৌকোয় অন্য একদল ট্যুরিস্টের দেখা মিলল। নৌকোসফর শেষ করে ফিরে চলেছেন তাঁরা আবার তীরের দিকে। হাত নাড়িয়ে পরস্পরকে অভিবাদন করা হল। সকলের মুখেই নিষ্কলুশ বাঁধনছেঁড়া হাসি। সত্যিই পরস্পরকে এই মুহূর্তটুকুর জন্য দেখতে পেয়ে খুশি আমরা।

সেই রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন না?

‘পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি।

আমরা দুজন চলতি হাওয়ার পন্থী।’

 

সত্যিই পথে বেরিয়ে পড়লে অন্য সকলকে অনেক বেশি আপন লাগে। পথ আমাদের ঘরের বাঁধন, স্বার্থগুলোকে একটু আলগা করে দেয় বলেই বোধ হয়, ছোট ছোট ক্ষণিকের সম্পর্ক তৈরী করতে পারে মন বিনা দ্বিধায়। ওখানে কোনও সম্পর্কেই বাঁধন নেই, কিন্তু জোর আছে।

সোশ্যাল নেটওয়ার্কে আমি অমন সম্পর্ক তৈরী করি। শুধু ক্ষণিকের ভাললাগা আর ভালবাসাটুকু থাক। মন বাঁধন তৈরী করে ফেললেই তার সঙ্গে আসে বাঁধনের যন্ত্রণা।

আমাদের নৌকা তো এগিয়ে চলল নদীবক্ষে পাথরের মাঝখান দিয়ে, পাথরদের পাশ কাটিয়ে। হঠাৎ মা চিৎকার করে উঠল, ‘আরে সামনে ঝর্ণা না?’

আমিও দেখেছিলাম ঝর্ণাটাকে একপলকের জন্য। তার পর নদীর বাঁকে পাথরের আড়ালে মিলিয়ে গেল সে। এই নদীটারই সামনে রয়েছে। মনে হল তার দিকেই চলেছি।

এবারে একটু এগোনোর পর নদীবক্ষের উপর জেগে থাকা পাথরের সংখ্যা এত বেশি যে ওই পাথরের ফাঁক দিয়ে নৌকা চালানো বিপজ্জনক বলেই মনে হয়। আমি তো ভাবছিলাম এবার আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন মাঝি। কিন্তু, না। এগিয়েই চললাম। চললাম ওই পাথরখন্ডের মধ্যের সরু ফাঁক দিয়েই।

আমাদের পাশ দিয়ে আমাদের অতিক্রম করে তরতর করে এগিয়ে গেল অন্য দুটো নৌকো।

তারপর নদীর বুকে একটা বাঁক নিয়েই দেখি, সেই ঝরণার মুখে এসে পড়েছি। উমংগট নদী পাথরের সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছে এখানে। ছোট্ট সুন্দর ঝরণা তৈরী করেছে। স্বচ্ছ নীল জল গর্জন করে নেচে চলেছে আমাদের নৌকার চারিদিকে।

এই মার্চ মাসে ঝরণার আকার ছোট। তিনদিকে তার তিনটে মুখ হয়ে নেমে আসছে জল। বর্ষাকালে যে এই ঝরণা ছোট থাকে না সে কথা কাউকে বুঝিয়ে বলে দেওয়ার দরকার হয় না।

ডাউকি বা স্নপডেং বেড়ানোর পক্ষে বর্ষাকাল একেবারেই আদর্শ সময় নয়। নদীর জল এত নীল থাকে না তখন, থাকে না এত স্বচ্ছও। সেসময় চারিদিকের নদী অববাহিকা থেকে ধুয়ে আসা বৃষ্টির জল পড়ে নদীতে। অবশ্যই এত টলটলে থাকে না নদী।

ডাউকি বেড়াতে যাওয়ার আদর্শ সময় শীতকাল। মূলত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি। এবং অবশ্যই মার্চের শুরুর দিকেও নদীর রূপ অপরূপ থাকে। আমরা যেমন পেয়েছিলাম।

 

এখন দেখলাম, এইখানে এই ঝরণার মুখে বড় বড় পাথরখন্ডের মাঝে অনেকে নানারকম অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস করছে। আমাদের পাশেই খাড়াই উঠে যাওয়া নদীতীরে রক ক্লাইম্বিং করছেন দেখলাম দুজন। ঝরণার মুখে জলের উপরে একজনকে রক ক্লাইম্বিং করে নামতে দেখলাম।

আমাদের পাশ দিয়ে যে দুটি নৌকো এগিয়ে গিয়েছিল তারাও অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের, এখন দেখি তারা একদম ঝরণার মুখে চলে গেছে।

আমাদের নৌকা তো বেশ দুলছে এখন ঝরণা থেকে সবে নেমে আসা জলের আন্দোলনে। আমরাও ঝর্ণার আরো কাছে এগোচ্ছি।

সত্যি কথা বলতে ঝর্ণার কাছে যাওয়া নিয়ে আমাদের মনে এক অদ্ভুত দোলাচল লাগছিল। ইচ্ছা করছে আরো কাছে যেতে। আরো আরো। কিন্তু নৌকা যেমন দুলছে জলের দোলায়…তার উপর আমি আর ভাই সাঁতারও জানি না। আতঙ্কও লাগছে একরকম। কিন্তু সেই আতঙ্কের আকর্ষণই তো অপ্রতিরোধ্য!

যাই হোক। আমাদের কর্ণধার আমাদের ঝর্ণামুখের আরও কাছে নিয়ে যাননি। কিন্তু এটুকু বুঝেছিলাম, আমাদের সেফটি অক্ষুন্ন রেখে যেটুকু কাছে নিয়ে যাওয়া সম্ভব সেটুকু নিয়ে গিয়েছিলেন।

সেইখানে জলের সেই গর্জনের মধ্যে নীল জলের উপর সাদা ফেনায়মান ঝর্ণার সামনে দোদুল্যমান নৌকার উপর ভয়ে ভয়ে বসে থাকার স্মৃতি। কী করে সেই অনুভূতিকে ভাষায় প্রকাশ করব?

নদী ঝরণা হয়ে বাধা দিল আর এগোতে। ফিরে চললাম আমরা। আসার সময় নদীর যে তীর ধরে এসেছি, ফিরলাম অপর তীর ধরে।

চারিপাশের দৃশ্য একই রকম সুন্দরই ছিল হয়তো। কিন্তু আসন্ন বিচ্ছেদের দুঃখেই মনে হয় ফেরার সময় উমংগট নদীকে, নদীতীরের পাহাড়কে, নদীবক্ষের পাথরকে আরো মধুর লাগছিল আমার চোখে।

ফিরতে ফিরতে একজায়গায় দেখি, নদীর তীরে পাথরেরা পরস্পরের গায়ে হেলান দিয়ে একটা গুহা তৈরী করেছে। সেই গুহার সামনে জামাকাপড় মেলা রয়েছে। গুহার ভিতর মানুষের বসবাসের চিহ্ন স্পষ্ট।

কে এই গুহায় রয়েছে, রাত্রিবাস করছে কে জানে? কোনও স্থানীয় কেউ নাকি অ্যাডভেঞ্চার সন্ধানী কোনও ট্যুরিস্ট? বোঝা গেল না।

নৌকা এগিয়ে চলল।

তারপর, একঘন্টার নৌকাভ্রমণের শেষে আমরা আবার স্নপডেঙে ফিরলাম। নৌকা ছেড়ে তীরে উঠলাম। তারপর তীরের পাথরের উপর দিয়ে এগিয়ে গিয়ে, সিঁড়ি বেয়ে উঠে চললাম উপরে।

উমংগট নদীকে ফেলে আসতে ইচ্ছা করছিল না। আর আসব না এখানে। এই সৌন্দর্য চোখের আড়াল হবে এখনই, ভাবাটাই কষ্টকর! তবু উঠতেই হল।

গাড়িতে লাগেজ তুলে দেওয়া হয়েছিল আগেই। এখন শুধু মিস্টার কংবামের কাছ থেকে বিদায় নেওয়া।

তাঁর সঙ্গে ছবি তোলা হল।

কঙবামের সঙ্গে আমি

জানলাম তিনজন লোকের এক ছবিতে এক ফ্রেমে থাকায় তাঁর আপত্তি। ‘নো গুড’, বললেন তিনি। দুজনের ছবি ভাল। তিনজনের ছবি অশুভ।

যাই হোক, ছবি টবি তোলা শেষে মিস্টার কংবামকে, উমংগট নদীকে, স্নপডেংকে বিদায় বলে গাড়িতে উঠে বসলাম আমরা। গাড়ি এগিয়ে চলল।

Leave a Reply