সবুজ নীলের দেশে, সাদা কালোর দেশে

পিউ দাশ 

বেড়াতে যেতে চান অথচ অনেকদিন ঘোরা হয়নি?  পিউ দাশের ট্রাভেলগ সবুজ নীলের দেশে, সাদা কালোর দেশে । প্রতি রবিবার ও বুধবার পড়ুন পিউর ভ্রমনকাহিনী।আজ সপ্তম পর্ব।

স্নংপডেংকে বিদায় দিতে একটু…খুবই…কষ্ট হচ্ছিল মনে। কিন্তু সামনেই যাচ্ছি ক্রাং সুরি ফলসে, সে নিয়ে উত্তেজিতও ছিল মন, আর তারপর, আজই পৌঁছব শিলং।

কালকের বিরক্তি, মেজাজ খারাপ হয়ে থাকা, আজকে উধাও। যে দৃশ্য আর পরিবেশ দেখেছি, দেখছি চারপাশে, তাতে খারাপ লাগা অনুভূতিটাকে অনেকক্ষণ ধরে থাকা যায় না। আজকের বাতাসেও একটা অন্যরকম ছোঁয়া লেগেছে। নীল আকাশে সাদা মেঘ। আজ খুশি খুশি লাগছে মন।

কাল চেরাপুঞ্জি থেকে ডাউকির দিকে আসার পথেই আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিলাম, এই যে চেরাপুঞ্জিতে রইলাম তিনদিন, কই একটুও তো বৃষ্টির দেখা পেলাম না? তবে যে সেই ছোটবেলায় ভূগোল বইতে পড়েছিলুম, চেরাপুঞ্জি পৃথিবীর সবচেয়ে বৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চল? সে কি ভুল ছিল তবে? সেই যে শুনতাম, চলতে চলতে হঠাৎ মেঘ এসে ভিজিয়ে দিয়ে চলে যায় অসন্দিগ্ধ পথিককে, সে কি সব কবির কল্পনা মাত্র? এই যে একটা রাজ্যের নাম ‘মেঘালয়’, এমন অপূর্ব নামটা কি বৃথা যাবে? মেঘালয়ে কি আমরা মেঘের দেখা পাব না? বৃষ্টিস্নাত রাস্তা আর প্রকৃতি কি অধরাই থেকে যাবে আমাদের?

কাকা বলছিল, “হ্যাঁরে! সেই যে পড়েছিলাম, ‘এইখানে মেঘ গাভীর মত চড়ে!’ কোথায় সেই গাভীর মত মেঘ?”

আজকেও সেই আলোচনা করছিলাম আমরা গাড়িতে উঠে। আজ যাচ্ছি শিলঙে। শিলঙে দু রাত থাকব। তারপরই মেঘালয়কে টাটা। তার মধ্যে যদি না বৃষ্টি হয় তো মেঘালয়ে মেঘ দেখা আমাদের আর হবে না। আমি ইস ফিলিং স্যাড উইথ কাকা অ্যান্ড ফোর আদারস।

 

যতই ফিলিং স্যাড করি না কেন, কালো মেঘের দেখা নেই আকাশের কোনওদিকে কোথাও। সব নীল ঝকঝক করছে।

আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলেছে। ডাউকি থেকে শিলঙে যাওয়ার যে সোজা রাস্তাটা, আমরা তার চেয়ে একটু অন্য পথেই চলেছি, কারণ ক্রাং সুরি যাব।

এই রাস্তাটা সুন্দর, দুদিকে ঢেউ খেলানো উপত্যকা চেরাপুঞ্জিতে ঢোকার সময় যেমনটা দেখেছিলাম, সেই রকম। সবুজের ছোঁয়া কম এখানে। প্রকৃতি ধূসর। এই ধূসরতার একটা অন্য মাত্রার গম্ভীর সন্ন্যাসীসুলভ সৌন্দর্য আছে।

কিন্তু সে সৌন্দর্য ভাল করে উপভোগ করা শুরু করতে না করতে মন মেজাজ খারাপ হয়ে গেল।

এখানে জনমানুষের চিহ্ন নেই, নেই দূর দূরান্ত পর্যন্ত মনুষ্য বাসের কোনও লক্ষণ, কিন্তু তাও প্রকৃতির উপর মানুষের থাবার চিহ্ন স্পষ্ট।

রাস্তার দুপাশে যে ছোট ছোট রুক্ষ শুষ্ক টিলার মত আছে, সেগুলোর প্রায় কোনওটাই আর আস্ত নেই। এই টিলাগুলো হচ্ছে ভাল কোয়ালিটি বালির আকর। টিলা খুঁড়ে বালি বের করে নিয়েছে মানুষ, পড়ে রয়েছে শুধু শক্ত পাথরটুকু। কোথাও আবার গোটা পাহাড় কে পাহাড় কেটে পাথর যাচ্ছে রাস্তা বানানোর কাজে। বাংলাদেশী লরি দেখলাম প্রচুর, সেই আমাদের ছোটবেলায় যেরকম লরি দেখতাম, গোঁফ ওলা মোটা নাকের কার্টুন দাদুর মত চেহারা, সেইরকম লরি, পাহাড় কেটে পাথর বোঝাই হয়ে চলেছে নাকি সীমান্ত পেরিয়ে। রাস্তা বানানোর কাজে আসবে ওই পাথর। রাস্তায় ওই লরির সারি দাঁড়িয়ে রয়েছে, একের পর এক, একের পর এক, একের পর এক।

পাহাড় কেটে পাথর গুঁড়ো করে কোথাও কারখানায় বানানো হচ্ছে সিমেন্ট। বাতাস ধুলোয় ধুলোয় ভর্তি সেসব জায়গাতেই। অসংখ্য সিমেন্ট কারখানা দেখলাম এখানে।

প্রকৃতিকে ব্যবহার না করে, লুন্ঠণ না করে মানুষের চলে না জানি। তবু, এইখানে যা দেখলাম, প্রকৃতির অমন মধুর রূপ দেখার পরে তা মনকে কষ্ট দেয়।

আবার দেখি, মাইলের পর মাইল দূর দূরান্ত পর্যন্ত ফাঁকা উপত্যকার মধ্যে এক এক জায়গায় হঠাৎ গড়ে উঠেছে ছোট ছোট সুন্দর ছিমছাম লোক বসতি। রাস্তা থেকে নিচে, উপত্যকার কোলে বিছিয়ে থাকা সেই ছোট বসতিগুলো হঠাৎ চোখে পড়ে, খুব মিষ্টি লাগে।

একটু এগিয়ে বোঝা গেল, আমাদের ড্রাইভার ক্রাং সুরি ফলসের জেনারেল ডিরেকশন জানেন, কিন্তু ফলসটা ঠিক কোথায় সেটা জানেন না। জয়ন্তিয়া পাহাড়ের বুকে আমলারেম নামের ছোট্ট শহরের কাছেই ‘ক্রাং সুরি’ অবস্থিত। সেই শহরে পৌঁছে আমরা একে ওকে জিজ্ঞেস করলাম ক্রাং সুরির রাস্তা। সকলেই বলল রাস্তা যেখানে দুদিকে ভাগ হয়ে গেছে, তার মধ্যে ডানদিকের বাঁকটা ধরে এগিয়ে যেতে হবে।

যাই হোক, রাস্তায় বারবার থেমে থেমে, একে ওকে জিজ্ঞেস করে করে, কোনওমতে শেষ পর্যন্ত একজায়গায় রাস্তার ধারে ‘ক্রাং সুরি’ ফলসের সাইন বোর্ড চোখে পড়ল।

এখানে হাইওয়ে থেকে একটু নেমে ধূলিধূসর খোলা একটা জায়গায় গাড়ি পার্কিং করতে হয়। তারপর বেশ খানিকটা হাঁটা পথ আছে ক্রাং সুরি যেতে।

এখানে অন্য কয়েকটা ট্যুরিস্ট গাড়ি পার্কিং করা আছে দেখলাম। ছোট ট্যুরিস্ট বাসও দেখেছি দুয়েকটা। কিন্তু সাধারণত ট্যুরিস্ট প্লেসের যে ভিড় ভাট্টা আশা করি আমরা, তার কিছুই এখানে নেই। ফাঁকা জায়গায় কয়েকটা গাড়িই শুধু দাঁড়িয়ে রয়েছে। কোনওরকম দোকান পাট কিছুই চোখে পড়ল না। একটা ধাবা মত আছে মনে হল পাশের দিকে। বড়ই দীর্ণ তার অবস্থা।

আমরা হাঁটা শুরু করলাম। পাথর বসানো সুন্দর রাস্তা। রাস্তার একদিকে খাড়াই ন্যাড়া পাহাড় উঠে গেছে। অন্যদিক ঝোপ ঝাড়ে ভর্তি। এবং এখানেও সিঁড়ি। পাহাড়ী এলাকায়, পাহাড়ী রাস্তায় সিঁড়ির থেকে নিস্তার আমাদের নেই জানি…কিন্তু পায়ের ব্যথাও আমাদের বেশ ভালই জ্বালাচ্ছে এখনও।

আমাদের দলের অন্যদেরও জ্বালাচ্ছে, কিন্তু কাকিমাকে বেশি। পায়ে টান লেগে বেচারা নাজেহাল।

খানিকটা এগোনোর পরে এক ট্যুরিস্ট দলের সঙ্গে দেখা হল আমাদের। ক্রাং সুরি দেখে ফিরছে, তারা দেখলাম সবাই পথ হেঁটে কাহিল। কাকা জিজ্ঞেস করল, সামনে কতটা রাস্তা? তারা বলে, তা, দু কিলোমিটার হবে!

শুনেই তো আমাদের চক্ষু চরকগাছ। পাহাড়ী রাস্তায় সিঁড়ি বেয়ে সাড়ে তিন কিলোমিটার হেঁটে এসেছি, সে যে কি ভয়ংকর জিনিস, সে অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে আমাদের। আর এখানেও কিনা, দু’কিলোমিটার রাস্তা? পায়ের এই অবস্থা নিয়ে?

আমি মোটামুটি জানতাম ক্রাং সুরি যেতে দুকিলোমিটার রাস্তা হতেই পারে না। মিনিট কুড়ি থেকে আধঘন্টার হাঁটা পথ এখানের। হেঁইয়ো বলে মাস্তানের মত এগিয়ে গেলাম সবাইকে পিছনে ফেলে। ক্রাং সুরিতে সবাইকে নিয়ে যেতেই হবে।

রাস্তা খুব কম নয়। আর খাড়াই না হলেও পুরো রাস্তাটাই সিঁড়িই। যদিও ওই রাস্তাটুকু এমনি অবস্থায় গায়ে ফুঁ লাগিয়ে চলে যাওয়া উচিত, সেদিন একটু কষ্ট হয়েছিল আমাদের।

রাস্তা চলতে চলতে, এদিক ওদিক বাঁক নিয়ে, সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে হঠাৎ এক জায়গায় চোখে পড়ল রাস্তার পাশে একটু উঁচু করে এক বাঁধানো জায়গা, ভিউ পয়েন্ট। সেই ভিউ পয়েন্টের উপর দুজন বয়স্ক ভদ্রলোক ভদ্রমহিলা একটা বাচ্চাকে নিয়ে বসে আছেন দেখলাম। তাঁরা অসমিয়া। চেরাপুঞ্জি ডাউকি বেড়াতে এসেছেন। সঙ্গে এসেছে ছেলে আর বৌমা। বাচ্চাটি তাঁদের নাতি। এই রাস্তাটুকু হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে বলে এঁরা বসে পড়েছেন এখানে। ছেলে-বৌমা এগিয়ে গেছে।

আমরা বাঁধানো ভিউ পয়েন্টে উঠে উঁকি দিয়ে ‘ভিউ’ দেখলাম।

চারিদিকে নানা শেডের সবুজের মধ্যে একটা ঘন নীল নদী বয়ে এসে সাদা ঝরণা হয়ে গেছে।

‘ক্রাং সুরি’র ভিউ দেখে আবার দ্বিগুণ উৎসাহ এসে গেল বুকে। হ্যাঁ, যা আশা করেছিলাম তেমনই। ঝর্ণাতলের নীল জল হঠাৎ মন্ত্রবলে ঘোলা হয়ে যায়নি, ঝর্ণার জল শুকিয়ে যায়নি বা চারিদিকের সবুজ হারায়নি তার রং।

আবার সিঁড়ি ভাঙা শুরু করলাম। রাস্তার মধ্যিখানে এক জায়গায় একটা সরু পাহাড়ী গাছ ভেঙে পড়েছে। লম্বা লোকেদের মাথা নিচু করে পেরিয়ে যেতে হয় সেটা।

রাস্তায় একটা শুকনো সংকীর্ণ নদীখাত পড়ে। তার উপর কংক্রিটের তৈরী ব্রিজ একটা।

সেটা পেরিয়ে একটু এগিয়ে গিয়েই ক্রাং সুরি ফলসে ঢোকার প্রবেশ পথ। এখানে গেটে টিকিট কেটে ফলস দেখতে ঢুকতে হয়। টিকিট পার হেড চল্লিশ টাকা করে।

গেট পেরিয়ে যেখানে ঢুকে পড়া গেল সে জায়গাটা বেশ সাজানো গোছানো। বাগান বাগান মত চেহারা তার। ছোট ছোট পাথর দিয়ে বাঁধানো রাস্তাও রয়েছে। সেই রাস্তা দিয়ে চললাম আমরা। একটু এগিয়ে গিয়েই, সামনে সিঁড়ি নেমে গেছে সোজা। এই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামলেই ক্রাং সুরির সামনে পৌঁছব। কাকিমার বেশ কষ্ট হচ্ছিল বোঝা গেল এতটা পথ সিঁড়ি বেয়ে এসে। বলল, ‘অনেক সিঁড়ি ভাঙার থাকলে আমি নামব না আর। এখানেই থাকি।’

ঝরণার এত কাছাকাছি এসে কাকিমাকে রেখে নামার ইচ্ছা আমাদের ছিল না। তবু, খুব বেশি জোর করার জোরও পাচ্ছি না মনে।

ভাই হালকা করে বলল একবার, ‘সিঁড়ি নেই বেশি। সোজা রাস্তাই—’

কাকিমাও ইতস্তত করছিল। শেষ পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে নামা শুরুই করে দিল।

কয়েকটা সিঁড়ি নামার পরেই সামনের ঝাঁকড়া গাছের ঝিরিঝিরি সবুজ পাতার ফাঁকে হালকা নীল স্বচ্ছ কাঁচকাগজের মত কী একটা চোখে পড়ে। আর এক দুটো সিঁড়ি নামার পর বোঝা যায় জলাশয় ওটা একটা। কৃত্রিম সুইমিং পুলের জলের থেকেও বেশি নীল, তার চেয়েও বেশি স্বচ্ছ। আরও কয়েকটা সিঁড়ি ভাঙার পর চোখে পড়ে পাশের ঝরণাটা। সাদা ফেনায়মান জল নিচে নেমে এসে এই গভীর নীল রঙের ঝরণা তৈরী করেছে।

‘ছবির মত সুন্দর’ কথাটা এই ঝর্ণাটার জন্যই তৈরী হয়েছিল। কল্পনা যেখানে রূপ পেয়েছে। বাস্তবের প্রাত্যহিকতার থেকে এক অন্য সমতলে অবস্থান এই সমস্ত অপার্থিব সৌন্দর্যের।

যেদিকের সিঁড়ি দিয়ে নামলে ঝরণার সামনে নামা যায়, সেদিকে না গিয়ে আমি আর কাকা অন্যদিকের সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগলাম। ঝরণার পিছনে যাব।

জলের তোড়ে নরম পাথর ক্ষয়ে গিয়ে বেশ বড় গুহা মত তৈরী করেছে ঝরণার পিছনে। সেই গুহার ছাদের উপর দিয়ে বয়ে এসে নদীর জল সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে তৈরী করেছে ঝরণা। পাথরের ফাঁক দিয়ে, ছোট ছোট পাথরে পা রেখে রেখে যাওয়া যায় ঝরণার পিছনের সেই গুহায়।

আমি আর কাকা সবার আগে চলে গেলাম সেখানে। মা আর কাকিমা এল তার পরে। যাওয়ার রাস্তায় ছোট ছোট পাথর, কয়েকটা সিঁড়িও আছে। রাস্তার মাথার উপরের পাথরের উপর দিয়েই বয়ে চলেছে নদী। পাথর বেয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে সেই নদীর জল ফোঁটা ফোঁটা এসে পড়ছে মাথায়।

নিচে নেমে ঝরণার পিছনে চলে এলাম।

এখানে আমাদের মাথার উপর শক্ত পাথরের ছাদ। পিছনে পাথরের দেওয়াল। সামনে নীল নদীর উপরে জল ঝরে পড়ছে ঝরণা হয়ে। ডিজনির অ্যানিমেশন ফিল্মে এমন জায়গা দেখেছি আগে।

ওখানে দাঁড়িয়ে দেখতে পেলাম দূরে বাবা আর ভাই ঝরণার সামনের দিকে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে।

এখানে সাদা ঝরণা যেখানে সদ্য পড়ছে নদীর নীলের উপর, সেই জায়গাটা আমাদের চোখের সামনে। উপর থেকে সজোরে নিচে পড়া জল চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে আমাদের মুখে চোখে পড়ে চোখমুখ ভিজিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু জলের একদম সামনে যাওয়া মানা। যেখানে পাথর শেষ, আর জলের শুরু, তার ফুট তিনেক আগে থেকে একটা লাল রঙের নাইলনের দড়ি দিয়ে সীমানা করা আছে। তার ওপারে যাওয়া বিপজ্জনক।

একটু পরে ভাই আর বাবাও চলে এল ঝরণার পিছনে।

সকাল বেলায় স্নংপডেঙের ওই নৌকা ভ্রমণের পর এখন এই ঠিক মধ্যাহ্নে ক্রাং সুরির এই সৌন্দর্য। মন ভরে যাওয়ার ওভারডোজ হয়ে যাবে বলে মনে হল। ঝরণার আওয়াজের মধ্যে দাঁড়িয়ে মনে হল যত কথা জমছে প্রকৃতির এই রূপ দেখে, সব বুক খালি করে বলে দিই, বকবক করি। আবার মনে হয়, চুপ করে থাকি একদম। একদম নিশ্চুপ।

বেশ খানিকক্ষণ ঝরণার পিছনের পাথর টাথরে বসে কাটালাম আমরা। তারপর চললাম আবার ওই সিঁড়ি বেয়ে, এবার ঝরণার সামনে যাব। ঝরণার পাশ থেকে একটা ভিউ পয়েন্ট আছে। একটু আগে যেখান থেকে ভাই আর বাবা ছবি তুলছিল। সেখানে গেলাম সবাই।

তারপর, সেখান থেকে আরো খানিকটা নিচে নেমে ঝরণার জলের কাছে যাওয়া যায়। আমি, ভাই আর কাকা চললাম সেদিকে। মাও আসছিল আমাদের সঙ্গে। কিন্তু খানিকটা নেমে আমি দেখলাম, যেরকম বড় বড় পাথর টপকে তবে জলের কাছে যেতে হবে, আমার মতন বেঁটে মানুষের বেঁটে বেঁটে পায়ে সেরকম পাথর টপকানো চাপের। মাকেও বললাম সেটা। ভাই আর কাকা নেমে গেল আরো নিচে। একদম জলের কাছে। আমি একটু দূরেই রইলাম। জল স্বচ্ছ এখানে। নদীতীরের পাথর রঙীন চকচকে পরিষ্কার। লাইফ জ্যাকেট ভাড়া পাওয়া যায় ওখানে। তাই পরে নিয়ে জলে নামা যায় বেশ।

সূর্যদেব তখন একদম মাথার উপরে। স্নান করার জামাকাপড় সঙ্গে থাকলে খুব ভালই স্নান করা যেত। কিন্তু কিছু নিয়ে আসা হয়নি। কাকা বলল, ‘আগে বলবি তো ক্রাং সুরি মানে এইরকম ঝর্ণা? স্নান করার ড্রেস আনতাম তবে!’

সত্যিই, ক্রাং সুরিতে স্নান না করতে পারাটা একটা আফশোষ রয়ে গেল আমাদের।

মার্চ মাসে ক্রাং সুরির রূপ এইরকম, কিন্তু বর্ষার সময় এই ঝর্ণা হয়ে ওঠে বিপুল। তখন ঝর্ণার পিছনে যাওয়া যায় না। জলের তোড়ে ভাসিয়ে নিয়ে যায় সেখান থেকেও। তখন ঝর্ণার সামনেও নামা যায় না।

জল তখন থাকে না অত নীল। বর্ষার ঘোলা জলে ঘুলিয়ে ওঠে।

তখন ক্রাং সুরির থাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ।

আমরা ক্রাং সুরির এই মার্চ মাসের রূপই দেখতে চেয়েছিলাম। তবে, ক্রাং সুরির বর্ষার রূপও মনোহর হবে, সেটাও নিশ্চিত।

আবার সিঁড়ি বেয়ে ঝরণার উপরে উঠলাম তারপর। যে পার্ক মত সাজানো জায়গাটার উপর দিয়ে গিয়ে ঝরণা দেখতে নিচে নেমেছিলাম, সেইখানটায়। ওর পাশ দিয়েই বয়ে চলেছে সেই পাহাড়ী নদী যে ক্রাং সুরি হয়ে লাফিয়ে নিচে নেমেছে সামনেই। নদীতে তেমন জল নেই এখন। দিব্যি তার বুকের উপর দিয়ে হেঁটে বেড়ানো যায়। পাহাড়ী নদী নদী-উপত্যকায় জায়গায় জায়গায় পটহোল তৈরী করেছে। অদ্ভুত সুন্দর দেখতে সেগুলোকে। আমি সেইরকম একটা পটহোলের স্বচ্ছ ঠান্ডা জলে পা ডুবিয়ে বসে রইলাম। আমার দেখাদেখি পা ডুবিয়ে বসল ভাই আর মাও।

জল যেখানে ঝরণা হয়ে ঝাঁপিয়ে নিচে পড়েছে সেই জায়গাটা উঁকি মেরে দেখার প্রবল ইচ্ছা হচ্ছিল। কিন্তু লাল দড়ি সেখানেও নিষেধ লিখে রেখেছে। কী আর করা?

খানিকক্ষণ ওইখানে বসে থাকার পর উঠলাম আমরা। ক্রাং সুরি দেখা শেষ। এবার আবার যাত্রা শুরু করতে হবে শিলঙের দিকে।

সকাল থেকে সেভাবে কিছু খাওয়া হয়নি।

এখন, ঝর্ণা দেখে উঠে এসে কার পার্কিঙের পাশের সেই দীর্ণ ধাবা-হোটেলটাতে কিছু খাব ভেবে গিয়ে দেখি, খাওয়ার যোগ্য কিছুই পাওয়া যায় না সেখানে। তাছাড়া, হোটেলের ছিরি দেখে খাওয়ার ইচ্ছাও চলে গেল। শুধু চা বলা হল সবার জন্য।

সেখানে বসে বসে একটু জিরিয়ে নিচ্ছি সবাই, দেখি, একটা প্রাইভেট সাদা গাড়ি আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে হোটেলের দিকে। এবং সেই গাড়ির ঠিক সামনে একটা কুকুর এমনভাবে শুয়ে আছে যে গাড়ির চাকা আর একপাক ঘুরলেই সে চাকা কুকুরটার পেটটাকে পিষে দেবে।

দোকানের মধ্যের এবং আশেপাশের সবাই চেঁচিয়ে উঠল। সে গাড়ির চারিদিকের কাঁচ তোলা। এবং ড্রাইভারটি ক্যালাস প্রকৃতির। সবাইকে চ্যাঁচাতে দেখে কী বুঝল সে কে জানে, আরেকটু হলে কুকুরটার উপর গাড়ি তুলেই দিচ্ছিল। নেহাৎ ভাগ্যবলে কুকুরটা বেঁচে গেল সে যাত্রা।

ড্রাইভারটি গাড়ি থেকে বেরিয়ে ঘটনা দেখেবুঝে ফিক করে হেসে দিল একটু। আমাদের পিছনে দোকানদার একটা গালি দিয়ে উঠল তাতে।

ভাগ্যিস চোখের সামনে বিশ্রী একটা অ্যাক্সিডেন্ট দেখতে হয়নি আমাদের। চোখের উপর গাড়িচাপা পড়ে কুকুরটাকে মরতে দেখলে, পুরো বেড়ানোটাই তিক্ত হয়ে যেত।

ক্রাং সুরি পেরিয়ে শিলঙের দিকের রাস্তায় চললাম এবার। এতক্ষণের ধূসর ভাবটা কমে গিয়ে রাস্তা আবার একটু সবুজ হয়ে ওঠে এখানে। দুপাশে পাইন গাছের সারির জঙ্গল চোখে পড়ে মাঝে মাঝে।

চারিপাশের ঢেউ খেলানো ভূমিরূপ ছেড়ে আবার একদিকে খাড়াই পাহাড়, অন্যদিকে খাদ শুরু হয়।

ক্রাং সুরিতে যে সময়টুকু ছিলাম আমরা, কড়া রোদ ছিল চারিদিকে। খুব ভাল ওয়েদার ছিল ঝর্ণা দেখার পক্ষে, ক্রাং সুরি ছিল নীলে নীল।

এখন শিলঙের রাস্তায় চলা শুরু করার একটু পর থেকেই আকাশে কালো মেঘের আনাগোণা শুরু হল।

পিচের রাস্তায় হঠাৎ এক একজায়গায় চকচকে ভাব। মনে হল এক এক পশলা দমকা বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে জায়গায় জায়গায়।

মনে আশা জাগল, মেঘালয়ে এসে বৃষ্টি না দেখে ফিরতে হবে না। পাশেই পাহাড়ের মাথায় কালো মেঘ জটলা পাকাচ্ছে দেখতে পাচ্ছি আমরা।

ড্রাইভার গাড়ির খোলা জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে দেখলেন, হ্যাঁ, বৃষ্টি পড়ছে অল্প অল্প।

তারপরেই এসে গেল তুমুল বৃষ্টি।

ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে বেরোলেন বাইরে, প্লাস্টিক দিয়ে লাগেজ ঢেকে বেঁধে দিতে। আমরা গাড়ির ভিতর বসে মেঘালয়ের বৃষ্টি অনুভূতিতে মেখে নিলাম। কাকা আবৃত্তি করল, ‘বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস, এইখানে মেঘ গাভীর মত চড়ে…’

একটু পরে, বৃষ্টি তখনও হয়ে চলেছে, আমাদের গাড়ি থামল রাস্তার ধারের ছিমছাম একটা রেস্তোরাঁতে। সুন্দর হোটেলটা। চারিদিকে কাঁচ লাগানো। বৃষ্টিতে ভিজে, ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে কোনওমতে আমরা রেস্তোরাঁর ভিতরের টেবিলে গিয়ে বসলাম।

তারপরেই, শুরু হয়ে গেল প্রবল শিলাবৃষ্টি। কী ভীষণ শিলাবৃষ্টি! বাড়িতে কতদিন শিলাবৃষ্টি দেখিনি আমরা। সবাই হোটেলের সামনে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম সেই বৃষ্টিকে। তাপমাত্রা মনে হল একঝটকায় কমে গেল চার ডিগ্রী।

সত্যি কথা বলতে, এই বৃষ্টি দেখতে এত ব্যস্ত, আর ঠান্ডায় এত কাবু হয়ে পড়েছিলাম আমরা, যে, এইখানে যে কী খেয়েছিলাম তার কিছুই মনে নেই আমার।

একটু পরে যখন খাওয়া শেষ করে বেরোলাম আমরা, তখনও বৃষ্টি হয়ে চলেছে। আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলল।

খানিকক্ষণ পরে শিলঙে ঢোকার আগে একটা ছোট শহরের উপর দিয়ে যেতে যেতে দেখি, সেখানে রাস্তার দুপাশে সাদা সাদা কী যেন ঢিপি করে জমিয়ে রাখা হয়েছে। তখন অন্ধকার হয়ে এসেছে। আকাশে মেঘও আছে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না জিনিসটা কী।

আমাদের ড্রাইভার বললেন বরফ ওটা। সত্যি কথা বলতে শিলঙে মার্চ মাসে বরফ দেখতে পাওয়া খুবই অদ্ভুত ব্যাপার। কিন্তু আমরা সেই আধো অন্ধকারে তাকিয়ে দেখলাম, শুধু রাস্তার দুপাশেই নয়, সেই ছোট বসতির সব দোচালা ঘরের ছাদে বিছিয়ে রয়েছে সেই সাদা জিনিস। ড্রেনের পাশে, মাঠের উপর, ঘরের বারান্দাতেও রয়েছে।

আমরা যেখানে খাচ্ছিলাম সেখানে যখন শিলাবৃষ্টি হচ্ছিল, এইখানে তখন শিলাবৃষ্টি একটু রূপ পরিবর্তন করে বরফ হয়েই ঝরেছে বলে মনে হল।

শিলং শহরে প্রবেশ করলাম আমরা। এবং যেকোনও শহরের রীতি অনুযায়ী সঙ্গে সঙ্গে বিশ্রীরকম জ্যামে আটকে পড়লাম।

শিলঙে আমাদের হোটেল ছিল ঠিক পুলিশ বাজারের উপরে এম্ব্যাসি হোটেল।

একজনের রেকমেন্ডেশনে আমি স্বস্তিক হোটেল বুক করতে গেছিলাম। অপেক্ষাকৃত সস্তায় ভাল হোটেল। কিন্তু, যে এজেন্টের মাধ্যমে করতে গেছিলাম বুক, সে তালেগোলে স্বস্তিকের বদলে এম্ব্যাসি হোটের ধরিয়ে দিল শেষপর্যন্ত।

তা, হোটেলটা মন্দ ছিল না। একদম সেন্টারেও প্রায়। কিন্তু, হোটেলের সামনে গাড়ি পার্কিঙের ব্যবস্থা নেই। আর, বড় রাস্তা থেকে উঁচু উঁচু সিঁড়ি পেরিয়ে তবে হোটেলের প্রবেশপথে পৌঁছুনো যায়।

এছাড়া আর কোনও প্রবলেম ছিল না অবশ্য। ফ্রেন্ডলি ভাল স্টাফ। রুমগুলোও খারাপ না।

হোটেলে চেক ইন করে নিলাম আমরা।

ফ্রেশ ট্রেশ হয়ে নিলাম সবাই।

তারপর ভাই নিজের বিছানায় লম্বা হল। বাকিরা সবাই একবার করে নিচে গেল একটু শহর দেখতে। আমি গেলাম না। ভাবলাম, আগে মিস্টার বায়রনকে ফোন করে মায়ের ফোনের ব্যাপারে কথাবার্তা সেরে নিই। তারপরে বেরোব বাইরে।

ওমা! ফোন করেই চলেছি, করেই চলেছি। বারবার খালি শুনছি ফোন সুইচড অফ। ব্যাপার কী?

প্রায় ঘন্টাদুয়েক সমানে চেষ্টা করে যাওয়ার পরে খেয়াল হল, নোংরিয়াটের নামে দুটো নাম্বার সেভ করা আছে আমার ফোনে। তখন দেখলাম, যেটা নাম্বারটাতে কল করে যোগাযোগ করেছি এতদিন মিস্টার বায়রনের সঙ্গে, তার বদলে অন্য নাম্বারটাতে ফোন লাগাচ্ছিলাম এতক্ষণ।

বোঝো!

তখন তাড়াতাড়ি অন্য নাম্বারটাতে কল করে কথা বললাম ওঁর সঙ্গে।

মোটামুটি কথা হল একটা। যে ড্রাইভারকে দিয়ে ফোন পাঠাবেন, তার গাড়ির নাম্বারটা পাঠালেন আমাকে এস এম এস করে।

 

সেসব তো হল।

মধ্যিখান থেকে আমার সন্ধের শিলং ঘোরাটা বেকার হয়ে গেল।

 

যাই হোক। আরেকটু রাতের দিকে একবার বেরোলাম ডিনারের সন্ধানে। হোটেল এম্ব্যাসির নিজস্ব রেস্তোরাঁ দ্য টেস্ট ছিল অবশ্য। কিন্তু আমরা আমাদের ড্রাইভারের রেকমেন্ডেশনে বাঙালী হোটেল হোটেল অরূপে খেতে গেলাম।

খাওয়া ভীষণই সস্তা এখানে। নিরামিশ থালির দাম পঞ্চাশ টাকা। তবে খাওয়ার টেস্ট ওই কোনওমতে চলনসই।

পরের দিন সক্কাল সক্কাল উঠেই মফলঙের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ব।
বেলা একটার মধ্যে সব সাইট সিইং সেরে নিতে হবে। বায়রনের সঙ্গে কথা হয়েছে যে বেলা একটার মধ্যে শিলঙের বড় বাজার থেকে মায়ের ফোন ড্রাইভারের কাছ থেকে নিয়ে নেবো। কাজেই তাড়াতাড়ি ঘুম লাগানো দরকার। সবাই চুপচাপ কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লাম।

Leave a Reply