স্বাতী মজুমদারের কবিতা ‘আত্মপরিচয়’

একবার বুঝতে চেয়ে বুঝতে চেষ্টা কর আমায়।
জলের চেয়েও সহজ আমি।
আর না চাইলে?
পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল ধাঁধাটাও হার মানবে আমার কাছে।

না। আমার চেতনার রঙে কখনও পান্না সবুজ, চুনী রাঙা হয়ে ওঠেনি ।
আমি কখনও পুবে পশ্চিমে আলো জ্বালব বলে চোখ মেলিনি আকাশে।
গোলাপের দিকে চেয়ে কখনও বলিনি ‘সুন্দর’।
কখনও সমস্ত মানুষের অহংকার নিয়ে
বিশ্ব-আমির রচনার আসরে বসিনি – “হাতে নিয়ে তুলি পাত্রে নিয়ে রঙ”।
তবু একবার। একটিবার বুঝতে চেয়ে বুঝতে চেষ্টা কর আমায়।
পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ ভাষার চেয়েও সহজ আমি।
পৃথিবীর সবচেয়ে দুষ্পাঠ্য লিপির চেয়েও দুর্বোধ্য।

না। আমি আম্ভৃণীবাকের দেবী নই।
আমাকে নিয়ে কোন ঋক্ রচনা হয়নি পৃথিবীর প্রাচীনতম সাহিত্যে।
আমি বহুভাবে অবস্থিতা হয়ে কখনও রুদ্রের হাতে ধনুক তুলে দিইনি।
আমার মহিমা কখনও দ্যুলোক ভূলোককে অতিক্রম করেনি।
ঋচমন্ত্রে কখনও ঘোষণা করিনি আপন আত্মপরিচয়।
তবু একবার। একটিবার জানতে চেয়ে জানতে চেষ্টা কর আমায়।
জ্ঞানের আলোকের চেয়েও উজ্জ্বল আমি।
তমোগুণের চেয়েও গুরু, আবরক, শীতল, অন্ধকার।

না। আমি কখনও পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে কোন ক্লান্তপ্রাণ পথিককে দুদন্ড শান্তি
দিইনি।
আমাকে নিয়ে অচেনা দিকশূন্যপুরের পথে
পা বাড়ায়নি কোন অগোছালো নীললোহিত।
সদর্পে ‘প্রথম প্রেম’ বলে কখনও ঘোষণা করেনি কোন প্রথম প্রেমিক কবিয়াল গায়ক।
তুলিতে রঙের সোহাগ মিশিয়ে আমার ঠোঁটের কোণে কালজয়ী রহস্যময় হাসি আঁকতে পারেনি
কোন চিত্রকরের হাত।
আমি কখনও মানসী হয়ে উঠিনি কারোর কোনও কল্পনার।
তবু একবার। একটিবার ভাবতে চেয়ে ভাবতে চেষ্টা কর আমায়।
ক্যানভাসে রঙের প্রথম আঁচড় আমি।
স্বরলিপির অন্তরা, উপন্যাসের মধ্যভাগ,
শেষ আগুনের ফুলকি কবির চিতার।

একবার ভালবাসতে চেয়ে ভালবাসতে চেষ্টা কর আমায়।
আমি ‘আমার আমি’ হয়েও অনেক বেশি ‘তোমার আমি’।
আর না চাইলে?
নিঃসঙ্গ এই অস্তিত্ব আমার আরও গভীর নিঃসঙ্গতায় মিশে যাবে।
হয় ধুলো হয়ে কবরের, নয় চিতার পোড়া ছাই।

You may also like...

Leave a Reply