শ্রীরূপ বিশ্বাসের লেখা ‘পাহাড়’

পাহাড়ের সাথে আমার একটা ভালোবাসা জড়িয়ে আছে। সবুজের সাথেও। একটা সিনেমার কথা মনে পরে, ‘দিল সে’, ছবিতে গুরু শাহ্‌রুখ খান এবং মনীষা কৈরালা ছিলেন কিন্তু আমাকে সব থেকে বেশি যা টেনেছিল তা হল পাহাড়।  ওই প্রথম আমার পাহাড় আর ধোঁয়াশা দেখা।

পাহাড়ের কোলে হেঁটে বেড়ানো, বসে থাকা বা যাচ্ছেতাইগিরি করার মধ্যে একটা স্থবিরতা আছে। বেশ একটা শীতল ব্যাপার। প্রবল ক্লান্তিকে কেমন দূরে, বহু দূউরে  ঠেলে দেওয়া যায়। যদি এমন হত যে, পাহাড়ের ঢালে একটা ঘর, যার ছাদ টা নেমে গেছে দু’দিক থেকে, ঠিক গ্রামের বাড়ি গুলোর মত। বাড়ির বাইরে একটা মোটামুটি রকমের লন থাকবে। বোগেনভেলিয়া গাছের পাতা পড়ে থাকবে রোজ ভোরে। ভেতরে থাকবে একটা জম্পেশ রকমের ফায়ার-প্লেস । ফায়ার প্লেসের সামনে থাকবে সোফা। সন্ধ্যে বেলা কফির কাপ হাতে ল্যাম্পসেডে শক্তি চট্টোপাধ্যায় পড়া যাবে। কবিতা পড়তে পড়তে মুখ থেকে আলতো ধোঁয়া বেরোবে। মাঝে মধ্যে ঠাণ্ডা হয়ে যাবে হাত, তাকে সেঁকে নেওয়া যাবে আগুনে। রাত ১২ টায় দু’পে ব্র্যান্ডি খেয়ে, নরম বিছানা আর তুলো তুলো লেপের ভেতর নিজেকে পুরে দেওয়া যাবে। ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা শরীর, লেপের কোলাকুলিতে গরম হবে। ঘুম আসবে। ভারি ভ্রু-পল্লব নিয়ে দেখব ঘুলঘুলি চিরে নিয়ন আলো এলিয়ে পড়ছে ঘরে। আধ ভোরে ঘুম ভাঙবে। কাঁচাঘুম ভাঙা চোখ ডলতে ডলতে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াব, দেখব অজস্র ধোঁয়াশা কেটে আলো ফুটছে পাহাড়ের কোলে। ওই উঁচু পাইন গাছ যেন নির্বিঘ্নে ঘুমিয়ে রয়েছে। নিচে কি যেন এক ফুল ফুটেছে নাম না জানা, ছোট্টরকম। নাকের ডগা ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। রেলিং ছুঁতেই হাতে এসে ঠেকবে ঠাণ্ডা, ভিজে একশা হবে হাতের পাতা। উলের ট্রাউসারে হাত মুছতে মুছতে শুনব তামাং দা গান গাইছে ওদের ভাষায়, সাথে কিছু একটা বাজছে অদ্ভুতভাবে, মাদল জাতীয় কিছু। এমিলিয়া চোখ চুলকোতে চুলকোতে তার ইংরেজি অ্যাক্সেন্টে বলবে,  “কাম ইনসাইড। ঠাণ্ডা লেগে যাবে।” সূর্য উঠছে, পাহাড় জাগছে। ঘুমন্ত পাইনের ফাঁক থেকে আলো কার্নিশ গলে ঢুকছে ঘরে। এমিলিয়া ফের ঘরে আসার তীব্র আবেদন জানাবে লেপ থেকে মুখ সরিয়ে, এমনি সময় তার চোখের কোণে এসে আলো ঠেকতেই, সে মুখ ফিরিয়ে শোবে। এমিলিয়া হাল্কা গোঙানির পর, লেপের ভেতর পুরে দেবে নিজেকে। আমি ফের বালিশে গড়ানোর অছিলায় এক বুক অক্সিজেন নিয়ে ব্যালকনির কাচের দরজা বন্ধ করতেই, দেখছি একরাশ মেঘ কাচের কাছে এসে বাষ্প হয়ে গেছে।

পাহাড় আমাকে কেমন যেন সম্রাট নিরো করে দেয়। যে কিনা সমস্ত রোমকে পুড়তে দেখেও নিজের ঘরে তারযন্ত্র (LYRE) বাজাচ্ছিল। আমিও চাই একটা তারযন্ত্র, বেসুরে হলেও, যেটা অবচেতনে বাজাতে বাজাতে আমি পাহাড়ের একবুক জমাটিয়া শীতকে পুড়তে দেখব। দাউ দাউ করে।

আমার কোনদিন পাহাড়ে যাওয়া হয় নি।

You may also like...

Leave a Reply